প্রেম ও দ্রোহের কবি হেলাল হাফিজের জন্মদিন আজ


Dhaka
Published: 2019-10-07 01:55:21 BdST | Updated: 2019-10-18 06:04:56 BdST

"ইচ্ছে ছিলো তোমাকে সম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো

ইচ্ছে ছিলো তোমাকেই সুখের পতাকা করে

শান্তির কপোত করে হৃদয়ে উড়াবো।”

“এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়”

কবিতাকে ভালোবাসেন অথচ কবিতার এই লাইনগুলো শোনেননি এমন কবিতাপ্রেমী হয়ত পাওয়া যাবে না। কবিতার এই লাইনগুলো যার তিনি কবি হেলাল হাফিজ। কবি পরিচিত ‘প্রেম ও দ্রোহের’ কবি নামে।

প্রতিভাবান এই কবি ১৯৪৮ সালের আজকের এই দিনে (৭ অক্টোবর) নেত্রকোণার বড়তলী গ্রামে জন্ম নেন। কবির বাবার নাম খোরশেদ আলী তালুকদার। আর মাতার নাম কোকিলা বেগম। শৈশবে মাকে হারানো হেলাল হাফিজ আশ্চর্য এক বেদনাবোধ নিয়ে বেড়ে উঠেছেন। এই বেদনাবোধ থেকেই হয়ত কবিতার জন্ম।

হেলাল হাফিজ ১৯৬৫ সালে নেত্রকোণা দত্ত হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৬৭ সালে নেত্রকোনা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ওই বছরই কবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় ১৯৭২ সালে তিনি তৎকালীন জাতীয় সংবাদপত্র দৈনিক পূর্বদেশে সাংবাদিকতায় যোগ দেন। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন দৈনিক পূর্বদেশের সাহিত্য সম্পাদক।

১৯৭৬ সালের শেষ দিকে তিনি দৈনিক দেশ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক পদে যোগদান করেন। সর্বশেষ তিনি দৈনিক যুগান্তরে কর্মরত ছিলেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের রাতে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান হেলাল হাফিজ। সে রাতে ফজলুল হক হলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় পড়ে সেখানেই থেকে যান। রাতে নিজের হল ইকবাল হলে (বর্তমানে জহুরুল হক) থাকার কথা ছিল। সেখানে থাকলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞের শিকার হতেন।

২৭ মার্চ কারফিউ তুলে নেওয়ার পর ইকবাল হলে গিয়ে দেখেন চারদিকে ধ্বংসস্তূপ, লাশ আর লাশ। হলের গেট দিয়ে বেরুতেই কবি নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে দেখা। তাকে জীবিত দেখে উচ্ছ্বসিত আবেগে বুকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকলেন নির্মলেন্দু গুণ।

ক্র্যাকডাউনে হেলাল হাফিজের কী পরিণতি ঘটেছে তা জানার জন্য সে দিন আজিমপুর থেকে ছুটে এসেছিলেন কবি গুণ। পরে নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জের দিকে আশ্রয়ের জন্য দুজনে বুড়িগঙ্গা পাড়ি দেন।

হেলাল হাফিজ বাংলাদেশের এমন একজন আধুনিক কবি যিনি স্বল্পপ্রজ হলেও বিংশ শতাব্দীর শেষাংশে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ১৭ বছর লেখালেখির পর তার কবিতা সংকলন যে জলে আগুন জ্বলে ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয়। ওই গ্রন্থটির অসংখ্য সংস্করণ প্রকাশিত হলেও এরপর গ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে তার নিস্পৃহতা দেখা যায়।

২৬ বছর পর ২০১২ সালে আসে তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতা একাত্তর’। তার অন্যতম জনপ্রিয় কবিতা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’- এ কবিতার দুটি পংক্তি ‘‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’’ কবিতাপ্রেমীদের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়ে থাকে।

তিনি কষ্ট ফেরি করেন। যার কাছে রয়েছে হরেক রকম কষ্ট। আসলেই কী কষ্ট? নাকি তিনি ফেরি করেন এক বুক ভালোবাসা? আশ্চর্য রকম সব কবিতা তার। বাংলা কবিতার ইতিহাসে হেলাল হাফিজ তাই ভালোবাসা এবং কবিতার আশ্চর্য এক ফেরিওয়ালা।

অনেকে আবার নির্জন কবি বলেও ডাকেন তাকে। কী এক বেদনাবোধে ঘর ছেড়েছেন বহুবছর আগেই, সেই থেকেই তার হোটেল জীবন শুরু। কবিতার সংসারে নিমজ্জিত হতে গিয়ে ফিরে এসেছেন বারবার।

হেলাল হাফিজ এই শহরে, যন্ত্রণার শহরে এক সন্তমানুষ। সাধুকবি। ‘লোভ’ আর ‘খুন’ এর শহরে তিনি এখনো লোভহীন মানুষ-একা। এখনো তার কাছে শেষকথা জানতে চাইলে উজ্জ্বল হেসে বলেন, ‘প্রেম প্রেম এবং প্রেম’।

এক জীবনে বেশিরভাগ মানুষ জমায় টাকা অথচ যৌবনেই হেলাল হাফিজ কবিতায় মানুষ জমানোর প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। বহুদিন হলো ভালো নেই তিনি, শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা ধরনের অসুখ। কিছুদিন আগেই ডাক্তার জানিয়েছেন একটি চোখ চিরতরেই বুঝি হারালেন কবি।

প্রেমের কবি ধীরে ধীরে সৌন্দর্য দেখা ভুলে গেলে এ শহরের প্রেমও যেন বধির হয়ে যাবে।

প্রেমের কবি, দ্রোহের কবি বেঁচে থাকুক আরও অনেকদিন। কবিকে আজকের দিনে ‘দৈনিক অধিকারের’ পক্ষ থেকে রইলো শ্রদ্ধা।