এইচএসসিতে ফেল: ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মহত্যা


টাইমস অনলাইনঃ
Published: 2017-07-26 21:00:20 BdST | Updated: 2018-08-14 21:45:40 BdST

মঙ্গলবার শ্রাবণের আকাশ সকাল থেকেই মেঘে পরিপূর্ণ ছিল। তাই সারাদিন অঝোর ধারায় শ্রাবনের বৃষ্টি পড়ছিল।এমন দিনে বিকেলে হঠাৎ খবর ছড়িয়ে পড়ল অরিন্দম বরুয়া সৈকত নামের একজন শিক্ষার্থী ফাঁসিতে ঝুলে আত্নহত্যা করেছে।

অরিন্দম বরুয়া সৈকত। থাকতেন কুমিল্লা নগরীর মগবাড়ি চৌমুহনী এলাকায়। কুমিল্লার সাদা মনের মানুষ খ্যাতনামা সাংবাদিক অশোক বরুয়ার সন্তান ।দুই ভাই-বোনের মধ্যে সে ছোট।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারি ছিলেন সৈকত। পড়ালেখা, সংস্কৃতি, মানবিকতা প্রায় কাজেই তার অংশগ্রহণ ছিল। কুমিল্লা জিলা স্কুল থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে স্বপ্নে

র পথে এক ধাপ ধাবিত হলেন। পরে ভর্তি হলেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অংশ নিলেন এবারের এইচএসসি পরীক্ষায়। স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক কিংবা প্রকৌশলী হওয়ার। এবার ফলাফল পাওয়ার বেলা।

 

ফলাফল পাওয়ার আগের দিনই ২২ জুলাই সকাল ৯ টা ৯ মিনিটে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিলেন সৈকত। তা ছিল-

ÒAll my bags are packed, I’m ready to go!!

আজকে রাতেই ডিসিশন হবে,এই ঘরে আর থাকতে পারবো কিনা!
ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছি। মানিব্যাগ ও মোটামুটি ভর্তি।
এখন শুধু রেজাল্টটা পাওয়ার অপেক্ষায়  ,কারো বাসায় জায়গা দিবা আমাকে? ”

২৩ জুলাই। এইচএসসির ফলাফল ঘোষণা হল। কুমিল্লায় ফলাফল বিপর্যয় হল। সেই বিপর্যয়ে পড়ল সৈকতের মত মেধাবী ও সম্ভাবনাময় একটি ভবিষ্যত। যে বিষয়টিতে সে অভ্যস্ত ছিল না, সেই করাল স্রোতে ভেসে গেল সৈকত। চারদিকের অন্ধকার ভর করলো তার উপর। এরপরই হয়তো জীবনের একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে সম্ভাবনায় মুখ সৈকত।

এরপর ২৩ জুলাই সকাল ১০ টা ৩ মিনিটে সৈকত তার এফবিতে একটি স্ট্যাটাস দিলেন। সেটি ছিল- “মৃত্যু কি শ্রেয় নয়?”

 

এরপরই বিকেল ৩ টায় আরো একটি স্ট্যাটাস দিলেন- “হেরে গেলাম”।

২৪ জুলাই সকাল পৌণে ৯ টায় আরো একটি স্ট্যাটাস দিলেন- “Hanging is a way that is used by many countries around the world to kill those who are given a death penalty. It is considered one of the quickest and easiest ways to kill someone. It is an extremely common way of suicide. When the person is choked it only takes about 5 to 10 seconds for them to lose consciousness before they die ”

‘ অনেক দেশে ফাঁসি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া, এটি মৃত্যুর দ্রুত ও সহজ পথ, আত্মহত্যার ও এটি স্বাভাবিক পথ’।

ঠিক এর ৬ মিনিট পর লিখেছে ‘ সবাইকে মিস করবো, ভালোবাসি সবাইকে ‘।

সকাল ৯ টা ৫৯ মিনিটে শেষবারের মত আরো একটি স্ট্যাটাস দিলেন সৈকত। সেটি ছিল

“এতো জিপিএ ৫-পাশের ভীড়ে,
আমার স্ট্যাটাস গুলো কী কারো চোখে পড়ে?
পড়বে না। পরার কথাও না।

যেদিন আমার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়বে এই নীল সাদার দুনিয়ায়,যেদিন আমার মৃত্যুর খবর পত্রিকায় ছাপবে…ঠিক সেইদিন হয়তো “miss you” #R

IP হ্যাশট্যাগে ভড়ে উঠবে ফেইসবুক ওয়াল।
আমার সাথেই চলে যাবে আমার না বলা কথা গুলো!
এইটাই তো দুনিয়া। এইটাই তো একজন মানুষের মৃত্যু পরবর্তী অন্তস্টিক্রিয়া!
এটাই তো হেরে যাওয়া এক সৈনিকের প্রাপ্তি!”

এ কথা গুলোই ছিলো সৈকতের ফেসবুক ওয়ালের শেষ কথা। এ স্ট্যাটাস পরে অনেক বন্ধু কমেন্ট করেছে পাগলামি না করার জন্য, জীবন অনেক বাকি,করার অনেক সময় আছে। কিন্তু কোন অনুরোধই ঠেকাতে পারেনি সৈকতকে।

সৈকতের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে বন্ধু মহল, শিক্ষক মহল ও আত্মীয় স্বজনের মাঝে শোকের ছায়া ছড়িয়ে পরে।

বুধবার অন্তস্টিক্রিয়ার মাধ্যমে শেষবারের মত পরিবার-স্বজন, প্রিয় বন্ধুদের ছেড়ে এ পরপারে চলে যাবেন বহুমুখী গুণের অধিকারী সকলের প্রিয় সৈকত।

পরীক্ষার ফলাফল এমন হবে ভাবতেই পারেননি সৈকত। হয়তো ভেবেছিলেন জিপিএ ৫ না পেলে কিভাবে ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন। কিন্তু এমন ফলাফল তো প্রত্যাশা করেননি সৈকত। এমন ফলাফলে কার দোষ ছিল। সৈকত পরীক্ষার খাতায় যথাযথ উপস্থাপন করতে পারেননি নাকি শিক্ষকদের খাতা মূল্যায়ণে কোথাও ভুল ছিল। সৈকত অপেক্ষা করতে পারতো ।

 

পুনঃনিরী

ক্ষণ এর  জন্য আবেদন করতে পারতো। প্রতিবছর তো অনেক ফলাফল পরিবর্তন হয়। কিন্তু সৈকত কেন এমন করলেন ? তার মত মেধাবী কেন সবাইকে কাঁদিয়ে এ নিষ্ঠুর পথ বেছে নিলেন।

সে চলে গেছে । কিন্তু দেশ হারা

লো একজন মেধাবী মুখ। পরিবার-প্রিয়জন আজীবনের জন্য দুঃখের ভেলায় ভাসঁবে । এটা ঠিক করোনি সৈকত ।

তার কষ্ট পাওয়া আত্না শান্তি পাক। এমন ভুল সিদ্ধান্ত কেউ যেন আর না নেয়। কারণ ব্যর্থতার পরই সাফল্য আসবে। কারণ হারের কারণেই জয়ের স্পৃহা জাগে। আমাদের সন্তানরা যেন এ ভুল পথ আর বেছে না নেয়। অরিন্দমের মত মেধাবী শিক্ষার্থীদের আমরা হারাতে চাই না।

এর দায়ভার শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষকদেরও আছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে। শিক্ষা কার্যক্রমও ভালোমত মনিটরিং করে না শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ। তাই এসব দুঘর্টনার দায়ভার শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এড়াতে পারে না।

এমএসএল 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।