দশ বছরে বিসিএস ও নন-ক্যাডারে রেকর্ড নিয়োগ


টাইমস অনলাইনঃ
Published: 2018-12-22 09:16:51 BdST | Updated: 2019-12-06 09:13:28 BdST

বিভাষ বাড়ৈ : ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতা গ্রহণের পর অস্বচ্ছ নিয়োগ, প্রশ্নফাঁস আর দলীয়করণের মাধ্যমে যেসব প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তার মধ্যে একটি হলো সরকারী কর্মকমিশন (পিএসসি)। নিয়োগের জন্য দুই থেকে আড়াই বছরেরও বেশি অপেক্ষার কারণে দুর্বল ও বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল পিএসসি। তবে গত ১০ বছর বিতর্ক ছাড়াই একের পর এক বিসিএস ও নন-ক্যাডার পরীক্ষার মাধ্যমে রেকর্ডসংখ্যক নিয়োগের ফলে পাল্টে গেছে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিষ্ঠানের চেহারা। যেখানে ২০০১ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত নিয়োগের সুপারিশ ছিল মাত্র সাড়ে ১৬ হাজার। সেখানে গত ১০ বছরে নিয়োগ পেয়েছে সাড়ে ৫৪ হাজার প্রার্থী!

এদিকে পরিসংখ্যান বলছে, পিএসসির নতুন ভাবমূর্তির কারণেই মেধাবীরা এখন অনেক বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে বিসিএস ও নন-ক্যাডার নিয়োগ পরীক্ষায়। গত কয়েক বছর বিভিন্ন পাবলিক ও নিয়োগ পরীক্ষায় যেখানে প্রশ্নফাঁস একটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেখানে সরকারকে সবচেয়ে বেশি স্বস্তি দিয়েছে পিএসসি। ফলে প্রতিটি বিসিএসেই আবেদনকারী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ছে ব্যাপকভাবে। এ ছাড়া পিএসসিকে আরও বেশি জনবান্ধব করে তুলতে নেয়া হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোগ। গত কয়েক বছর পিএসসির নিয়োগের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য। পিএসসির চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক সার্বিক পরিস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে বলছিলেন, পিএসসি যে এখন শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে হাজার হাজার ক্যাডার ও নন-ক্যাডার নিয়োগের পরীক্ষা ও নিয়োগের সুপারিশ করতে পারছে তার অন্যতম কারণ হচ্ছে সরকার আমাদের সেই কাজের স্বাধীনতা দিয়েছে। একই সঙ্গে আমাদের কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও সরকার দিয়েছে বলে আজ একের পর এক নিয়োগের সুপারিশ আমরা করতে পারছি।

ড. সাদিক বলছিলেন, এক সময় এ প্রতিষ্ঠান অনেক প্রতিক‚লতার মধ্যে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একসঙ্গে একাধিক বিসিএস পরীক্ষা নিয়ে প্রতি বছর কমপক্ষে একটি বিসিএস পরীক্ষার ফলাফল আসছে। যা দেশের জন্য অনেক বড় একটি কাজ। বিসিএস ও নন-ক্যাডার নিয়োগের সর্বশেষ অবস্থা ও নতুন উদ্যোগ সম্পর্কে জানা গেছে, বর্তমানে ৩৭তম বিসিএসের নন-ক্যাডার পদের সুপারিশ করার কার্যক্রম চলছে। ৩৮তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার কার্যক্রম শেষ হয়েছে। ৩৯তম বিশেষ বিসিএস মৌখিক পরীক্ষার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ৪০তম সাধারণ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি জারির মাধ্যমে প্রার্থীদের কাছ থেকে আহবান করা হয়েছে। আবেদন গ্রহণের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে গত ১৫ নবেম্বর।

পাবলিক সার্ভিস কমিশন এখন অনলাইনে প্রার্থীদের আবেদন করার সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে প্রার্থীরা ঘরে বসে প্রবেশপত্র ডাউনলোড করতে পারছেন। মুঠোফোনে প্রার্থীদের পরীক্ষার সময়, তারিখ এবং স্থান সম্পর্কে অবহিত করা হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থের সাশ্রয় এবং পরীক্ষার্থীদের অনেক উৎকণ্ঠার অবসান হয়েছে। তাছাড়া কমিশনের ওয়েবসাইটে পরীক্ষা সংক্রান্ত সকল বিষয়ে তথ্য উপাত্ত ও ফলাফল নিয়মিত প্রকাশ হচ্ছে।

৩৮তম বিসিএস থেকে দুজন পরীক্ষকের মাধ্যমে উত্তরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতি কার্যকর হয়েছে। বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বাংলা ভার্সনের পাশাপাশি ইংরেজী ভার্সনে করা হচ্ছে। ৩৮তম বিসিএস থেকে সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। প্রতিবন্ধী প্রার্থী এবং তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থীদের পরীক্ষার সুযোগও ইতোমধ্যে তৈরি করা হয়েছে।

বিসিএস ক্যাডার পদের ফলাফল প্রস্তুতের জন্য CADS [Cadre Distribution Software] এবং নন-ক্যাডার পদের ফলাফল প্রস্তুতের জন্য উদ্ভাবিত সার্চ ইঞ্জিন [Search Engine] সফটওয়ারের মাধ্যমে ম্যানুয়াল পদ্ধতির পাশাপাশি দ্রুত সময়ে নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে। যা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা হ্রাস করতে কাক্সিক্ষত ভ‚মিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পিএসসি চেয়ারম্যান ড. সাদিক বলছিলেন, কমিশন যাতে আরও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে সে লক্ষ্যে অবকাঠামোগত সম্প্রসারণও করা হয়েছে। বিভাগীয় সদর দৃঢ়তরের কার্যালয়গুলো আরও কার্যকর করতে একটি সক্ষমতা প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনের বিবেচনাধীন আছে।

তবে দেশের শিক্ষিত যুব সমাজের কাছে যে তথ্য সবচেয়ে বেশি আশার আলো দেখাচ্ছে তা হচ্ছে দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কমিশনের নিয়োগ। নিয়োগের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০০১ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত ক্যাডার এবং নন-ক্যাডার মিলিয়ে কমিশনের সুপারিশ ছিল ১৬ হাজার ৯৮৭ প্রার্থী। এর মধ্যে ক্যাডার ১২ হাজার ৭৯৪ জন এবং নন-ক্যাডার ৪ হাজার ১৯৪ জন।

অন্যদিকে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত ক্যাডার এবং নন-ক্যাডার মিলিয়ে সুপারিশ হয়েছে ৫৪ হাজার ৫৩৬ প্রার্থীর। যাদের মধ্যে ক্যাডার ২৬ হাজার ৫৯২ জন এবং নন-ক্যাডার ২৮ হাজার ৪৫ জন।

এদিকে ২০১০ সালের নন-ক্যাডার বিধিমালা জারি করে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কিন্তু ক্যাডার পদে সুপারিশ পাননি এ রকম প্রার্থীদের মধ্য থেকে অনেক প্রার্থীকে নন-ক্যাডার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর বিভিন্ন গ্রেডে সুপারিশ করায় ক্যাডারের সমসংখ্যক প্রার্থী নন-ক্যাডারেও চাকরি পাচ্ছেন। এতে শিক্ষিত বেকারদের মধ্যে বিসিএস পরীক্ষার প্রতি ব্যাপক আগ্রহ বেড়েছে বলে পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলছেন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. আবদুল জব্বার খান। কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীনভাবে কাজ করছে। নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হওয়ায় চাকরিপ্রার্থীদের কাছে এটি এখন আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।



অন্যদিকে আসছে নতুন নতুন কিছু পদক্ষেপ। যার প্রভাব পড়ছে কমিশনের কাজেও। কমিশন সচিবালয়ে প্রশ্নপত্র মুদ্রণের জন্য নিরাপত্তা সংবলিত পৃথক প্রশ্নপত্র মুদ্রণ কক্ষ স্থাপন করা হয়েছে। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রশ্নপত্র মুদ্রণের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ৩৯তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষার ৪০ হাজার প্রার্থীর পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে। নন-ক্যাডার বিভিন্ন পদের লিখিত ও বাছাই পরীক্ষা স্বল্পতম সময়ে এবং প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগে নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল কর্মকর্তাদের কক্ষে তৈরি করা হতো। বর্তমানে পরীক্ষার ফলাফল প্রণয়নে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পদের জন্য পৃথক ফলাফল প্রণয়ন কক্ষ স্থাপন করা হয়েছে এবং সবচেয়ে অভিজ্ঞ সদস্যদের তত্ত্বাবধানে ফলাফল তৈরি করা হচ্ছে। কমিশন সচিবালয়ের পরীক্ষা হলকে অধুনিকায়ন ও সংস্কার করে মাল্টিপারপাস মিলনায়তনে রূপান্তরিত করা হয়েছে। মিলনায়তনটির নামকরণ ‘৭১ মিলনায়তন’ করা হয়েছে। কমিশন সচিবালয়ের প্রথম তলায় ‘মুক্তির পথযাত্রা’ শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধ কর্ণার স্থাপন করা হয়েছে।

এছাড়া কমিশন সচিবালয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘ম্যুরাল’ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রজাতন্ত্রের শহীদ কর্মকর্তা/কর্মচারীদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিফলক ‘মৃত্যুঞ্জয়ী’ স্থাপন করা হয়েছে। লাইব্রেরির আধুনিকায়ন করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ প্রশ্নকারক ও মডারেটরদের ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় বইসহ ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধাসহ পৃথক কম্পিউটার দেয়া হয়েছে।

বিসিএস পরীক্ষা ও অন্যান্য নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ পরীক্ষার জন্য প্রশ্ন ব্যাংক করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে জানিয়ে চেয়ারম্যান ড. সাদিক বলেছেন, ইতোমধ্যে নন-ক্যাডার নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ব্যাংক হতে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করে পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে। ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষা হতে লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র দুজন পরীক্ষক দিয়ে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। দুজন পরীক্ষকের মধ্যে নম্বরের পার্থক্য ২০% বা তার বেশি হলে তৃতীয় পরীক্ষক দিয়ে উক্ত উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হবে।

তবে তারপরও বিভিন্ন মহল থেকে মাঝে মাঝে পরীক্ষা ও ফল প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক বলছিলেন, আসলে কি, দেখে মনে হয় বিসিএস শুধু ২৭টি ক্যাডারের একটি বিসিএস পরীক্ষাই নেয়। কিন্তু এই পরীক্ষা নিতেই যে কত ধরনের পরীক্ষা ও প্রশ্ন প্রণয়ন ও বিতরণের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তা অনেকেই ভাবেন না।

শুধু শিক্ষা ক্যাডারেই ৭৯ রকমের প্রশ্ন করতে হয়। এসব পরীক্ষার খাতা নিরীক্ষণে সময় লাগে। ক্যাডার ছাড়াও নন-ক্যাডারের অনেক পরীক্ষা নিতে হয়। এটা হচ্ছে বাস্তবতা। কথা হচ্ছিল কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. আবদুল জব্বার খানের সঙ্গে। তিনিও বলছিলেন, অন্যান্য পরীক্ষা ও ফল দ্রুত হয় না বলে অনেকেই হয়তো মনে করেন কাজ হচ্ছে না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এক সময় কমিশনের পরীক্ষা যেমন কম ছিল তেমনি প্রার্থীও কম ছিল। এখন পরীক্ষার সংখ্যা প্রার্থী বাড়ার পরেও নিয়োগ পাচ্ছে রেকর্ডসংখ্যক প্রার্থী। তাই এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না কমিশন এখন সবচেয়ে ইতিবাচক মর্যাদা নিয়ে কাজ করছে।