সুলেখার বিষণ্ণ প্রেম


Dhaka
Published: 2020-04-12 07:49:51 BdST | Updated: 2020-06-02 11:39:57 BdST

প্রচন্ড বজ্রপাতের শব্দে আর দমকা হাওয়া গায়ে লাগতেই ঘুম ভেঙে গেলো সুলেখার। স্কুল থেকে ফিরে দুপুরে খাওয়ার পর ঘুমানোটা অভ্যাসই হয়ে গেছে। করার মতো কোনো কাজ থাকে না আর দুপুরের দিকটাতে এমনিতেই ঝিমুনি আসে। মদীনার মাকে ডেকে দরজা জানালা বন্ধ করে দিতে বলেই সুলেখা বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো। দমকা বাতাস কিছুক্ষণ ওর পিঠের উপর পড়ে থাকা চুলগুলো নিয়ে খেলা করলো। তারপর শুরু হলো বৃষ্টি। বৃষ্টি শুরু হলে বাতাসের বেগ কমে যায়। বৃষ্টি পড়ছে, একদম ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টি মানুষকে উদাস করে দেয় সত্যিই কখনো ভালো স্মৃতি মনে করিয়ে আবার কখনো খারাপগুলো। বেলকনির গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতেই সুলেখা চলে গেলো ওর অতীতে। বৃষ্টি সম্ভবত ওকে বেশি নস্টালজিক করে তোলে। কি সুন্দরই না ছিল দিনগুলা- ওকদম স্বপ্নের মতো। বৃষ্টি শুরু হলেই মেসেজ করতো অনিকেতকে ভিজবা? চলো ভিজি। জানে সুলেখা এটা সম্ভব না, তবুও মেসেজ করতো এটা বুঝানোর জন্য যে, সে তার জীবনের সব সুন্দর মুহুর্তগুলা অনিকেতের সাথে কাটাতে চায়। আর অনিকেতের চিরচেনা উত্তর- পারি? কিভাবে? রাস্তায় ভিজবো? বৃষ্টিতে ভিজতে চাওয়ার আরো একটি কারন অবশ্য আছে সুলেখার। ওদের প্রেমের প্রথম চিঠিতে কোনো প্রেম নিবেদন ছিল না, ছিল একগুচ্ছ কদম ফুল হাতে ভিজতে চাওয়ার আবদার। আবদার টা অবশ্য সুলেখারই ছিল।

এরপর কয়েকটা বর্ষা কেটে গেলো। ওদের কিন্তু কদম ফুল হাতে বৃষ্টিতে ভেজা হয়নি তবে প্রেমটা এগিয়েছিল বেশ। অনিকেত অবশ্য কয়েকবারই কদম ফুল দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কিন্তু সুলেখার জন্য পারে নি। সুলেখার এক কথা- দিলেই শেষ হয়ে যাবে,,তোলা থাকুক। প্রত্যেক বর্ষায় তোমায় বলবো,, অপেক্ষা করবো, তুমি দিবে না, আমি আবার পরের বর্ষার জন্য অপেক্ষা করবো,, এতেই আনন্দ। তারপর কতগুলা বসন্ত তারা একসাথে ক্যাম্পাসে কাটিয়েছে,,,,,,,,

দেখতে দেখতে সুলেখার পড়াশোনাও শেষ হয়ে গেলো। হল ছেড়ে দিতে হবে,,থাকবে কোথায়। অনিকেত কোনোভাবেই সাবলেটে থাকতে দিবে না। আওব মিলিয়ে কোনো সমাধান না করতে পেরে সুলেখা সিদ্ধান্ত নেয় ময়মনসিংহ চলে যাবে আব্বা আম্মার কাছে। অনিকেতকে জানালো সিদ্ধান্তের কথা। সুলেখা ভেবেছিল ও যতোই সিদ্ধান্ত নিক,,শেষপর্যন্ত ওকে থেকে যেতে হবে, অনিকেত ওকে যেতে দিবে না। আর অনিকেতকে উপেক্ষা করার শক্তি সুলেখার নেই।

অনিকেত সেদিন ওকে আটকাতে পারতো। বলতে পারতো - যেও না। তুমি না থাকলে এই শহরে একা লাগবে খুব। কিন্তু অনিকেত এসবের কিছুই করলো না। অনিকেত হয়তো ভেবেছিল যদি সে হেরে যায়। যদি জীবনের কোনো প্রান্তে এসে কোনোকিছুর জন্য সুলেখা ওকে দায়ী করে। এই ভয়েই অনিকেত চুপ ছিল সেদিন।

সুলেখা অনিকেতের চোখে সেদিন হারিয়ে ফেলার ভয় দেখেছিল আর মনে মনে বলতেছিল অনিকেত, আটকাও আমাকে, যেতে দিও না, আমি হারাতে চাই না তোমায়, আমি এই শহরে তোমায় একা রেখে যাবো না, কষ্ট হবে।

দুজনেই দুজনের কথাগুলো না বলে বিদায় নিয়েছিল। ট্রেনের জানালায় মুখ রেখে চোখ ভরা পানি নিয়ে দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে শুধু বলেছিল ভালো থেকো। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম অনুভূতি দিয়েছেন কিন্তু সব অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ চোখের পানি দিয়ে সেরেছেন,, মানুষ অনেক কষ্টেও কাঁদে, খুশিতেও কাঁদে। ব্যাপারটা কেমন!

প্রথম দিকে ভালোই যোগাযোগ ছিল।ধীরে ধীরে যোগাযোগ কমে। দুজন দুজনের মতো ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ভুল বুঝাবুঝির জন্য আস্তে আস্তে সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যায়। সুলেখার অবশ্য একটা সরকারি চাকরি হয়েছিল। উপজেলা শহরের দিকে পোস্টিং। কয়েক বছর চাকরিটা করেছিল তারপর ছেড়ে দেয়। আবার চলে আসে প্রাণের শহর, স্মৃতির শহর ঢাকায়। একটা স্কুলে পড়ায় এখন। অনিকেতকে আর খুঁজে পায়নি। শেষ পর্যন্ত একাই রয়ে গেছে। সংসারে মানুষ বলতে এখন মদীনার মা। ভাইয়েরা যার যার মতো সংসারী, আব্বা আম্মা সংসার রেখে ওর সাথে ঢাকায় পড়ে থাকবে না। ভালোই আছে,,সবকিছু ভালোই যাচ্ছে তবে মাঝে মাঝেই ভাবে কেন ছেড়েছিলাম ঢাকা? একটা চাকরি পাবার জন্য? যে চাকরিটা শেষ পর্যন্ত করলামই না। থেকে যেতাম এই শহরে, কিছু না হোক অন্তত অনিকেত তো থাকতো জীবনে। এতো ভালো থাকার মাঝেও একা লাগে,,একটা কাঁধ খোঁজে, ভরসার হাত খোঁজে,,,

প্রায় ১২ বছর পর নিউমার্কেটের প্রচন্ড ভীড়ের মাঝে সুলেখার চোখ আটকে যায় একজোড়া চোখে,, চমকে উঠে,, হাত পা কাঁপতে থাকে - এ তো অনিকেত!!! এতো দিন পর!!! চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা,, বয়সের ছাপ চোখে মুখে স্পষ্ট। চেনাই যাচ্ছে না।।। ভীড় ঠেলে সামনে আগাতে গিয়েই হারিয়ে ফেলে। ও কি আমায় দেখেনি? চিনতে পারে নি? - ভাবতে থাকে সুলেখা। না পারারই কথা,,এতো বছর পর। এসব ভাবতে ভাবতে সামনে আগাতেই দেখতে পায় অনিকেতকে।সাথে ওর বউ আর কোলে ফুটফুটে একটা মেয়ে।মুহূর্তেই পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যায় সুলেখার, ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায়। ঐ জায়গাটা তো আমার, ওখানে তো আমার থাকার কথা ছিল - ভাবতে থাকে সুলেখা। কয়েক মুহূর্তের জন্য নিজেকে খুব বেশী অসুখী মনে হয়। কোনো মতে নিজেকে সামলে সেদিন বাসায় ফিরেছিল।

কয়েক মাস পর অনিকেত অবশ্য দেখা করেছিল সুলেখার সাথে। ঠিকানা কোথায় পেয়েছিল কে জানে। দেখা করেই অনিকেত সরি বলেছিল,,, অনেক খুঁজেছি তোমায়, সুলেখা। পাই নি। বাধ্য হয়ে পরিবারের চাপে বিয়েটা করেছিলাম। বিশ্বাস করো আমি তোমায় খুঁজেছিলাম। তোমার সাথে অন্যায় হয়েছে তার শাস্তিও পাচ্ছি। তুমি কেন বিয়ে করো নি,,সুলেখা?? সুলেখা সহজ ভাবে উত্তর দেয়- আমার তোমাকেই দরকার ছিল, এইজন্য করি নি। বাদ দাও,,আমাদের একটা সংসার হওয়ার কথা ছিল। আমার হয়নি,,তোমার তো হয়েছে। তুমি সুখী হও।

রাগ, অভিমান, ঘৃণা, ভয় শেষ হয়ে গেলে মানুষের মনে মমতা জন্মায়, সুলেখারও তাই হয়েছে। অনিকেত শুধু সেদিন বলেছিল- তোমার মতো আমায় কেউ ভালোবাসে না, আগেও বাসে নি, পরেও বাসবে না। কথাগুলো বলেই বের হয়ে গিয়েছিল সেদিন। অনেক দিন হয়ে গেলো দেখা হয় না।

ফোনের রিংটোনে ভাবনায় ছেদ পড়লো। পানির ঝাপটায় পুরো ভিজেই গেছে খেয়ালই করে নি। রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে একটা বই নিয়ে বসে গেছে। মদীনার মা চা দিয়ে গেছে।চা খাওয়া অভ্যাসটা আয়ত্ত করে ফেলেছে,,,,,,

বইটা হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতে উল্টাতে ভাবতে থাকে,,,সবাই সবকিছু পারে না,,, বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে সবাই সামনে আগাতে পারে না।যদিও পারাটাই উচিত।তবুও মন্দ নেই।

লিখেছেনঃ মনিরা মনি
সামসুুননাহার হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়