দুঃসময়ে ক্যাম্পাসের প্রাণীগুলোর বন্ধু তাঁরা


Prothomalo.com // Dhaka
Published: 2020-06-09 23:26:19 BdST | Updated: 2020-07-05 06:01:00 BdST

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জীবেপ্রেম’
উজ্জ্বল সাহা

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) এমন চেহারা দেখলে শিক্ষার্থীদের তো বটেই, যে কারোরই মন খারাপ হওয়ার কথা। একদম সুনসান। হইচই নেই, আড্ডা নেই। ক্যানটিনের টেবিলগুলোর ওপর পড়ে আছে শুকনো পাতা। এ নিস্তব্ধতার মধ্যে কিছুটা প্রাণের সঞ্চার হয়, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মৌমিতা রায় ক্যাম্পাসে আসেন। কারণ, মৌমিতাকে দেখলেই ছুটে আসে ক্যাম্পাসে থাকা কুকুরগুলো। শুধু যে খাবারের আশায় তা নয়, নিশ্চয়ই ভালোবাসা থেকেও।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী মৌমিতার সঙ্গে আছেন তাঁর বন্ধু অশেষ রায়। অশেষ খুলনা শহরের আজম খান কমার্স কলেজে পড়েন। ফাঁকা ক্যাম্পাসের ক্ষুধার্ত কুকুরগুলোর জন্য খাবার নিয়ে আসেন দুজন। সরকারি নির্দেশনায় ক্যাম্পাস যখন বন্ধ হলো, সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিপাকে পড়ে গেল কুকুরগুলোও। শিক্ষার্থী নেই, দোকানপাট বন্ধ। জনমানবশূন্য ক্যাম্পাসে কুকুরগুলো খাবারের অভাবে ভুগছিল। তখন এগিয়ে এসেছেন মৌমিতা ও অশেষ। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পুরো খুলনা শহরের আনাচকানাচেই এ প্রাণীগুলোর জন্য খাবার নিয়ে ছোটেন দুই বন্ধু। তাঁরা এ কার্যক্রমের নাম দিয়েছেন ‘জীবেপ্রেম’।

জানা গেল, মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে কাজ শুরু করেন তাঁরা। সপ্তাহে তিন দিন খুবি ক্যাম্পাসসহ শহরের প্রায় ১৫টি জায়গায় ঘুরে ঘুরে কুকুরগুলোর খাবারের ব্যবস্থা করেন। প্রায় ১০ কেজি চাল ও ২ কেজি মুরগি দিয়ে তৈরি প্রায় ৭০ প্যাকেট খাবার তুলে দেন শহরের ৮০টির বেশি কুকুরের মুখে। তাঁদের এ কর্মযজ্ঞে সহায়তা করেছেন অনেকেই। তাঁদের মধ্যে আছেন ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, রাজনীতিকসহ অনেকেই। মৌমিতা বলছিলেন, ‘আমাদের কার্যক্রম দেখে খুলনার বড় বাজারের এক চাল ব্যবসায়ী একবার নিজেই এগিয়ে এলেন। ৪৫ টাকা কেজি চালের দাম তিনি ২৫ টাকা করে রেখেছেন। এ দামে আমরা প্রায় ৬০ কেজি চাল কিনেছি। সবাই যে যাঁর জায়গা থেকে একটু মানবিক হলেই কিন্তু অবলা প্রাণীগুলোও এ দুঃসময়ে বাঁচতে পারে।’ শুরুতে সরকারি অনুমতি না থাকায় বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল মৌমিতা ও অশেষের কর্মকাণ্ড। কিন্তু খুলনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসলাম বাহারের সহায়তায় সে বাধাও কাটিয়ে ওঠেন তাঁরা।

মৌমিতা মনে করেন, সব প্রাণী নিয়েই আমাদের পৃথিবী। এ দুঃসময় আমাদের সেটা আরও ভালো করে শিখিয়েছে। তাই মানবিকতা চর্চার সুযোগ এখন।

 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল ক্যাম্পাস ঘুরে ঘুরে কুকুরদের খাওয়ান মাহফুজজাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল ক্যাম্পাস ঘুরে ঘুরে কুকুরদের খাওয়ান মাহফুজজাহাঙ্গীরনগরে মাহফুজ ও তাঁর বন্ধুরা

কানিজ ফাতেমা

ভিডিওটা দ্বিতীয়বার দেখার মতো। এক তরুণ সাইকেল চালাচ্ছেন। তাঁকে ঘিরে দলবেঁধে হাঁটছে কয়েকটি কুকুর। ফেসবুকে কিছুদিন আগে যিনি ভিডিওটি দিয়েছেন, তাঁর নাম মাহফুজুর রহমান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। গত ১৯ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সবাই যখন ক্যাম্পাস ছাড়লে, মাহফুজ থেকে গিয়েছিলেন ক্যাম্পাসসংলগ্ন তাঁর ভাড়াবাসায়, ক্যাম্পাসের এ প্রাণীগুলোর কথা ভেবে। সব যদি বন্ধ হয়ে যায়, প্রাণীগুলো খাবার পাবে কোথায়!

প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা থেকেই ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক রেসকিউ অর্গানাইজেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান চালু করেছিলেন তিনি। সাপ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, প্রকৃতির কথা মাথায় রেখে লোকালয়ে চলে আসা সাপ মেরে না ফেলে উদ্ধার করে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে অবমুক্ত করা, এসবই ছিল লক্ষ্য। মাহফুজের সঙ্গে আছেন প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ সম্পাদক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী শুভ শর্মা। লকডাউন শুরু হওয়ার পর ক্যাম্পাসের সিনিয়র, শিক্ষক ও বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে তাঁরা কুকুর-বিড়ালগুলোর খাবার দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেন। শুরুতে মাহফুজ ও শুভ বাজার করতেন। রান্না করতেন সংগঠনের আরেক সদস্য লুবনা আহমেদ। এরপর রিকশায় ঘুরে ক্যাম্পাসের প্রায় ২০টি জায়গায় চলত খাবার বিতরণ।

একটা সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ হলো। তখন গামলায় প্রায় ২০ কেজি খাবার মাথায় করে নিয়েই বিতরণ করতেন তাঁরা। কিন্তু তখন আসে আরও বড় বাধা। বিশ্ববিদ্যালয়ের করোনাভাইরাস পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধ সেল ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়। মাহফুজ বলছিলেন, ‘তখন চারদিন আমরা প্রাণীগুলোকে খাবার দিতে পারিনি। গেটের কাছে কুকুরগুলো খাবারের অপেক্ষায় থাকত। আমরা যথাসম্ভব সুরক্ষা মেনে ওগুলোকে খাবার দিতে চেষ্টা করতাম। তবু বাধা আসছিল।’ পরে দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাসরিন সুলতানার সহযোগিতায় ক্যাম্পাসে প্রবেশের জন্য দুটি গেট পাস পান তারা। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে তাঁদের সহযোগিতা করেন বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ মামুন অর রশীদ।

পারিবারিক সমস্যার কারণে লুবনা ও শুভ এখন আর ক্যাম্পাসে আসতে পারছেন না। কিন্তু মাহফুজুর থেমে থাকেননি। বাজার, রান্না করা, খাবার বিতরণ সব একাই করে যাচ্ছেন এখনো। কুকুর-বিড়ালগুলোর ভালোবাসাই তাঁকে প্রেরণা দিচ্ছে।