বিধিনিষেধ কিশোরগঞ্জের হাওরে, চিন্তায় বিনিয়োগকারীরা


কিশোরগঞ্জ
Published: 2020-07-30 18:56:49 BdST | Updated: 2020-08-05 16:51:43 BdST

দুর্ঘটনায় একাধিক পর্যটকের প্রাণহানির কারণে ঈদ উৎসবকে সামনে রেখে এবার কিশোরগঞ্জের হাওর পর্যটন এলাকায় পর্যটকদের ঢল ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে প্রশাসন। এমন পরিস্থিতিতে এ শিল্পকে ঘিরে গড়ে ওঠা ব্যবসায়ী ও নৌ-যান মালিকদের মাথায় হাত পড়েছে।

ভাটিকন্যা কিশোরগঞ্জের হাওর পর্যটন এলাকা এখন বর্ষার পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ। গত কয়েক বছরের মধ্যে এবার-ই সাগরের ন্যায় জল থৈ-থৈ হয়ে অপরূপ নৈসর্গিক সাজে সেজেছে এ হাওর পর্যটন এলাকা।

আর এ অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে পানিতে ডুবে তিন পর্যটকের মৃত্যু হওয়ায় ঈদুল আজহার উৎসবের আগে পর্যটকদের ঢল ঠেকাতে বিধি-নিষেধ আরোপ করে কঠোর অবস্থানে প্রশাসন। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে পর্যটকদের ঢলে ভাটা পড়ায় মাথায় হাত পড়েছে নৌ-যান মালিক ও ব্যবসায়ীদের।

বাস্তবতার কথা চিন্তা করে পর্যটক প্রবেশ স্বাভাবিক করার দাবি করেন এ শিল্পে নিয়োজিত জীবিকা নির্বাহকারী লোকজন। তবে সীমিত পর্যায়ে চালু রাখার আশ্বাস প্রশাসনের।

জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর উপজেলা নিকলীতে দৃষ্টি নন্দন দীর্ঘ বেড়িবাঁধ, ভাসমান পানি সহিষ্ণু করচবন এবং ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলায় দীর্ঘ হাওর পথে দৃষ্টি নন্দন অসংখ্য সেতু এবং অলওয়েদার ও ডুবোসড়ক গড়ে ওঠায় ভরা বর্ষায় এসব স্থান ‘সি বিচ’র’ মতো রূপ ধারণ করে।

অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বর্ষার দিগন্তবিস্তৃত এ হাওর জলাভূমির ভিডিও চিত্র মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে উঠলে গত তিন-চার বছর ধরে ভ্রমণ বিলাসী ও সৌন্দর্য প্রেমিক পর্যটকদের ঢল নামে এই হাওর পর্যটন এলাকায়।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পর্যটকরা দল বেঁধে শত-শত মোটরবাইক নিয়ে এবং দামি প্রাইভেট কার, মাইক্রো ও বাস হাঁকিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়েও বর্ষায় ছুটে আসেন এ পর্যটন এলাকায়।

এসব পর্যটকগণ টায়ার-টিউব নিয়ে জলকেলি, নৌকা ও স্পিড বোটে দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশিতে ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি মোটরসাইকেল নিয়ে ডুবো সড়কে ঘুরে বেড়ানোর এবং বিস্তীর্ণ হাওরের বুকে ভাসমান জল সহিষ্ণু করচবনের শীতল ছায়ায় প্রিয়জনদের নিয়ে ভিন্ন রকম আনন্দে মেতে উঠেন।

এবার করোনা প্রাদুর্ভাবকালেও সোশ্যাল ট্রান্সমিশন ভীতি উপেক্ষা করে শত-শত মোটরবাইক, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস এমনকি বাস হাঁকিয়ে শুক্রবার ও শনিবার ছুটির দিনে এখানে ঢল নামে বিভিন্ন বয়সের হাজার-হাজার নারী-পুরুষ দর্শনার্থী পর্যটকের।

কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে বেপরোয়া গতিবিধি ও আচরণে পানিতে ডুবে মৃত্যু হয় তিন তরুণ পর্যটকের। আর এ তিন পর্যটকের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় নড়ে-চড়ে বসে উপজেলা ও জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি। তারা বৈঠক করে মোটরসাইকেল চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়ার পাশাপাশি পর্যটক এবং পর্যটন শিল্প সংশ্লিষ্টদের বিধি-নিষেধের আওতায় এনে পর্যটকদের বিভিন্ন কায়দায় নিরুৎসাহিত করে পর্যটক প্রবেশ সুবিধা সীমিত পর্যায়ে নিয়ে আসেন।

কিশোরগঞ্জের করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী জানান, ঈদ উৎসবের সময়টাকে সামনে রেখে আমরা হাওর পর্যটন সুবিধা বন্ধ করতে চাচ্ছি না বরং বিস্তৃত করার পরিকল্পনা আছে। তবে, করোনার সোশ্যাল ট্রান্সমিশন এড়াতে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া মোটরসাইকেল নিয়ে উশৃংঙ্খল আচরণ করতে গিয়ে গভীর পানিতে মোটরসাইকেল নিখোঁজ হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। ঘটেছে পানিতে ডুবে তিন পর্যটকের মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনাও।

আর এ কারণে ওখানকার উপজেলা প্রশাসন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমরাও একমত। বিশেষ করে ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামে মোটরসাইকেল নিয়ে প্রবেশ নিষেধে ওখানকার সংসদ সদস্য মহোদয় রাষ্ট্রপতি পুত্র রেজওয়ান আহমেদ তৌফিক এমপিরও সম্মতি ও নির্দেশ রয়েছে।

তিনি দাবি করেন, আমরা মূলত গোটা হাওরাঞ্চলকেই পর্যটনের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যেই বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী আমাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেছেন। তিনি হাওর পর্যটনের “ফিজিবিলিটি স্টাডি’র জন্য একটি বিশেষ টিমও পাঠানোর কথা বলেছেন।

জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী আরও জানান, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে নৌ-যানে জীবন রক্ষাকারী লাইফ জ্যাকেটের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিকে।

আর এ শিল্পকে ঘিরে গড়ে উঠেছে আবাসিক-অনাবাসিক রেস্তোরাঁ, ভ্রাম্যমাণ রেস্তোরাঁ, ভ্রাম্যমাণ আবাসিক নৌযানসহ নাস্তা খাবারের জন্য অসংখ্য ছোট-বড় দোকান এবং ফেরি নৌকা। এক কথায় এ শিল্পকে এখন জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন হিসাবে বেছে নিয়েছেন বিভিন্ন বয়সের শত-শত নারী-পুরুষ। হাওর অর্থনীতির পালেও লেগেছে দুর্বার হাওয়া।

এ হাওর পর্যটন এলাকা সরেজমিন পরিদর্শনকালে নিকলী বেড়িবাঁধ পর্যটন এলাকায় স্পিডবোট, ইঞ্জিন চালিত নৌকা মালিক, আবাসিক-অনাবাসিক ও ভ্রাম্যমাণ হোটেল মালিক এমনকি ফেরিওয়ালা-হকারদের সঙ্গে কথা হয়। এ সময় তারা জানান, নিজেদের সহায় সম্বল বিক্রি করে এ শিল্পে জড়িয়ে নতুন জীবনের ঠিকানা পেয়েছেন। কিন্তু কঠোর বিধি-নিষেধ ও পাহারা বসিয়ে পর্যটক প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করায় তাদের মাথায় হাত পড়েছে।

তার দাবি, কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং পর্যটকদের জন্য কঠোর স্বাস্থ্য বিধি ও নিয়ম-কানুন মানার শর্ত এবং এ শিল্পের ব্যবসায়ী ও নৌযান মালিকদের প্রতি পর্যটকদের জন্য জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামাদি বাধ্যতামূলক করা জরুরি। আর এতে করে এ শিল্পের প্রতি পর্যটকদের আগ্রহ ও বিশ্বাস বাড়বে এবং অন্যদিকে হাওর অর্থনীতির আশীর্বাদ এ পর্যটন শিল্পেরও বিকাশ ঘটবে।