'বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি শিক্ষা স্যুট-বুট পরা কেরানি বানাচ্ছে'


টাইমস অনলাইনঃ
Published: 2017-12-24 23:34:09 BdST | Updated: 2018-06-22 13:42:01 BdST

বর্তমান সময়ের অর্থনীতি শিক্ষাকে নীতিহীন ও জনকল্যাণবিমুখ বলে অভিহিত করেছেন অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যে অর্থনীতি পড়ানো হচ্ছে, তা শুধু স্যুট-বুট পরা কেরানি তৈরি করছে। তাই দর্শন ও নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া বর্তমান অর্থনীতি শাস্ত্রের পাঠ্যক্রমে বড় ধরনের সংস্কার আনার ওপর জোর দেন তিনি।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির দ্বিবার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে বৃহস্পতিবার ‘বিপর্যস্ত অর্থনীতি শাস্ত্র: বিপর্যয় কোথায় ও কী করা’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে এসব কথা বলেন অধ্যাপক আবুল বারকাত। রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এ বিশেষ অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন।

আবুল বারকাত বলেন, অর্থনীতি শাস্ত্র ৫০০ বছর ধরে যেভাবে এগিয়েছে তা থেকে এটা স্পষ্ট যে এ শাস্ত্র জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে অথবা এ শাস্ত্র জনকল্যাণের কথা ভাবেনি। তাঁর মতে, অর্থনীতি শাস্ত্রে এখন তিনটি বড় ধরনের ব্যর্থতা রয়েছে। এগুলো হলো বুদ্ধিবৃত্তিক, নীতি-নৈতিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, পুঁজিবাদী বাজারব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেই নিজেকে সংশোধন করে নেয়, এই চিন্তাধারাই অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতা।

নীতি-নৈতিকতার ব্যর্থতার ব্যাখ্যায় অর্থনীতি সমিতির সাবেক এই সভাপতি বলেন, ‘আমরা শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যই প্রবৃদ্ধি পূজা করেছি, ভালো জীবনের জন্য নয়।’ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান ফলপ্রদ বাজার তত্ত্বে বিশ্বাসী। এ কারণে এসব প্রতিষ্ঠান মনে করে, অর্থবাজারকে তেমন নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজন নেই।

আবুল বারকাত

অধিবেশনের প্রবন্ধে বলা হয়, অর্থনীতিতে যাঁরা উচ্চতর সনদ অর্জন করছেন, তাঁদের এখন চাণক্য, অ্যারিস্টটল, এডাম স্মিথ, কার্ল মার্ক্স জানার প্রয়োজন যেমন পড়ে না; একইভাবে তাঁদের এখন মানুষ, সমাজ, ইতিহাস, রাজনীতির বিবর্তন ও বৈশিষ্ট্য না জানলেও চলে। দর্শন ও নৈতিকতা থেকে অর্থনীতি শাস্ত্রের এখন স্থায়ী বিচ্ছেদ ঘটেছে। সামাজিক বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখা-প্রশাখার মতো অর্থনীতি এখন খণ্ডিত ও গণ্ডিবদ্ধ। চাহিদা-সরবরাহের চিরাচরিত বিধি ও তার সঙ্গে সম্পর্কিত গাণিতিক মডেলের বাইরে ছাত্রদের বেশি কিছু না জানলেও চলে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অর্থনীতি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু সংস্কারের প্রস্তাবও তুলে ধরা হয় প্রবন্ধে। সেখানে বলা হয়, সামষ্টিক ও ব্যষ্টিক অর্থনীতির জ্ঞানের সঙ্গে স্নাতক পর্যায়ে দর্শন, ইতিহাস, গণিত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান ও রাজনীতি নিয়ে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্কুলের সঙ্গে অর্থনীতি শাস্ত্রের ছাত্রদের সম্পৃক্ত করতে হবে।

অধিবেশনে সভাপতির বক্তব্যে মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, সাধারণ মানুষের জীবনে সমস্যা দুটো। একটা হলো সে কীভাবে বাঁচবে, আরেকটা হলো বাঁচার জন্য কী করতে হবে। পুঁজিবাদের বিকল্প সাম্যবাদ সাধারণ মানুষকে তেমন কিছু দিতে পারেনি। সাম্যবাদের দর্শন যদি এতই আকর্ষণীয় হয় তাহলে রাশিয়া ও চীন শুধু রাজনীতির জন্য সাম্যবাদ, আর অর্থনীতির জন্য বাজার ব্যবস্থার কাছে যেত না। এই প্রশ্নের উত্তর অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিকদের খুঁজতে হবে। অর্থনীতির সঙ্গে নৈতিকতার একটি সর্বজনীন যোগসূত্র বের করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই গভর্নর আরও বলেন, অর্থনীতি শাস্ত্রকে অবশ্যই নৃতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞানসহ সব বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয় করেই অগ্রসর হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীকে এক সেমিস্টারের জন্য গ্রামে পাঠানো উচিত। অর্থনীতিতে নৈতিকতার চর্চা বাড়ানোর পাশাপাশি আচরণগত দিক নিয়েও আলোচনায় গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ অর্থনীতি হলো মূলত মানুষের খাসলত বা চিন্তাভাবনার ফসল।

তিন দিনব্যাপী এ দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে উদ্বোধনী অধিবেশন ছাড়া গতকাল মোট চারটি অধিবেশন ছিল। মধ্যাহ্নভোজের আগে আয়োজিত অধিবেশনের বিষয়বস্তু ছিল ‘অর্থশাস্ত্র ও নৈতিকতা: জনকেন্দ্রিক উন্নয়ন’। ইমেরিটাস অধ্যাপক এম এ সাত্তার মণ্ডলের সভাপতিত্বে এই অধিবেশনে মূল বক্তা ছিলেন পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ। তিনি বলেন, যাদের কাছে অর্থ আছে, সমাজে তারাই এগিয়ে যাচ্ছে। নতুনেরা বাজার প্রতিযোগিতায় ঢুকতে পারছে না। সমাজে নানা ক্ষেত্রে বৈষম্য বেড়েছে, এটা মোটেই সুখকর নয়।

এরপরের অধিবেশনের বিষয়বস্তু ছিল ‘অর্থশাস্ত্র ও নৈতিকতা: বাংলাদেশে ভূমি গ্রাস প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক অর্থনীতি’। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে এ অধিবেশনে মূল বক্তা ছিলেন অধ্যাপক স্বপন আদনান। সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সারা দেশে বিসিকের অনেক জমি অব্যবহৃত পড়ে আছে। কিন্তু কেন এসব জমি অব্যবহৃত পড়ে আছে, তার কোনো সঠিক ব্যাখ্যা নেই।

দিনের অপর অধিবেশনের বিষয়বস্তু ছিল ‘কৃষির রূপান্তর, কৃষকের অর্থনীতি ও নৈতিকতার প্রশ্ন: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’। এতে মূল বক্তা ছিলেন ইমেরিটাস অধ্যাপক এম এ সাত্তার মণ্ডল।

ফাইল ছবি 

বিডিবিএস 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।