জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বৈষম্যর শিকার মাদরাসাছাত্ররা !


জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Published: 2018-10-12 20:55:25 BdST | Updated: 2018-10-17 03:53:55 BdST

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারো ভর্তিবৈষম্যের শিক্ষার হচ্ছেন মাদরাসা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা। কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই বিভাগ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দোহাই দিয়ে ডিন বিভাগ আরো বৈষম্য বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে অন্যায়ের আশ্রয় নিয়ে নিয়ম ও মেধার অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত কলা ও মানবিক অনুষদের ফলাফল বিশ্লেষণ করে জানা যায়, কলা ও মানবিক অনুষদে ভর্তির ক্ষেত্রে ‘বিজ্ঞান’, ‘মানবিক’, ব্যবসা শিক্ষা ও মাদরাসা ও কারিগরি নামে চার ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। কিন্তু মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম বা এইচএসসি পাস করে আসা বিজ্ঞান বিভাগ ও মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের ‘বিজ্ঞান’ ও ‘মানবিকে’ অন্তর্ভুক্ত না করে তাদেরকে আলাদা করা হয়। সেখানে অনুষদের মোট ৩৩৭টি আসনের মধ্যে ১৩টি আসন দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে আগ থেকে বৈষম্যের প্রশ্ন উঠলে কলা ও মানবিকী অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোজাম্মেল হক আশ্বস্ত করেন, ‘এ পরীক্ষা থেকে আর কোনো বৈষম্য থাকবে না, মাদরাসার মানবিককে মানবিক শাখার অন্তভুক্ত করেই রেজাল্ট প্রকাশ করা হবে। কিন্তু এখন আবারো বিভাগের দোহাই দেয়া হচ্ছে।’ অন্য দিকে কলা অনুষদভুক্ত কয়েকটি বিভাগের চেয়ারম্যান বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ডিনের দায়িত্ব হচ্ছে ভর্তিতে কোথায়ও অসঙ্গতি অন্যায় বৈষম্য হচ্ছে কি না তা দেখা। কিন্তু মাদরাসা শিক্ষার্থীরা মানবিক শাখার সব শর্ত পূরণের পর হাইকোর্টের আদেশের ভিত্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে কোনো বাধা নেই। এ বিষয়টি আমাদের বিভাগকে কোনো নোটিশ দিয়ে অবহিত বা সতর্ক করা হয়নি। ফলে বিভাগও আগের নিয়মে চলছে।

এ ছাড়াও মাদরাসা শিক্ষার্থীরা মানবিক শাখার হলেও তাদের তুলনায় বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য কলা অনুষদে বেশি সিট দেয়া হয়েছে। কলা ও মানবিক অনুষদে মোট ৩৩৭ আসনের বিপরীতে দশগুণ মেধাতালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। বিজ্ঞান বিভাগের ছেলে ৭৯, মেয়ে ৭৯; মানবিক বিভাগের ছেলে ৭৭, মেয়ে ৭৭; ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ছেলে ২১, মেয়ে ১৭ এবং মাদরাসা ও টেকনিক্যাল বিভাগের ছেলে ১১ এবং মাত্র দুই মেয়ের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। ‘মানবিক’ ও ‘বিজ্ঞান’ বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় সমানসংখ্যক সিট বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে ভোলা থেকে আসা এক ভর্তিচ্ছু মেয়ে শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, ‘মাদরাসার সাথে অন্যায় ও আইনবিরোধী আচরণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কী লাভ তা আমার বুঝে আসে না। কলা অনুষদের সাতটি বিভাগের জন্য মাত্র দুইজন মাদরাসাছাত্রীকে সিলেক্ট করা হয়েছে। সাত বিভাগে দুইজন ভর্তি হবে। এর মানে কী? যে জাবিতে মেয়েদের প্রাধান্য দেয়া হয়, সেই ক্যাম্পাসেই এখন মেয়েদের অবজ্ঞা ও অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে, শুরু মাদরাসায় পড়ার কারণেই।’

এ বিষয়ে দর্শন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোস্তফা নাজমুল মানছুর বলেন, ‘আমাদের বিভাগ থেকেই ডিনকে দুইজন মাদরাসাছাত্রী ভর্তির চাহিদা দেয়া হয়েছে। তাহলে পুরো অনুষদে কিভাবে দুইজন ছাত্রী ভর্তির অনুপাতে রেজাল্ট প্রকাশ করা হয় তা বুঝে আসে না। তিনি আরো বলেন, ‘ভর্তি জটিলতার অনেক বিষয়েই অবহিত নয় সংশ্লিষ্ট বিভাগ। সার্বিক খোঁজ নিয়ে বৈষম্য বিলোপ করা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব। আমি যতদূর জানি, এর আগে মাদরাসা শিক্ষার্থীরা হাইকোর্টে রিট করলে আদালত জাবিকে বৈষম্য বিলোপে একটা নির্দেশনা দেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আজো নির্দেশনাটি আমাদেরকে নোটিশ দিয়ে অবহিত করেনি। তাই পূর্বের বৈষম্য আবারো থাকছে, অন্যভাবে হচ্ছে। এদিকে প্রতœতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক বুলবুল আহমেদ বৈষম্যের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘সব শর্ত পূরণ করলেও অ্যাকাডেমিক সভায় মাদরাসার বিষয়ে একেক শিক্ষকের একেক চাহিদা থাকায় সর্বসম্মতিতে বৈষম্য বিলুপ্ত হচ্ছে না। এ বিষয়টি একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ভিসির হস্তক্ষেপে কার্যকরভাবে বৈষম্য বিলোপ করা সম্ভব।

কলা ও মানবিক অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো: মোজাম্মেল হক বৈষম্যেও বিষয়টি স্বীকার করে বলছেন, ‘অনেক বিভাগ মাদরাসাশিক্ষার্থী নিতে চায় না। আমি শুধু তাদের চাহিদামাফিক বণ্টন করি। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক নূরুল আলমকে কয়েকবার ফোন করে পাওয়া যায়নি।

মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষ দাখিল এবং ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের আলিমে বাংলা ও ইংরেজিতে যথাক্রমে দু শ’ নাম্বার অন্তর্ভুক্ত করে। অন্যান্য মৌলিক বিষযগুলোও কলেজ-মাদরাসার একই সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় মাদরাসা শিক্ষার্থীদেরকে কলেজের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আর বাধা নেই। কিন্তু জাবিতে সে বৈষম্যের ধারা অব্যাহত রয়েছে বিভিন্ন আঙ্গিকে।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।