সাইবার অপরাধের শিকার ৬৮ শতাংশ নারী


টাইমস ডেস্ক
Published: 2019-09-29 21:58:51 BdST | Updated: 2019-10-14 10:42:35 BdST

ইন্টারনেট ব্যবহার করতে গিয়ে প্রায় ৬৮ শতাংশ নারী সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে নতুন চার ধরনের সাইবার অপরাধের প্রবণতা বেড়েছে। অপরাধের শিকার হয়ে একটি বড় অংশই অভিযোগ করেন না। ‘বাংলাদেশে সাইবার অপরাধের প্রবণতা” শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

রোববার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন (সিসিএ ফাউন্ডেশন)। সাইবার সচেতনতা মাস অক্টোবর ২০১৯ উপলক্ষে এই প্রতিবদেন প্রকাশ হয়। এতে সহ আয়োজক ছিল নবগঠিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন থিংক ট্যাঙ্ক ফর সিকিউর ডিজিটাল বাংলাদেশ।

অনুষ্ঠানে গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন সিসিএ ফাউন্ডেশনের সভাপতি কাজী মুস্তাফিজ। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের সঙ্গে সমান্তরাল হারে বাড়ছে সাইবার অপরাধ। সহিংস উগ্রবাদ, গুজব, রাজনৈতিক অপপ্রচার, মিথ্যা সংবাদ, গ্যাং কালচার, আত্মহত্যা, পর্নোগ্রাফি, সাইবার বুলিং, জালিয়াতি, চাঁদাবাজি, পাইরেসি, আসক্তি- এর সবই হচ্ছে প্রযুক্তির মাধ্যমে। বাস্তব জীবনে ঘটমান অপরাধগুলো এখন ডিজিটাল মাধ্যমে স্থানান্তরিত হচ্ছে।

প্রতিবেদন বলছে, দেশে ৪ ধরণের সাইবার অপরাধের প্রবণতা বেড়েছে। অপরদিকে সাইবার অপরাধে আক্রান্তের ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে- এদের মধ্যে বেশিরভাগ ভুক্তভোগীর বয়স ১৮-৩০ বছরের কম। পরিসংখ্যানে ভুক্তভোগীদের দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে শিশু। ১৮ বছরের কম বয়সী এই ভুক্তভোগীদের হার ১১ দশমিক ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে ৩০-৪৫ বছর বয়সী প্রযুক্তি ব্যবহারকারী ভুক্তভোগী ৩ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং ৪৫ বছরের বেশি ভুক্তভোগীদের হার মাত্র ০.৪৭ শতাংশ।

কাজী মুস্তাফিজ গবেষণা প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, বর্তমানে ভার্চুয়াল জগতে বাংলাদেশের প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের মধ্যে ১১ ধাপে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এর মধ্যে চারটিই নতুন ধারার অপরাধ। ২০১৬-১৭ সালের তালিকাতেও এমন অপরাধের আলামত মেলেনি। তবে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সাইবার জগতে মাত্রার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিচিত্ররূপে হাজির হচ্ছে এই অপরাধ। আমজনতার মধ্যে এই অপরাধে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আক্রান্তদের মধ্যে নারী ভুক্তভোগীদের সংখ্যা বেড়েছে ১৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। তবে ভুক্তভোগীদের ৮০ দশমিক ৬ শতাংশই আক্রান্ত হওয়ার পরও আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেন না।

জরিপে দেখানো হয় গতবারের চেয়ে এবার সাইবার অপরাধে ভুক্তভোগী নারীদের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এবার এই হার ৬৭ দশমিক ৯ শতাংশ। গতবার ছিলো ৫১ দশমিক ১৩ শতাংশ। অপরাধের জেন্ডারভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বেশিরভাগ অপরাধে ভুক্তভোগী নারীর সংখ্যাই বেশি। এরমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের শিকারে সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছেন তারা। এতে নারীর হার ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ এবং পুরুষ ৬ দশমিক ০৫ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে অনলাইনে বার্তা পাঠিয়ে হুমকি। এখানে ৩ দশমিক ৭২ শতাংশ পুরুষ ভুক্তভোগী হলেও নারীর হার ১৪ শতাংশ। অপরাধের ধরণে তৃতীয় অবস্থানে থাকা ছবি বিকৃতি করে অনলাইনে অপপ্রচারের শিকার হওয়া নারীর হার ১১ দশমিক ২ শতাংশ; পুরুষ ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ।


প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান খান বলেন, আমরা ব্যর্থতার জন্য সরকারকে দায়ী করি। ভোটাধিকার গেছে, সেটা নিয়ে কথা বলি, দরকার আছে। কিন্তু এসব নিয়ে যতটা চিন্তা করি, তার চেয়ে একদম সম্পূর্ণ ভিন্ন। নতুন জগৎ সাইবার ওয়ার্ল্ড, সেটি নিয়ে ততটা চিন্তা করি না। আইন আমাদের ১০ থেকে ২০ ভাগ সুরক্ষা দিতে পারে, বাকিটা সচেতনতার মাধ্যমেই করতে হবে। সাইবার জগতে পরিবারকে বাঁচাতে হবে নিজেকেই।

থিংক ট্যাংক ফর সিকিউর ডিজিটাল বাংলাদেশের আহ্বায়ক কম্পিউটার প্রকৌশলী সৈয়দ জাহিদ হোসেন বলেন, কম্পিউটার এখন আমাদের জন্য শৌখিন কোনো বস্তু নয়, নিত্য প্রয়োজনীয়। অপরাধীরা আগের মতোই অপরাধ করছে, তবে ধরন পরিবর্তন হয়েছে। ইন্টারনেটের সুন্দর সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে অপরাধীরা ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেয় এবং পরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটায়। এর জন্য কোনো কারিগরি জ্ঞান দরকার হয় না। এগুলোকে বলে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। অপরাধীরা অর্থনৈতিক লাভের জন্য এসব করে।

প্রযুক্তিবিদদের আন্তর্জাতিক সংগঠন আইসাকা ঢাকা চ্যাপ্টারের ডিরেক্টর (মার্কেটিং) মাহবুব উল আলম বলেন, সন্তান সাইবার জগতে কার সঙ্গে মিশছে, তার বন্ধু কে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, এসব বাবা-মায়েদের খেয়াল রাখতে হবে। তিনি বলেন, সাইবার খাতে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় নিজেদেরই নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য পেশাদার সাইবার নিরাপত্তা প্রকৌশলী তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মাহমুদা আফরোজ বলেন, দিন দিন সাইবার অপরাধ বাড়ছে। আমাদের অজান্তেই অনেক তথ্য অন্যের কাছে চলে যাচ্ছে। এ জন্য এসব বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো দরকার। ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে সচেতনতা অবলম্বন করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা সব সময় পরামর্শ দিই মেসেঞ্জারের গোপনীয় বিষয়গুলো ডিলিট করতে। কারণ, এমন বহু ঘটনা ঘটেছে যে, কারও ফেসবুক হ্যাক (বেদখল) করে মেসেঞ্জারের একান্ত ব্যক্তিগত গোপন তথ্য ও ছবি নিয়ে টাকা দাবি করা হচ্ছে।

সাংবাদিক শাহরোজা নাহরিন বলেন, দৈনন্দিন কাজের নানা ব্যক্তিগত তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিয়ে দিচ্ছি আমরা। অপরাধীরা এগুলো কাজে লাগাচ্ছে। শিশুদের হাতে স্মার্টফোন দিয়ে দেওয়ার পর সেখানে কার্টুন দেখার নামে কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট দেখানো হচ্ছে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন সিসিএ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক নুরুন আশরাফী।

এসএম/ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯