বিশ্ববিদ্যালয়ের ধূমপায়ী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২৪ শতাংশই নারী


টাইমস অনলাইনঃ
Published: 2018-01-31 23:43:16 BdST | Updated: 2018-10-23 14:37:16 BdST

দেশে নারীদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা বেড়ে গেছে। আর উঠতি বয়সীদের মধ্যে এই প্রবণতা ক্রমে প্রবল হচ্ছে। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে চাকরিজীবীরাও বাদ যাচ্ছে না। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধূমপায়ী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২৪ শতাংশই নারী। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। একই সঙ্গে তাঁরা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে আরো দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।

রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোর বিভিন্ন রেস্তোরাঁর স্মোকিং জোন, পার্ক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় অহরহ চোখে পড়ছে বিভিন্ন বয়সের নারীদের ধূমপানের দৃশ্য। বিভিন্ন এলাকার ছাত্রীনিবাসের আশপাশেও দেখা যাচ্ছে এমন দৃশ্য। ধানমণ্ডি ও গুলশান লেক কিংবা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উঠতি বয়সী অনেক নারীকেই দেখা যায় প্রকাশ্যে ধূমপান করতে। তাদের অনেকের পরনেই থাকে স্কুলের পোশাক। কেউ কেউ আবার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্রধারী।

ধানমণ্ডি ২৭ নম্বরে সাম্পান রেস্তোরাঁর খোলা উদ্যানে প্রায় সারা দিনই বিভিন্ন বয়সের পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের ধূমপান করতে দেখা যায়। আর স্কুল-কলেজ খোলা থাকার সময়ে ওই এলাকার লেকেরপাড়ে নারী ধূমপায়ীর সংখ্যা বেশি থাকে।

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে গুলশানের গ্লোরিয়া জিন্স ক্যাফের এক কর্মী বলেন, ‘আমাদের স্মোকিং জোনে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আগতদের বড় একটি অংশই থাকে নারীরা। তাদের মধ্যে স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী যেমন আছে, তেমনই আছে মধ্যবয়সী অনেক নারীও। দিনে দিনে এখানে নারী ধূমপায়ীর উপস্থিতি বাড়ছে।’ বনানীর কিংস কনফেকশনারি কিংবা ধানমণ্ডির ক্রিমসন কাপ ক্যাফের স্মোকিং জোনেও একই চিত্র বলে জানান সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা।

বিশেষজ্ঞরা জানান, ধূমপান নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্যই ক্ষতিকর। তবে জিনগত কারণে নারী ধূমপায়ীর বিপদ তুলনামূলক অনেক বেশি এবং প্রতিক্রিয়াও ঘটে দ্রুততর সময়ে। সন্তান ধারণে জটিলতা ও সন্তানের জীবনও হয়ে ওঠে অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ। ধূমপায়ী নারীর সন্তান গর্ভ থেকেই নানা ত্রুটি নিয়ে পৃথিবীতে আসে।

বাংলাদেশ অবস অ্যান্ড গাইনোলজিক্যাল সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. সামিনা চৌধুরী বলেন, ‘ধূমপানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবারই ফুসফুসের ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোকের মতো রোগের বিপদ বেশি। তবে নারী ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিপদ হিসেবে আসে জরায়ুর ক্যান্সারের ঝুঁকি, প্রজননতন্ত্রে সমস্যা, গর্ভাবস্থায় নানা জটিলতা, সন্তান ধারণে প্রতিবন্ধকতা, সন্তানের জন্মগত ত্রুটির মতো বিষয়গুলো। এ ছাড়া বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ করে মেনোপজের পর হাড়ের ক্ষয় অন্যদের চেয়ে ধূমপায়ী নারীদের বেশি হয়। এ অবস্থায় নারীদের ধূমপান থেকে বিরত করতে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে আরো দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মের নারীদের রক্ষায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার।’

জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোয়াররফ হোসেন বলেন, ‘পুরুষের তুলনায় এমনিতেই নারীদের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কম থাকে। ফলে ধূমপায়ী নারীদের জন্য এ সমস্যা আরো প্রকট হয়। ধূমপায়ী নারীদের চিকিৎসাও অনেক বেশি জটিল হয়ে পড়ে। এ ছাড়া বাংলাদেশে প্রধানত ফুসফুসের ক্যান্সারের প্রকোপ বেশি। পাশাপাশি নারীদের জরায়ু, খাদ্যনালি, মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি পুরুষের তুলনায় বেশি থাকে। এককথায় বলা যায়, দেশে নারী ধূমপায়ী বেড়ে যাওয়াটা এক অশনিসংকেত।’

বাংলাদেশ সেন্টার ফর কমিউনিকেশন প্রগ্রাম-বিসিসিপি, বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল নেটওয়ার্ক ও জন হপকিংস বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণায় দেশে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ধূমপানসহ তামাক ব্যবহারের নানা চিত্র উঠে এসেছে। ওই কার্যক্রমের আওতায় দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে তামাক সেবনের প্রবণতা নিয়ে গবেষণা করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো ভিসি অধ্যাপক ড. গিয়াস উদ্দিন আহসান।

গবেষণার ফল জানিয়ে অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪২ শতাংশ পেয়েছি তামাকসেবী। এদের মধ্যে ১ শতাংশ ধোঁয়াবিহীন তামাক সেবন করে। বাকি ৪১ শতাংশই ধূমপায়ী। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ওই ৪১ শতাংশের ভেতর ২৪ শতাংই নারী। বাকি ৭৬ শতাংশ পুরুষ। এখানে সংখ্যায় নারীদের চেয়ে পুরুষ ধূমপায়ী অনেক বেশি হলেও ঝুঁকি বিবেচনায় ওই ২৪ শতাংশ নারীর তথ্য খুবই বিপজ্জনক।’

ড. গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের রক্ষায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর ব্যবস্থা রাখা দরকার। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের ধূমপানের ব্যাপারে পরিবারেও বাড়তি নজরদারি রাখা উচিত।’

দ্য টোব্যাকো এটলাসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৪.৬ শতাংশ পুরুষ ও ৫.৭ শতাংশ নারী তামাক ব্যবহারের কারণে মারা যায়। যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশে ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারের প্রবণতা নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। আর দেশে তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা চার কোটি ১৩ লাখ, যার ২৩ শতাংশ (দুই কোটি ১৯ লাখ) ধূমপায়ী এবং ২৭.২ শতাংশ (২ কোটি ৫৯ লাখ) ধোঁয়াবিহীন তামাক সেবন করে।

তামাকবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত বেসরকারি সংস্থা প্রজ্ঞা সূত্র জানায়, বাংলাদেশ বিশ্বের তামাকজাত পণ্য ব্যবহারকারী শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার ৪৩.৩ শতাংশ তামাকজাত পণ্য ব্যবহার করে। তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার প্রতিবছর দেশের প্রায় ৭৬ হাজার থেকে এক লাখ মানুষের অকালমৃত্যুর জন্য দায়ী। এর মধ্যে বড় একটি অংশই নারী। আর নারীদের মধ্যে ধূমপান যেভাবে বাড়ছে, তা খুবই উদ্বেগজনক।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে ২০১৩ সালে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন সংশোধন করে এবং ২০১৫ সালে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা প্রকাশ করে। আইন ও বিধি বাস্তবায়নে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতি, তামাক চাষ নিরুৎসাহিতকরণ নীতি, স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ চলছে। এ ছাড়া গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে তামাকজাত সব পণ্যের প্যাকেট, কার্টন বা কৌটার উপরিভাগে অন্যূন ৫০ শতাংশ জায়গাজুড়ে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী মুদ্রণ বাধ্যতামূলক করে আদেশ জারি হয়।

কালেরকন্ঠ

বিডিবিএস 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।