শরতের কাশফুল শুভ্রতার প্রতীক


Dhaka
Published: 2019-09-22 02:46:46 BdST | Updated: 2019-12-15 00:01:56 BdST

শরতের সৌন্দর্য উপস্থাপন করেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন ‘‘শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি, ছড়িয়ে গেল ছাপিয়ে মোহন অঙ্গুলি৷''

ছয় ঋতুর দেশ আমাদের বাংলাদেশ। বিশ্বের সকল দেশে ছয়টি ঋতুর আগমন কখনই ঘটে না। বাংলাদেশে প্রতি ঋতুরই রয়েছে আলাদা আলাদা পরিচয়। আর ঋতুর পার্থক্য ফুটে ওঠে ফুলে। শরতে সাদা কাশফুল আর শিউলির আধিপত্য ছাড়াও ফোটে আরও অনেক সহচরী ফুল।

শরৎ এ ঝকঝকে নীল আকাশ। মৃদু বাতাস দোলা দিচ্ছে তাদের নরম পাপড়িতে। এই তো চিরচেনা শরত। চারদিকে কাশফুল আর কাশফুল। যেন খসে পড়েছে রাতের ঝলমলে তারা। মাটিতে মিশে গেছে তার গন্ধ। ছোট ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে নামে শিউলি ফুল কুড়োতে। আর পাল্লা দিয়ে চলে মালা গাঁথার প্রতিযোগিতা, কিন্তু এখনকার সময়ে সবই স্মৃতি।

ভাদ্র ও আশ্বিন মাস মিলে শরৎ বাংলার ষড়ঋতুর তৃতীয় ঋতু। শরৎকে ইংরেজিতে "অটাম" বলা হলেও উত্তর আমেরিকায় একে "ফল" হিসেবে ডাকা হয়। পৃথিবীর ৪টি প্রধান ঋতুর একটি হচ্ছে শরৎকাল। উত্তর গোলার্ধে সেপ্টেম্বর মাসে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে মার্চ মাসে শরৎকাল গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের মধ্যবর্তী ঋতু হিসেবে আগমন করে।

শরতের স্নিগ্ধতাকে আরও মোহময় করে এ মৌসুমের বিচিত্র ফুলেরা। নদী কিংবা জলার ধারে ফোটে কাশ-কুশ, ঘরের আঙিনায় ফোটে শিউলি বা শেফালি, খাল-বিল-পুকুর-ডোবায় থাকে অসংখ্য জলজ ফুল।

.

শরৎকে বলা হয় শুভ্রতার প্রতীক! সাদা কাশফুল, শিউলি, স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না, আলোছায়ার খেলা দিনভর- এইসব মিলেই তো শরৎ। শরৎকালের প্রথম মাস অর্থাৎ ভাদ্রের শুরু থেকেই শরতের আবির্ভাবটা লক্ষণীয়। শরতের স্নিগ্ধতা এক কথায় অসাধারণ! জলহারা শুভ্র মেঘের দল যখন নীল, নির্জন, নির্মল আকাশে পদসঞ্চার করে তখন আমরা বুঝতে পারি শরৎ এসেছে। শরতের আগমন সত্যিই মধুর।

শুভ কাজে কাশফুলের পাতা বা ফুল ব্যবহার করা হয়। মূল ব্যবহার হয় ঔষধি হিসেবে। কাশফুলের বেশ কিছু ঔষধি গুণ রয়েছে। যেমন- পিত্তথলিতে পাথর হলে নিয়মিত গাছের মূলসহ অন্যান্য উপাদান দিয়ে ওষুধ তৈরি করে পান করলে পিত্তথলির পাথর দূর হয়। কাশমূল বেটে চন্দনের মতো নিয়মিত গায়ে মাখলে গায়ের দুর্গন্ধ দূর হয়। শরীরের রঙ হলে উঠে দিনদিন শুভ্র। এছাড়াও শরীরে ব্যথানাশক ফোঁড়ার চিকিৎসায় কাশের মূল ব্যাবহৃত হয়।
কাশফুলের উদ্ভিদতাত্ত্বিক বৈজ্ঞানিক নাম হল Saccharum spontaneum. এরা ঘাসজাতীয় জলজ উদ্ভিদ। চিরল পাতার দু’ধারে খুবই ধার। পালকের মতো নরম এর সাদা ফুল। আর তাই তো শরতের শিউলী ফুল নিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম গেয়েছেন : ‘শিউলী ফুলের মালা দোলে/ শারদ রাতের বুকে ঐ’। শরতের প্রথম প্রভাতে সেই শিউলিফুল ফুটবে, তার বিকশিত রূপ আর গন্ধ ছড়াবে বাতাসে। আমোদিত হবে প্রকৃতি আর সেই সাথে প্রফুল্ল এবং উৎফুল্লচিত্ত হয়ে উঠবে মানুষ এবং এই রসহীন নগরজীবনে যারা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে, তারাও সচকিত হবে শরতের সুরভিমাখা নিমন্ত্রণে। সেই কবে যারা পলি¬র স্নেহসান্নিধ্য ছেড়ে জীবিকার তাগিদে ইট-পাথরের বিরস কঠিন-কঠোর নগরযাপন শুরু করেছে, তারাও আজ উপলব্ধি করবে : সত্যিই তো শরৎ এসেছে, আকাশে-বাতাসে তারই সৌরভ, প্রীতিগন্ধময় আবেশ ছড়ানো দিন আজ।

শরতের মনভোলানো প্রকৃতিতে মন যে কী চায়, তা বোঝা বড়ই মুশকিল! রোদ আর মেঘের লুকোচুরি খেলায় মনেও যেন জমে মেঘ, আবার কখনো হয়ে ওঠে রৌদ্রকরোজ্জ্বল। কিন্তু ব্যস্ত এ নগরে, শত ব্যস্ততার মাঝে আমরা পারি না মনের আকাঙ্খায় শরতের রঙে সাজাতে। তবু যেন মনে হয় হারিয়ে যাই-শরতের কাশফুল, গোধূলি, শিউলি আর জ্যোৎস্নার মাঝে। প্রিয়জনের হাত ধরে অনুভব করি স্নিগ্ধতা।

শরতের স্তব্ধতা যেন দূর গ্রামের দিগন্তরেখার নিচে ঘনায়মান সন্ধ্যার মতোই শান্ত ও মধুর। এমন মধুর একটি ঋতু শুধু ভাবনায় নয়, বাস্তবেও নির্মাণ করা সম্ভব। যদিও পরিবর্তিত জলবায়ুর কারণে শরতের অপরূপ সেই রূপ-মাধুর্য এখন আর আগের মতো নেই। তবুও ঋতুচক্রে শরৎ আসে। আর এই ঋতুচক্রের বর্ণিল দোলায় উদ্ভাসিত হোক স্নিগ্ধ শরতের শুভ্র কাশফুল।

মডেলঃ শারমিন সুলতানা

ফিচারঃ হাসিব আল আমিন