করোনাকালীন মানসিক স্বাস্থ্য


Dhaka
Published: 2020-05-22 17:13:27 BdST | Updated: 2020-07-04 10:40:01 BdST

নভেল করোনা ভাইরাস শারীরিক সমস্যা ও মৃত্যু ঝুঁকির সাথে তৈরি করছে মানসিক অশান্তি ও অস্থিরতা। বিশাল জনগোষ্ঠীর মনোজগতের উপর তৈরি হওয়া এ বিরূপ প্রভাবের কারণ, স্বরূপ উদঘাটন ও প্রতিকার তাই এখন সময়ের দাবি।

করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যার কারণ হচ্ছে মৃত্যুভীতি, শারীরিক উপসর্গের ভয়। সুস্থ হতে দীর্ঘ সময় লাগে এবং রোগীর প্রতি সামাজিক বিরূপ আচরণ কিংবা রোগাক্রান্ত দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থেকে একাকি জীবন যাপনও এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। আর করোনা আক্রান্তহীন বিশাল জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে মানসিক সংকটের কারণ হচ্ছে- করোনা ভীতি ,গতানুগতিক নাগরিক জীবনের হঠাৎ স্থবিরতা ও সাময়িক আপাত বন্দি জীবন, ব্যক্তি জীবনে অর্থনৈতিক মন্দাভাব, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মিডিয়ার প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা ,অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, স্থবির জীবনে পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক অস্থিরতা ইত্যাদি।

এই সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে অকারণ দুশ্চিন্তা, খিটখিটে মেজাজ, সামান্য কারণে রেগে যাওয়া, ঘুমের ব্যাঘাত, যেকোনো ব্যাপারে প্যানিক হয়ে যাওয়া, অবসাদ, বিষণ্ণতা, হতাশা, ধূমপান বা নেশার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি, আত্মহত্যার প্রবণতা ইত্যাদি।

এমন পরিস্থিতিতে মানসিক সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাধারণ নিয়মাবলি হচ্ছে- মানসিকভাবে নিজেকে উজ্জীবিত রাখুন, প্রাণ খুলে হাসুন। পরিবর্তিত জীবনে নতুন স্বাস্থ্যকর দৈনন্দিন রুটিন তৈরি করুন। পরিবারের সদস্যদের পর্যাপ্ত সময় দিন। ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম ও সুষম পুষ্টিকর খাবার মানসিক ভাবে আপনাকে চাঙ্গা রাখবে। দৈনিক হালকা ব্যায়াম করুন, মানসিকভাবে নিজেকে উদ্দীপ্ত রাখতে যোগব্যায়ামও করতে পারেন। আয় –ব্যায়ের মাঝে সামঞ্জস্যতা বজায় রাখুন। আত্মীয় –স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের সাথে ফোনে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন। যে কাজে আনন্দ পান তা করুন। যেমন ছবি আঁকা, গান শোনা, বই পড়া।

পরিবারের শিশুদের সময় দিন, তাদেরকে সহজ ভাবে পরিস্থিতি বোঝান, স্বাস্থ্য বিধি মানতে সাহায্য করুন তাদের পড়াশোনায় সহায়তা করুন, তাদের পছন্দের খেলায় তাদের সাথে অংশ নিন। পরিবারের বয়স্ক সদস্যগণের আলাদা যত্ন নিন । তাঁদের খাওয়া দাওয়ার খোঁজ নিন । দীর্ঘ মেয়াদি অসুখ, যেমন ডায়বেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট, কিডনি অসুখের পরিপূর্ণ চিকিৎসার প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণের সাথে অনলাইনে যোগাযোগ করে নিশ্চিত করুন । ধূমপান ও নেশাজাতীয় দ্রব্য পরিহার করুন । সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে প্রতিবেশীর খবর নিন এবং অসহায়কে নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করুন, দেখবেন মন ভালো থাকবে। সম্ভব হলে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলুন । বড় কথা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে ফেলুন। সঠিক তথ্যের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের সাহায্য নিন। অতিরিক্ত তথ্য নির্ভর হয়ে নিজেকে আতঙ্কিত না করে সচেতনতার জন্য যতটুকু প্রয়োজন তা গ্রহণ করুন।

মনে রাখবেন, করোনায় আক্রান্ত হওয়া মানেই মরে যাওয়া নয়। আপনার যদি বড় ধরনের শারীরিক সমস্যা অথবা আগে থেকে শারীরিক অসুস্থতা না থাকে তাহলে আপনার হাসপাতালে ভর্তিরও প্রয়োজন নেই।মনে রাখবেন ৮০% ক্ষেত্রেই এ রোগ বাড়িতে চিকিৎসায়ই ভালো হয়ে যায়। ফলে অযথা আতঙ্কিত হবেন না। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উপর নেতিবাচক প্রভাব রাখে, আর এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুস্থ হতে হলে মানসিকভাবে সুদৃঢ় থাকার বিকল্প নেই। সরকার ঘোষিত হটলাইন নাম্বারে ফোন দিয়ে উপসর্গের বর্ণনা দিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করুন।

যেহেতু এটি একটি সংক্রামক ব্যাধি, তাই পরিবারের সবাইকে এ রোগ থেকে দূরে রাখতে হলে নিজেকে আলাদা রুমে পূর্ণ প্রস্তুতিসহ আইসোলেট করতে হবে। নিজের মত রুটিন তৈরি করুন। পুষ্টিকর খাবার, প্রয়োজনীয় বিশ্রাম, হালকা ব্যায়াম, নিয়মিত ওষুধ সেবন, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার উপর গুরুত্ব দিন। পরিবারের সদস্য, আত্মীয় স্বজন, বন্ধুদের সাথে কথা বলুন ফোনে বা ইন্টারনেটে।

এ সময় আপনার অভিজ্ঞতার আলোকে ভবিষ্যতে আক্রান্ত ব্যক্তি যাতে উৎসাহ পায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ধরনের লেখা লিখুন। যে বইটি পড়ে শেষ করতে পারেননি, সেটা পড়ুন। যে গানটি বার বার শুনতে মন চায় শুনুন। সুস্থ হলে কি কি কাজ করবেন তার একটা লিস্ট করুন। হাসপাতালে অবস্থান করতে হলেও এ নিয়মগুলো মানুন । আইসোলেশন ওয়ার্ডে একে অন্যকে সাহায্য করুন। একে অন্যকে উৎসাহ দিন। মনে রাখবেন কোন অবস্থায়ই মানসিক শক্তি হারানো যাবেনা ।

প্রশ্ন হচ্ছে, কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিবেন? যখন অতিরিক্ত আতঙ্ক বা দুশ্চিন্তা আপনার দৈনন্দিন কাজের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। অকারণে বারবার ছোটখাটো বিষয়ে প্যানিক হয়ে যাচ্ছেন । নিয়মিত ঘুমের সমস্যা হচ্ছে অথবা বিষণ্ণতা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছে যা আপনার শারীরিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে ।

করোনা একটি বৈশ্বিক মহামারি। ভয় দিয়ে নয়, সচেতনতা এবং সুদৃঢ় মানসিক মনোবল দিয়ে আমাদের এর বিরুদ্ধে জয়ী হতে হবে। স্বাস্থ্য বিধি মানার সাথে সাথে মানবিকতা, নৈতিক দৃঢ়তা, ধর্মীয় অনুশাসন, পারস্পরিক সৌহার্দ্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা আমাদের করোনা যুদ্ধে জয়ী করবে।

লেখক: চিকিৎসক, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল