চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ২ জমজ বোনের গল্প


টাইমস অনলাইনঃ
Published: 2018-02-10 14:35:16 BdST | Updated: 2018-11-22 17:43:58 BdST

১৯৯৬ সালের ৭ নভেম্বরের আলো ঝলমলে সকাল। চারপাশটা কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠতে শুরু করেছে ধীরে ধীরে। হাটহাজারীর ফতোয়াবাদের আইসক্রিম ফ্যাক্টরি সড়ক এলাকার বাড়িটির বাইরে তাই চেনা শোরগোল।কিন্তু ঘরের ভেতরে? সেখানে স্রষ্টার দরবারে ওঠেছে সবার হাত। নতুন অতিথির অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলো নিশ্চুপ-নিঃশব্দে একমনে করে চলেছেন প্রার্থনা।

ঘড়ির কাঁটা সকাল সাড়ে দশটার ঘর ছুঁতেই সেই নিরবতা ভাঙলো-নবজাতকের কান্নার শব্দে। মিনিট পাঁচেক বাদে নতুন কান্না! পৃথিবীর মুখ দেখলো আরও এক নবজাতক, একই মায়ের গর্ভ থেকে। উভয়েই ফুটফুটে মেয়ে।
সরকারি কর্মকর্তা বাবা সৈয়দ মো. রিদুয়ান আর গৃহিণী মা শাহিনা পারভীন বড় মেয়ের নাম রাখলেন তাসনুভা মুনিরা, ছোটটার নাম দিলেন তানজিলা মুবাশ্বিরা।

পৃথিবীতে প্রতি মুহূর্তে কতো জমজেরই তো জন্ম হয়, এ আর নতুন কী-এমন প্রশ্ন যারা তুলবেন তাদের আগেভাগেই বলে দেওয়া ভালো-জন্মের পরের ২১ বছরে দুই বোনের মধ্যে কাকতালীয়ভাবে এমন কিছু ঘটেছে যা পড়ে হয়তো ভেতর থেকে বেরোবে এই কয়েকটা শব্দই-আশ্চর্য তো!
জমজ বলেই কী সবখানে একসঙ্গে বিচরণ! নিশ্চয় তাদের জীবনের স্ক্রিপ্টটা স্বয়ং সৃষ্টিকর্তারই লেখা! দুই বোনই এখন পড়ছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগে। রীতিমতো ভর্তি পরীক্ষার যুদ্ধ মিটিয়েই তাদের একই বিভাগে সুযোগ পাওয়া কিছুটা বিস্ময় তো বটেই।
এ তো গেল বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথা। স্কুল থেকে কলেজ-সেখানেও দুটো মুখ পৃথক হয়নি কখনও! চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত একসঙ্গে পড়েছেন নগরীর এনএমসি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে।

তারপর দুই বোনই ‘ভালো’ স্কুলে ভর্তির আশায় অংশ নিলেন ভর্তি পরীক্ষায়।দু’জনই সুযোগ পেলেন বাংলাদেশ মহিলা সমিতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে।

সেখানে পড়লেন এসএসসি পর্যন্ত। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ নিয়ে দুই বোনই শেষ করলেন স্কুলজীবন।
কলেজে ভর্তির প্রাক্কালে দুই বোনই বিভাগ বদল করলেন। বিজ্ঞান থেকে এবার তাদের বিভাগের নাম ব্যবসায় শিক্ষা।
দু’জনেই সুযোগ পেলেন হাজী মুহম্মদ মহসিন কলেজে। এইচএসসিতেও দুজনের ফলাফল বদলালো না-ওই জিপিএ-৫ই থাকলো। তবে একটু পার্থক্য বলতে একজন সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছিল, আরেকজনের সব বিষয়ে জিপিএ-৫ আসেনি।
কলেজের পাঠ চুকিয়ে এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যুদ্ধ। সেখানেও দু’টো শরীর পাশাপাশি মিলিয়ে দিলেন সৃষ্টিকর্তা। দু’জনেই সুযোগ পেলেন আইন বিভাগে। মেধাতালিকায় বড়জন ৭৮ এ, ছোটজন ৭৬ এ। তারা কিন্তু পাশাপাশি বসেননি, দু’জন ছিলেন দুই হলে।

তাসনুভা মুনিরা বলেন, ‘দুই জন দুই হলেই পরীক্ষা দিয়েছিলাম। কিন্তু বাসায় এসে যখন উত্তর মেলাচ্ছিলাম তখন দেখি আমি যে কয়েকটা অনুমান নির্ভর উত্তর দিয়ে এসেছি সেগুলো ও ঠিক একই উত্তর দিয়েছে। খুব অবাক হচ্ছিলাম দু’জন।
‘পরে ভাবছিলাম আইন বিভাগে সুযোগ পাবো না। কিন্তু আশ্চর্যভাবে সুযোগ পেলাম একই বিভাগে। সেদিন ৫ নভেম্বর ছিলো। এর দু’দিন পরেই আমাদের জন্মদিন। এ যেন সারপ্রাইজড্ গিফট।’

এভাবে কাকতালীয়ভাবে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়-বিভাগসহ মিলিয়ে যাবার রহস্য কী? এমন প্রশ্নে দু’জনেই হাসতে হাসতে বলেন, ‘দু’জনেই আসলে মেধার দিক থেকে সমান। একসঙ্গে পড়ি। একসঙ্গেই শিখি। তাই পরীক্ষার ফলাফলেও কাছাকাছি থাকি। সেই স্কুল থেকেই দেখছি একজনের ফল খারাপ হলে, অন্যজনেরও খারাপ।’
‘একজনের ভালো মানে অন্যজনেরও ভালো। অথচ কোনোদিন কিন্তু হলে পাশাপাশি বসে পরীক্ষা দেওয়া হয়নি আমাদের।’
একজন আরেকজন ছাড়া থাকতে পারেন না, একজনের কষ্ট ছুঁয়ে যায় অপরজনকেও। একই রকম ড্রেস, একই রকম জুতো-সঙ্গে চেহরাও তো কাছাকাছিই!

এতো এতো মিল তো পাওয়া গেল, নাম ছাড়া অমিল কিছু কি আছে? এমন প্রশ্নে ছোটজন তানজিলা মুবাশ্বিরার তড়িৎ জবাব, ‘আমি খুব চঞ্চল, কিছুটা বাচ্চামিও আছে, তবে ও (তাসনুভা মুনিরা) খুব ম্যাচিউরড।’
মজার কোনো ঘটনা কী আছে দু-বোনের? তানজিলা মুবাশ্বিরা ফিরে গেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে।

২ জমজ বোনের গল্প

‘একটা পরীক্ষার আগে আমার তেমন প্রস্তুতি ছিলো না। তবে আপুর খুব ভালো প্রস্তুতি ছিলো। তাই ওই পরীক্ষার আগে সিদ্ধান্ত নেই মান উন্নয়নের জন্য (ইমপ্রুভ) রেখে দেবো। পরীক্ষার হলে যখন প্রশ্ন দেখলাম মনে হচ্ছিল পারবো হয়তো।’
তিনি বলেন, আমার ৭টা কমন আসছে। ওর মোটামুটি ৮ টা লিখতে পারার মতো আসছে। কিন্তু আমি লিখতে গিয়ে বুঝতে পারতেছি আমার তেমন কিছুই মনে নেই। ও মোটামুটি ভালোই লিখতেছিল। তবে দূর থেকে ও খেয়াল করেছে আমি না লিখে বসে আছি।তাই অতিরিক্ত খাতা নিতে যাওয়ার সময় আমার কাছ থেকে জানতে চাইল আমি লিখতে পারছি কিনা?
‘আমি না বলায় ও আর লিখেনি। কিন্তু দুর্ভাগ্যভাবে কারও ইমপ্রুভ আসেনি।এই বিষয়ে আমরা দুজনেই ইমপ্রুভ রাখার চেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে যাই।’
এরকম শত শত খণ্ডিত ভালো-লাগা মন্দ লাগার সময়ের মালিক ‍দু’জনেই। দু’জনের মাঝে খুঁনসুটিও চলে বেশ। ঝগড়াঝাটি মাঝে মধ্যে মারামারিতেও রূপ নেয়।

হালকা ঠুসঠাস আওয়াজও সৃষ্টি হয় তা থেকে। কিন্তু দিনশেষে যেন দুয়ের মধ্যে এক। যেন পারমাণবিক বিস্ফোরণও ঠলাতে পারবে না তাদের এ বন্ধনকে!
তবে জানালেন, একটা জিনিসকে বড় ভয় পান তারা। এর নাম মৃত্যু। কারও মৃত্য দেখলেই একজনের প্রতি অন্যজনের চাওয়া- ‘আরও আরও বাঁচো।’ তবে এটা মানেন একদিন মৃত্যু এসে ধরা দেবে। আর সেটাও যেনো হয় একই সঙ্গেই! ‘একসঙ্গেই ঘুমোতে চাই, একসঙ্গেই ঘুমোতে হবে। কারণ একজনকে ছাড়া যে আরেকজন থাকতে শিখিনি যে…!,’ সরল উত্তর দুই বোনের।

বিডিবিএস 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।