টিসি দেয়ার বিধান নেই, তবু কেন টিসি?


টাইমস অনলাইনঃ
Published: 2018-12-05 21:13:54 BdST | Updated: 2018-12-12 03:33:05 BdST

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অসদাচরণের কারণে তাকে বাধ্যতামূলক টিসি (ট্রান্সফার সার্টিফিকেট) দেওয়ার কোনও বিধান নেই বলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বলা হয়, বিধিবহির্ভূত কোনও কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা স্কুল নিতে পারে তার দিকনির্দেশনা থাকলেও সেখানে টিসির কোনও বিধান নেই। কেবল কোনও অভিভাবক স্বেচ্ছায় সন্তানকে অন্য স্কুলে নিতে চাইলে তিনি টিসি চাইতে পারেন।

তারপরও স্কুলগুলো নানা সময় অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে যে টিসি দেয় তার সঙ্গে অর্থনৈতিক বিষয়ও জড়িত বলে অভিযোগ করছেন অভিভাবক ও শিশু অধিকার সংগঠকরা। তারা বলছেন, একজনকে বিদায় করলে সিট খালি হলে সেই সিটে মোটা অংকের টাকা দিয়ে নতুন শিক্ষার্থী নেওয়া যায়। স্কুলের শিক্ষকদের নির্ধারিত কোচিংয়ে কোনও শিক্ষার্থী না গেলেও তাকে নানা তোপের মুখে পড়তে হয় বলেও জানিয়েছেন তারা।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (মাধ্যমিক) ড. আব্দুল মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের টিসি দেওয়ার কোনও বিধান নেই। অন্তত আমার তেমন জানা নেই। বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে কী কী করা যেতে পারে সেসব উল্লেখ আছে। কিন্তু অভিভাবক যদি সন্তানকে অন্য স্কুলে নিয়ে যেতে চান শুধু তাহলে তিনি টিসি চাইতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ভালোবাসতে হবে। তাদের বিপর্যস্ত করা শিক্ষকদের কাজ না।’

টিসির বিধান না থাকার পরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তা দিচ্ছে কিনা সেটি অধিদফতর মনিটরিং করবে কিনা এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখন অনেক কমেছে এটা। উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত আমাদের চেইন কাজ করে। শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা করলো কিনা সেটা জরুরি না, সে ভালো মানুষ হচ্ছে কিনা সেটি বিবেচনা করতে হবে- সেই বার্তা আমরা দেই। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ভুল শোধরানোর সুযোগ না দিয়ে, টিসি দিয়ে দায়মুক্ত হতে চায়। কিন্তু ওই শিক্ষার্থীদের সঠিক পথটি দেখানো, সঠিকভাবে পরিচালিত করা, বেশি বেশি নার্সিং করতে হবে ওই শিক্ষকদেরই।’

১৯৩০ সালের এডুকেশন কোডে বলা আছে— কোনও শিক্ষার্থী যদি কোনও অন্যায় করে, তাহলে তাকে বহিষ্কার করা যাবে। তবে ওই শিক্ষার্থীকে সংশোধনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। বারবার তাকে কাউন্সেলিং করতে হবে। অভিভাবকদের ডেকে তাদের মাধ্যমে কাউন্সেলিং করতে হবে।

মনোরোগ চিকিৎসক মেখলা সরকার মনে করেন, যেকোনও আচরণে ‘টিসি দিয়ে দেওয়া হয়। কারণ, শিশুদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা জরুরি তা শিক্ষকরা জানেন না। তারা নিজেদের মতো করে ঘটনা ব্যাখ্যা করেন।’ এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘টিসি মানসিক বিপর্যয় তৈরি করে। শিশু-কিশোররা এই বয়সে ছোটখাটো ভুল করতেই পারে। ভুলগুলোসহ তাদের গ্রহণ করে শোধরাতে হবে। এসব জানাতে শিক্ষকদের নিয়মিত কাউন্সেলিং জরুরি।’

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের কর্মসূচি সমন্বয়কারী শিশু অধিকার সংগঠক আব্দুল্লাহ আল মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘টিসির অথরিটি স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা উচিত না। একটি শিশুকে টিসি দিয়ে আপনার গা বাঁচালেন কিন্তু সমস্যার সমাধান হলো কী? টিসি দিয়ে নতুন শিক্ষার্থী নেওয়ার ভর্তি বাণিজ্য আছে। ভর্তির সুযোগ দিতে একেকজন শিক্ষার্থীর মোটা ডোনেশন নেওয়া হয়। ফলে নবম শ্রেণিতে হুট করে কাউকে ভর্তি করার সুযোগ তারা ছাড়তে চান না।’

শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের দায় প্রতিষ্ঠানের ওপরও বর্তায় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ভালো রেজাল্টের স্কুলগুলো সেরা ছেলেমেয়েদের ভর্তি নিচ্ছে। এরপরও শিক্ষার্থীরা অনৈতিক বা শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে গেলে সেই দায় স্কুলগুলোর ওপর বর্তায়।’

কোচিং বাণিজ্যের অংশ না হলেও শিক্ষার্থীরা টিসির ভয়ে থাকে উল্লেখ করে মাধ্যমিকের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক জানান, আমার মেয়েকে স্কুলের শিক্ষকের কোচিংয়ে না দেওয়ার কারণে হয়রানি হতে হয়েছে। শুরুতে আমরা বুঝতে পারিনি, পরে দেখলাম কথায় কথায় তাকে টিসি দিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়, শুধু সেই শিক্ষকের কোচিং এ যায় না বলেই তার ভালো রেজাল্ট হয় না।’

টিসি দেওয়া প্রসঙ্গে আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেটা দেওয়া যাবে না বলে বিধান আছে, সেটা দেওয়া অপরাধ। স্কুল যদি দেখে কোনও শিক্ষার্থী ভালো করতে পারছে না, সেটাও স্কুলেরই দায়। সেই দায় না নিয়ে শিক্ষার্থীকে বিদায় করে দিচ্ছে। কারণ, তারা দেখাতে চায় আমার স্কুল ভালো, খারাপ তুমি।’

ভালো স্কুল বলে কিছু নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভালো স্কুল বলে কিছু নেই, যদি ভালো শিক্ষার্থী না থাকে। শিক্ষার্থীদের যথার্থ শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্কুল কর্তৃপক্ষকে দায়ী করার জন্য আইন থাকা উচিত। প্রশ্ন করা উচিত, লাখ লাখ টাকা ফি নিয়ে একজন শিক্ষার্থীর প্রতি কেন তারা মনোযোগ দিতে পারলো না। ব্যর্থতা তো তাদের।’

প্রসঙ্গত, সোমবার (৩ ডিসেম্বর) পরীক্ষায় নকল করেছে এমন অভিযোগ তুলে ভিকানুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির প্রভাতী শাখার ছাত্রী অরিত্রী অধিকারী ও তার বাবা-মাকে অপমানসহ ভয়ভীতি দেখানোর পর আত্মহত্যা করে ওই শিক্ষার্থী। তাকে তার অভিভাবকের সামনে টিসি দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।