মুহুর্তেই চোখদুটো ভরে গেলো


Dhaka
Published: 2020-02-25 19:22:49 BdST | Updated: 2020-07-06 02:36:52 BdST

মুনাকে আমি খুন করেছি, সুস্থ মস্তিষ্কে খুন করেছি। কখনো ভাবতে পারিনি এমন হবে। ভালোবাসার সম্পর্ক আমাদের বছর দুয়েকের। অবশ্য আগ্রহটা ওর দিক থেকেই ছিল আর আমারো আপত্তি ছিল না।আমার বন্ধুবান্ধবরাও ওকে পছন্দ করত। ভালোই চলছিল আমাদের সম্পর্কটা। মেয়েটা অনেক বেশি ভালো, যেমনটা চেয়েছিলাম।

কিন্তু একটা সময় আমি ওর প্রতি কোনো টানই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এমন না যে অন্য কোনো নারীর প্রতি আসক্তি বা কাজের চাপ,,কিছুই না। তবুও কোনো মনোযোগ দিতে পারছিলাম না ওর প্রতি। ব্যাপারটার জন্য খারাপও লাগছে না।মুনা খুব শক্ত করে গভীর করে ভালোবাসতে পারে -এটা ওর বড় একটা গুণ।

সেদিন ওর জন্মদিন ছিল।রাত ১২টার দিকে জেগেই ছিলাম,,একটা কল / নক দিলেই পারতাম। সেও জেগে ছিল,নামের পাশে সবুজ বাতি জ্বলছিল। তারপরও একটা মেসেজ করলাম না।ইচ্ছে করলো না কেন জানি? সারাদিন একা একা ঘুরে বেড়ালাম, নিজের কাজ করলাম। জানি রাগ করতেছে, তারপরও কিছু করতে ইচ্ছে করতেছে না। দিন কেটে গেল। রাতে ও নিজেই কল দিলো, চুপ করে আছে।কিছু বলে না। কান্নাকাটি করছে হয়তো। বুঝলাম সবই তাও কিছু বললাম না, বলতে ইচ্ছে করলো না।

আমার শুধু মনে হতো আমাকে সাধারণ মানুষের মতো হলে চলবে না। সংসারের মায়ায় পড়ে গেলে আমি সাধারণ মানুষ হয়ে যাবো। আর এগুতে পারবো না।ধীরে ধীরে ওর সাথে মানসিক দুরত্ব বাড়তে থাকে। সেও হয়তো বুঝতে পারতো।

সম্পর্কের শুরুর দিকে মুনা শুধু ছেলেমানুষী করতো।একটু পর পর কল দিতো, মেসেজ করতো।ওর আর কি দোষ, বয়সটাই তো ঐরকম ছিল। আমার অসহ্য লাগত এত খোঁজ নেয়ার কি আছে! বিরক্ত যে হতাম এমন না। অস্বস্তি লাগতো। একদিন মুনাকে বললাম তুমি চিঠি লিখো। তোমার ভালোলাগা, খারাপ লাগা,আমার প্রতি অভিযোগ সব লিখবে,আমি চিঠি পড়ে নিজেকে শুধরে নিবো। মেয়েটা তাই ই মেনে নিলো। সরল বিশ্বাসে সে দিনের পর দিন চিঠি লিখে গেছে। কখনো হাতেই দিতো আবার কখনো ছবি তুলে পাঠাতো।আর আমি বিশ্বাসঘাতকের মতো তার চিঠিগুলো ইচ্ছে হলে পড়তাম, নাহলে খুলেও দেখতাম না। পড়ে থাকতো।  এভাবে গেছে প্রায় ২ বছর। ওর প্রতি আমার মনোযোগ কমেই যাচ্ছে।

আর এদিকে যত দিন যাচ্ছে, মুনার বিয়ে, সংসার, বাচ্চা নিয়ে স্বপ্নগুলো বড় হতে থাকে।ওর এই ব্যাপারটাও আমার অসহ্য লাগতে শুরু করে। ওর স্বপ্নগুলোর কথা বলতো,, আমি মনোযোগ দিয়ে শুনতে পারতাম না। অন্যদিকে তাকিয়ে থাকতাম। ও বুঝতে পেরে মাঝে মাঝে চুপ করে থাকতো। মাঝে মাঝে বলেই ফেলতো আমায় আর দেখতে পারো না কেন? দিন দিন মুনার ভেতরেও পরিবর্তন আসছিল। সেও আর আগের মতো হাসে না, কথা বলে না, হল থেকে এতগুলা গল্প এনে একটার পর একটা বলতে শুরু করে না। চুপচাপ থাকে।সে হয়তো বুঝে গিয়েছিল সবটা। ভেতরে ভেতরে মেয়েটা শেষ হয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারিনি।আমি আমার মতোই রইলাম।

একদিন বললো,,বাড়ি যাবো। আমি বললাম যাও,বলার কি আছে? ব্যাপারটাতে মুনা যথেষ্ট আহত হলো। মুহুর্তেই চোখদুটো ভরে গেলো। মনে হচ্ছিল পাতাটা ফেললেই গাল বেয়ে পানি পড়বে।

পরেরদিন মুনাকে নিয়ে মহাখালীতে আসলাম বিদায় দিতে।সিএনজিতে আসার সময় ও আমার হাতদুটো শক্ত করে ধরে চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, কেন জানি মনে হচ্ছে আমি তোমায় হারিয়ে ফেলছি, আমার বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে না।আমি কিছু বললাম না। কেন এমন মনে হচ্ছে ? - কথাটা বলেই বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। মুনাও আর কথা বাড়াবার আগ্রহ খুঁজে পেলো না। শুধু অস্পষ্টস্বরে বললো, জানি না।

কিছুক্ষণের মধ্যে মহাখালীতে পৌঁছে গেলাম। ওর বাস ছাড়ার পর আমি হলে চলে আসলাম। সারাদিন আর কথা হয় নি। রাত ১১ টার দিকে নিজেই কল দিলাম।একটা পুরুষকন্ঠ কাঁদতে কাঁদতে জানালো মুনা আর নেই। মুহুর্তেই পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেলো। ফোনটা রেখে দিলাম।বাসটা এক্সিডেন্ট করেছিল।

আমি মুনাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম ওকে শেষবারের মতো দেখতে। যাওয়ার কথা ছিল হাতির পিঠে করে রাজকুমারের সাজে রাজকুমারীকে আনতে। আর গেলাম রাজকুমারীকে শেষ বিদায় জানাতে। সেদিনই ঢাকায় চলে আসি।ওর বাবা-মার সাথে দেখা করার মতো সাহস আমার ছিল না। অপরাধবোধ কাজ করছিল খুব।

সবাই জানবে এটা একটা দুর্ঘটনা৷ শুধু আমি জানি এটা একটা খুন, পরিকল্পিত খুন। জানি মৃত্যু আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়,,তবু আমি মুনাকে ভালো রাখতে পারলে হুট করে বাড়ি আসতো না আর শেষটাও এমন হতো না।

হলে ফিরে চারপাশে ওর স্মৃতিগুলো দেখে ভেতরটা আরো দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিল। মেয়েটা আমার চারপাশে আষ্টেপৃষ্টে রয়েছে। কেন এমন হলো?? আমি মুনাকে ছাড়া চলবো কিভাবে?? আমি তো সংসার থেকে, মায়া থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম,,আমি তো মুনার কাছ থেকে তো মুক্তি চাইনি। বাকি জীবনটা আমি কিভাবে কাটাবো?? আমাকে কে এতটা ভালোবেসে আগলে রাখবে?? এসব বলতে বলতে চোখ দিয়ে পানি পড়ছে,,, সাইকিয়াট্রিস্ট সেলিনা বেগম আমায় সান্ত্বনা দিয়ে পরবর্তী সেশনের তারিখটা লিখে দিয়ে বললেন,,ঢাকার বাইরে থেকে ঘুরে আসতে। সারা শহরেই ওর স্মৃতি,,তাই ভুলতে পারছি না নাকি। যেখানেই যাই আমি মুনাকে কোনোদিনই ভুলতে পারবো না। কোনোদিন না। ভাবতে ভাবতে চেম্বার থেকে বের হয়ে হাঁটতে লাগলাম.....

 লেখক : মনিরা মনি