বন্ধ হয়ে নীলক্ষেতের মুস্তফা মামার পুরোনো বইয়ের দোকান


আবির আবরাজ/প্রথম আলো
Published: 2020-06-29 14:11:06 BdST | Updated: 2020-07-12 14:27:49 BdST

জগতে এমন একটা সময় চলছে, আগের মতো মানুষকে আর জিজ্ঞেস করা লাগে না কেমন আছেন। যেন এটা জানা কথাই হয়ে গেছে যে মানুষ এখন আর ভালো নেই। মানুষ আজকাল আর ভালো থাকে না। এখন এটা সহজ সত্য।

এমন খারাপ সময়ে মনটা আরও বেশি করে খারাপ হয়ে গেল সকালে ঘুম থেকে জেগে উঠে ফেসবুকে ঢুকতেই। নিউজফিডে সেই চিরপরিচিত মুস্তফা মামার ছবি। সহজাতভাবেই মানুষটার চারপাশে অজস্র বই। কিন্তু ছবিটির ক্যাপশনে লেখা, ‘বন্ধ হয়ে গেল মুস্তফা বইঘর’।

প্রথমে কিছুটা বিহ্বল লাগল। পরে স্থির হয়ে চিন্তা করলাম। কিন্তু বিশ্বাস করতেই ইচ্ছা করল না। কয়েক জায়গায় খোঁজখবর নিলাম, ঘটনাটি মিথ্যা, এমন যদি শোনা যায়, সেই আশায়। কিন্তু না, আসলেই আমাদের মুস্তফা মামা তাঁর আদরের ইন্দ্রপুরী বিক্রি করে দিয়েছেন। কিতাব স্বর্গের অন্য কোনো দেবতা ভালো দামে কিনে নিয়েছেন এই দেবালয়।

সমস্যা হলো সেই এত বছরের পরিচিত হাসিমুখটা যে আর দেখতে পাব না। যাওয়ামাত্রই যে কেউ আর বলবে না ‘কী, শরীর ভালা? কী বই?’ এমন একটা দৃশ্য ভেতরটাকে উপর্যুপরি আঘাত করে চলল।

অজস্র স্মৃতি বায়োস্কোপের মতো মগজে একে একে তাদের ‘পারফরম্যান্স’ দেখিয়ে যেতে লাগল। যেন আমি একটা ব্যথাতুর অঞ্চলের স্মৃতিকাতর পরিব্রাজক।

তখন সদ্য গ্রাম থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে ঢাকায় এলাম। কলেজে ভর্তি হয়েছি। সাহিত্যচর্চা আগেই চলত। কিন্তু তখন সময় সেই পালে হাওয়া লাগানোর।

অজপাড়াগাঁয়ে না পেয়েছি কাঙ্ক্ষিত বইয়ের দেখা, না পেয়েছি সেসব বই সংগ্রহ করব, এমন কোনো জায়গার খোঁজ। তবে নীলক্ষেত যে আমাদের দেশের বইপ্রেমীদের জন্য স্বর্গ টাইপের ব্যাপার, তা জানা ছিল। তো, ঢাকায় আসার পর বেশ কিছু সাহিত্যের অনুরাগী বন্ধুবান্ধব ও বড় ভাই জুটে গেছে তত দিনে। শাহবাগ, নীলক্ষেত, পুরান ঢাকার মতো জায়গাগুলোতে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছি। আর বইয়ের দরকার পড়লেই দৌড়ে নীলক্ষেত।

প্রথম যেদিন নীলক্ষেত যাব, এক বড় ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, কিছু ভালো বই দরকার কোথায় পাব? তিনিই তখন আমাদের দিলেন মুস্তফা মামার দোকান, মানে ‘মুস্তফা বইঘর’-এর খোঁজ।

এই হলো আমার মুস্তফা মামা এবং তাঁর স্বর্গে যাতায়াতের শুরুয়াত। হাতে যদিও সে সময় টাকাপয়সা জমার সুযোগ নেই, তবু খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি টাইপের জীবন যাপন করে যাচ্ছি। বেশ জোরেশোরে সাহিত্যকে তার প্রাপ্য সেবাও দেওয়া হচ্ছে নিয়ত। কিন্তু একজন সাহিত্যের মানুষ হিসেবে সব প্রয়োজন ছাপিয়ে যে প্রয়োজনটির মাথা বহু মাইল দূর থেকেও চোখে পড়ে সবার আগে, তা হচ্ছে বই। ফলে নতুন হোক কিংবা পুরোনো, বইয়ের দরকার মানেই আমার কাছে ছিল নীলক্ষেত। আর নীলক্ষেত মানেই সবার প্রথমে মুস্তফা মামার দোকান।

সহস্র বইয়ের কালেকশনসমেত একজন অসাধারণ বইয়ের দোকানি মুস্তফা মামা। তাঁর পুরো নাম কী, তা জানতাম না। তবে বেশ বুঝতে পারতাম, দারুণ পড়াশোনা জানা এবং চরমভাবে বইয়ের সঙ্গে সেঁটে থাকা এক মানুষ তিনি। এই বান্দাটিকে জ্যান্ত এনসাইক্লোপিডিয়া বললেও ভুল হবে না। বাংলা সাহিত্যের একটা বইয়ের নাম বলব আর তিনি সেই বইয়ের লেখকের নাম বলে দেবেন না, এমনটি কখনো হবে না।

তখনকার জীবনে টাকাপয়সার সমস্যা আমাদের বড় সঙ্গী ছিল বটে, কিন্তু তার চেয়েও বড় যে সঙ্গী, তা হলো বই। অবশ্যই বই। বই ছাড়া তো একটি মুহূর্তও চলবে না। তাই নীলক্ষেতে বইয়ের দোকানে বারবার গিয়েছি। অনেকবারই কয়েকটা বই পছন্দ হয়েছে, কিন্তু টাকায় কুলাচ্ছে না। কী করি তখন? বইগুলো রেখে আসতেও তো পরান পুড়ছে। সব মুশকিলের আসান অবশেষে মুস্তফা মামাই। তাঁর হাসিমুখ থেকে ছুটে আসবে কয়েকটা বাণী অমৃত, ‘সমস্যা নাই, লয়া যান, বই আগে, টাকার হিসাব পরে।’

অনেকবারই কয়েকটা বই পছন্দ হয়েছে, কিন্তু টাকায় কুলাচ্ছে না। কী করি তখন? বইগুলো রেখে আসতেও তো পরান পুড়ছে। সব মুশকিলের আসান অবশেষে মুস্তফা মামাই। তাঁর হাসিমুখ থেকে ছুটে আসবে কয়েকটা বাণী অমৃত, ‘সমস্যা নাই, লয়া যান, বই আগে, টাকার হিসাব পরে।’
এমনভাবে কত বই যে ধার করে এনে পড়েছি। কখনো এসব নিয়ে কোনো ঝামেলা হয়নি তাঁর সঙ্গে। কত কত দুষ্প্রাপ্য বই থাকত তাঁর সংগ্রহে! মজার ব্যাপার হলো, পুরোনো যে বইগুলোর প্রাণ যায় যায় অবস্থা, সেগুলোর বাইন্ডিং, মলাট লাগানো কিংবা অন্যান্য যেসব কাজ আছে, সেসবের জন্য তিনি কখনো বাইন্ডারদের কাছে যেতে রাজি নন। নিজেই দারুণ যত্নে একটা জীর্ণশীর্ণ বইয়ের শরীরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে বেশি ভালোবাসতেন।

নীলক্ষেত খোলা থাকা মানেই হলো মুস্তফা মামা থাকবেন নিজের বইয়ের দোকানে; আর বন্ধের দিন বাংলাবাজারে বই কেনার কাজে। এখন বই থেকে দূরে কীভাবে থাকবেন তিনি?

করোনাভাইরাস নামের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি অস্তিত্ব পুরো পৃথিবীর চেহারাটাই এখন পাল্টে দিয়েছে বলা যায়। যেমন পাল্টে দিয়েছে আমাদের নীলক্ষেতের পুরোনো বইয়ের দোকান। বলা বাহুল্য, পুরোনো বইয়ের দোকান মানেই তো আগে বুঝে নিতাম মুস্তফা মামার দোকান।

শুনলাম, করোনার এই দুঃসময়ে নাকি সারাক্ষণ শিশুর মতো হাসতে থাকা মুস্তফা মামার দোকান মৃতপ্রায় হয়ে গিয়েছিল। কয়েক মাস বিক্রিবাট্টা তো বন্ধই ছিল। তাই মামার পক্ষে তাঁর স্বর্গপুরী চালানোর ক্ষমতাই ছিল না আর। ফলে তিনি তা বিক্রি করে দিয়েছেন অন্য কারও কাছে। কী আর করার, এভাবে তো তিলে তিলে মরা যায় না, দোকানকেও মরতে দেওয়া চলে না।

জানি, আমরা তবু নীলক্ষেতে যাব। নানান দোকান ঘুরেফিরে আগের মতো বই কিনব। হয়তো মুস্তফা বইঘরের জায়গায় জনৈক নামধারী অন্য কারও কাছ থেকেও নেওয়া হবে প্রিয় কোনো বই। তবু একটা পার্থক্য থাকবেই—অতিপরিচিত সেই হাসিমুখটা আর দেখা হবে না। প্রিয় মুস্তফা মামা পরম আদরে আমাদের আর দেবেন না চা খাওয়ার প্রস্তাব। নিশ্চিতই সে জায়গা এসে দখল করে নেবে ভিন্ন কোনো আলাপ, অন্য কেউ বা অন্য কোনো প্রয়োজন।

পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষের পাশাপাশি করোনাভাইরাস এভাবেই হত্যা করে চলেছে লাখ লাখ অবর্ণনীয় সম্পর্কও। জানি না ঠিক কত দিন পর বন্ধ হবে তার হত্যাযজ্ঞ। কিন্তু আমার বা আমাদের সঙ্গে মুস্তফা মামার সম্পর্কটা এখানেই যে ইতি হয়ে গেল!