দোস্ত, এত গভীরভাবে তাকাস না তো প্রেম হয়ে যাবে!


Dhaka//Prothomalo
Published: 2020-07-18 14:55:46 BdST | Updated: 2020-08-11 22:48:24 BdST

কলাভবন থেকে বের হয়ে সহপাঠী তুলির সঙ্গে নীলক্ষেতের দিকে যাচ্ছিলাম। এ সময় তুলি বলল,

-ইমু, ভুলিস না কাল কিন্তু আমার জন্মদিন।
-তা–ই নাকি? তা দোস্ত এবার তোর জন্মদিনে কী খাওয়াবি?
-নিরব, মিতালী, ডাকসু ক্যাফে, চায়নিজ যেখানে চাইবি সেখানেই খাওয়াব। সমস্যা নেই। কিন্তু হঠাৎ এ প্রশ্ন করলি কেন?

তুলি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল।
-না মানে তোর জন্য গিফট তো কিনতে হবে। তাই জানতে চাচ্ছিলাম কী খাওয়াবি।
-বুঝলাম না। গিফট কেনার সঙ্গে খাওয়ার কী সম্পর্ক?
-সম্পর্ক আছে দোস্ত। সস্তা খাওয়ালে সস্তা গিফট, আর চায়নিজ খাওয়ালে দামি গিফট দেব। কারণ খাবারের দামের চেয়ে গিফটের দাম বেশি হওয়া যাবে না। তাহলে লস হয়ে যাবে।

-তা–ই নাকি! আচ্ছা যদি কিছুই না খাওয়াই তাহলে কি কোনো গিফট দিবি না?
-অবশ্যই দেব। তবে সে ক্ষেত্রে জঙ্গল পদ্ধতি।
-জঙ্গল পদ্ধতি মানে!
-আমাদের হলের পেছন দিকটায় একটু জঙ্গলের মতো আছে। সেখানে মাঝে মাঝে কিছু জংলি ফুল ধরে। যদি কিছুই না খাওয়াস তাহলে ধর সেখান থেকে কয়েকটা ফুল দিয়ে তোড়া বানিয়ে তোর জন্য নিয়ে আসব।
-আর যদি দেখিস সেখানে এখন কোনো ফুল নেই?
ভ্রু কুঁচকে তুলি প্রশ্ন করল,
-তাহলেও কোনো সমস্যা নেই। ওই গাছগুলো থেকে বিভিন্ন ধরনের পাতা দিয়ে একটা পাতার তোড়া বানিয়ে আনব। তুই আমার বন্ধু, খালি হাতে তো আর আসতে পারি না। কি বলিস?
-শোন ছোটলোক, তোর গিফট আনা লাগবে না। তুই ফ্রি–ই খাইস।

-শুনে খুশি হলাম। তা কোথায় খাওয়াবি?
-তুই যেখানে বলবি সেখানেই খাওয়াব।
-আলহামদুলিল্লাহ। দোস্ত আরেকটা কথা, শুনেছি বড়লোকদের জন্মদিনের পার্টিতে আমন্ত্রিত অতিথিদের অনেক সময় গিফট দেওয়া হয়। তা তোর জন্মদিনে আমারে কোনো গিফট দিবি না?
আমার কথা শুনে তুলি কোনো উত্তর দিল না। কেবল অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
-দোস্ত, এত গভীরভাবে তাকাস না তো। প্রেম হয়ে যাবে।
-ওরে আমার হিরো। শোন, আমার মাথার নাট-বল্টু এত ঢিলা না যে আমি তোর প্রেমে পড়ে যাব।
-আমি তো বলিনি তুই প্রেমে পড়ে যাবি। আমি জানি তোর মাথার নাট-বল্টু যথেষ্ট টাইট। ভয় তো আসলে আমারে নিয়ে। আমার কেন জানি মনে হয়, আমার মাথার নাট-বল্টু একটু ঢিলা আছে। মাথা নাড়াইলে কেমন জানি একটা আওয়াজ পাই। খুবই জটিল সমস্যা।
-তার মানে তুই নাট-বল্টু ঢিলা হিরো।
বলেই খিলখিল করে হাসতে থাকে তুলি।
-শোন, যত খুশি তুই টিটকারি কর। সমাস্যা নেই। তবে আমার ভেতর যে একটা হিরো হিরো ভাব আছে, সেটা তোকে স্বীকার করতেই হবে।
-তাই নাকি? আয়নায় কি নিজের চেহারা দেখিছ?
-অবশ্যই দেখি। প্রতিদিন দেখি। দেখি আর অবাক হয়ে ভাবি একটা ছেলে এত সুন্দর হয় কী করে!
-মাই গড! তোর কনফিডেন্ট লেভেলের প্রশংসা করতে হয়।
-শোন টিটকারি মারিস না। ঘটনা কিন্তু সত্যি। আমার ভেতর কিছু একটা আছে। আমি যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটি খেয়াল করে দেখেছি সব মেয়েরা কেমন করে জানি আমার দিকে তাকায় থাকে।
-তা–ই নাকি?
-অবশ্যই।

-শোন লাফাইছ না। মেয়েরা তোর দিকে কেন তাকায় জানিস? তোকে দেখে আর ভাবে এই মাল রাস্তায় কেন? এর তো চিড়িয়াখানায় থাকার কথা।
-তা–ই নাকি! দোস্ত, তাইলে তো ওদের কাছ থেকে আমার পয়সা নেওয়া উচিত।
-মানে কী?
-শোন, চিড়িয়াখানার জিনিস তো আর ফ্রি ফ্রি দেখান যায় না। কি বলিস?
-আচ্ছা তুই কি কখনো সিরিয়াস হবি না?
-হবি না মানে কি? আমি তো সব সময় সিরিয়াস।

তুলির সঙ্গে আগামীকালের প্রোগ্রাম সেট করলাম। সকাল আটটায় আমরা কলাভবনের সামনে মিলিত হব। কাল কোনো ক্লাস করব না। সকালবেলা ক্যাম্পাসেই আড্ডা দেব। দুপুরে ভালো কোনো রেস্টুরেন্টে খাব। সারাটা বিকেল রিকশায় ঘুরব। সন্ধ্যাবেলা তুলিদের বাসায় ঘরোয়া পার্টি হবে সেখানে অংশ নেব।

যেহেতু সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হবে, সেহেতু ঠিক করলাম রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ব। কিন্তু হলের বন্ধুরা ধরল বাজিতে কার্ড খেলবে। যে দল হারবে সে দল মিতালীতে রাতে পরোটা–মাংস খাওয়াবে। কী আর করা, সারা রাত কার্ড খেললাম। খেলা শেষে মিতালী থেকে খাওয়াদাওয়া করে যখন হলে ফিরলাম তখন ঘড়িতে ভোর পাঁচট। যেহেতু সকাল আটটায় তুলির সঙ্গে দেখা করতে হবে সে কারণে ঠিক করলাম আর ঘুমাব না। ভাবলাম, না ঘুমালেও একটু বিছানায় গড়াগড়ি দিই। বিছানায় শুয়ে ফেসবুকে ঘুরতে ঘুরতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম বলতে পারব না। যখন ঘুম ভাঙল ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি বেলা একটা বাজে। লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠলাম। ফোন হাতে নিয়ে দেখি ফোনে চার্জ নেই। ফোন বন্ধ। দ্রুতবেগে হল থেকে বেরিয়ে পড়লাম। কলা ভবনের সামনে গিয়ে তুলিকে খুঁজে পেলাম না। কলা ভবনের যেখানে যেখানে তুলিকে পাওয়া যাওয়ার সম্ভবনা আছে, এমন সব জায়গায় খুঁজলাম। টিএসসি, ডাস, ডাকসু ক্যাফেটেরিয়া, মধুর ক্যানটিন কিছুই বাদ দিলাম না।

অস্থির মন নিয়ে লাইব্রেরির সামনে দিয়ে হাঁটছি, এ সময় সহপাঠী কনার সঙ্গে দেখা। ও লাইব্রেরি থেকে বের হচ্ছিল। এই মেয়ে সারাক্ষণ পড়ালেখা নিয়েই থাকে।
-এই কনা তুই কি তুলিকে দেখেছিস?
-সকালের দিকে একবার দেখেছিলাম।
-এখন কোথায় আছে বলতে পারবি?
-না তা পারব না। তবে ওকে দেখলাম আজ শাড়ি পরে এসেছে।
-তা–ই? তোর ফোনটা দে তো। একটা ফোন করব। আমার ফোনের চার্জ নেই।
কনার ফোনটি নিয়ে তুলিকে ফোন দিলাম। তুলি ফোন পিকআপ করে হ্যালো বলতেই আমি দ্রুত বললাম,
-তুলি আমি ইমু। তুই কই? তোর না কলা ভবনের সামনে থাকার...।

কথা শেষ করতে পারলাম না। লাইন কেটে দিল। আবার ফোন দিলাম। এবার ওর ফোন বন্ধ পেলাম।
কনা প্রশ্ন করল,
-কোনো সমস্যা? তোরা কি আবার ঝগড়া করেছিস?
-আরে না। ওই পাগলের সঙ্গে ঝগড়া করব আমি? আসলে ও আজকে আমাকে এক জায়গায় নিয়ে যেতে চেয়েছিল। আমি রাজি হইনি।
-কোথায়?
-আর বলিস না। ও নাকি একটা ছেলের প্রেমে পড়েছে। আজ ওই ছেলের সঙ্গে প্রথম দেখা করতে যাবে। আমাকে বলল সঙ্গে যেতে। আমি রাজি হইনি তাই রাগ করেছে। আচ্ছা বল আমি কি ওর বডিগার্ড?
-তুই কি সত্যি বলছিস! তোর সঙ্গে তুলির কোনো কিছু নেই?

কনার চোখে-মুখে খুশির ঝলক ফুটে উঠল। আমি জানি কনা আমাকে পচ্ছন্দ করে। কিন্তু কখনো বলার সাহস পায়নি। আসলে ক্লাসের সবার ধারণা আমার আর তুলির মধ্যে কিছু একটা আছে।
-অবশ্যই সত্য। কনা তোকে তো আজ খুব সুন্দর লাগছে।
কনা কিছু না বলে মিষ্টি করে একটু হাসল। আমি প্রশ্ন করলাম,
-তুই কি এখন হলে যাচ্ছিস?
-হ্যাঁ।
-ঠিক আছে, যা।
-তুই কোথায় যাচ্ছিস?
-খুব খিদে লেগেছে। খেতে হবে। ভাবছি কোথায় যাওয়া যায়।
-আমার সঙ্গে যাবি? চল আজ আমি তোকে খাওয়াব।
-তুই খাওয়াবি? ঠিক আছে, চল যাই।

কনার সঙ্গে রিকশা করে নিরব হোটেলে গেলাম। প্রচণ্ড ভিড়। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর কোনায় একটা টেবিলে পেলাম। ভর্তা, লালশাক, ডাল, মাংসসহ সাদা ভাতের অর্ডার দিলাম। মাত্র ভাতে হাত দিয়েছি হঠাৎ চোখ পড়ল অপর পাশের টেবিলের দিকে। দেখলাম তুলি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ওর সঙ্গে আমাদের সহপাঠী আরও দুটো মেয়ে বন্ধু। আমি ওদের দেখেই বাঁ হাত নেড়ে টা টা দিলাম। যদিও ভেতর ভেতর প্রচণ্ড ভয় পেয়েছি, কিন্তু মুখে সেটা ফুটে উঠতে দিলাম না। তুলি নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে আমাদের টেবিলের সামনে দাঁড়াল। আমি ওর দিকে তাকালাম। নীল রঙের শাড়ি পরেছে। একটুও সাজেনি অথচ ওকে পরির মতো লাগছে। মনে মনে বললাম, এ মেয়ে, তুমি এত সুন্দর কেন? কিন্তু মুখে বললাম,
-তুলি বেগম কেমন আছেন?
তুলি আমার দিকে না তাকিয়ে কনাকে বলল,
-কিরে কনা, কেমন আছিস?
-ভালো। তা তোর বয়ফ্রেন্ড কই? পরিচয় করিয়ে দিবি না?
-বয়ফ্রেন্ড মানে!

-ইমু বলল, আজ নাকি একটা ছেলের সঙ্গে তোর ডেটিংয়ের কথা আছে। সেই জন্যই নাকি তুই শাড়ি পরে এসেছিস।
-তা–ই? এই কুত্তা তোকে তাই বলেছে!
আমি মাথা নিচু করে বসেছিলাম। এবার তুলি আমার গায়ে টোকা দিয়ে বলল,
-এই ব্যাটা তাকা আমার দিকে।
আমি তুলির দিকে তাকালাম।
-তুই কী বলেছিস? আমি নিরবে ডেটিংয়ে এসেছি? তোরা যেমন এসেছিস তেমন?
-না মানে শোন...
-খবরদার কথা বলবি না। আজ কনার সঙ্গে তোর প্রোগ্রাম আছে আমাকে বললেই হতো।
-আসলে...।
-তোরে না বলছি কথা বলবি না। শুধু চুপ করে শুনবি। তা এ জন্যই তুই সকাল থেকে ফোন বন্ধ করে রেখেছিস?
-আরে না। আমার ফোনের...।
-কুত্তা, তোরে আমি কথা বলতে মানা করেছি।

বলে তুলি এবার আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। ওর তাকানোতে এমন ধার ছিল যে আমি চোখ নামিয়ে নিতে বাধ্য হলাম। আমি ভাতের প্লেটের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বসে আছি। হঠাৎ করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই বুঝতে পারলাম আমার মাথা থেকে ডাল গড়িয়ে পড়ছে। আমি স্থির হয়ে বসে রইলাম। একে একে লাল শাক, মাংস সবই মাথা-গাল বেয়ে বেয়ে পরে টি–শার্ট-প্যান্ট ভিজিয়ে দিল। ভাগ্য ভালো মাথায় ক্যাপ ছিল। না হলে গরম তরকারিতে পুরো খবর হয়ে যেত।

তুলি আমার গায়ে টোকা দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
-এই কুত্তা, তাকা আমার দিকে।
আমি ধীরে ধীরে তুলির দিকে তাকালাম। তুলি আলতো করে আমার মাথা থেকে ক্যাপটি খুলে ফেলল। তারপর পিরিচ থেকে আলু ভর্তার গোলাটি নিয়ে কপালে টিপের মতো বসিয়ে দিয়ে বলল,
-হারামজাদা ভালো করে খা। আর ভালো করে প্রেম কর।
বলেই দ্রুত নিরব থেকে বের হয়ে গেল। তাকিয়ে দেখলাম রেস্টুরেন্টের সব কটি চোখ তখন আমার দিকে। আমি কপাল থেকে আলু ভর্তার টিপটি হাতে নিলাম। তারপর একটু খেয়ে চিৎকার করে রেস্টুরেন্টের সবার উদ্দেশে বললাম,
-আলু ভর্তাটা কিন্তু সেই রকম হয়েছে।
দেখলাম কনা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কনার দিকে বোকার মতো তাকিয়ে একটু একটু করে আলু ভর্তা খেতে থাকলাম।

বিশেষ দ্রষ্টব্য
বন্ধুরা এমনই হয়। বন্ধুত্ব মানে পাগলামি। বন্ধুত্ব মানে মান-অভিমান। বন্ধুত্ব মানেই সবকিছু করার অধিকার।

বিশেষ দ্রষ্টব্যের বিশেষ দ্রষ্টব্য
ক্যাম্পাসের ভেতরের এসব ঘটনাকে বাইরের মানুষের কাছে পাগলামি বা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু এসব পাগলামিই ক্যাম্পাস জীবনকে মধুময় করে রাখে। আর এ কারণেই ক্যাম্পাসে কাটানো সময়, জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়।

*[email protected] || প্রথম আলো