সংকটে প্রায় ১৪০০ চিকিৎসক-শিক্ষার্থী


Dhaka
Published: 2020-07-28 12:57:20 BdST | Updated: 2020-10-22 21:33:00 BdST

করোনাভাইরাসের মহামারির মধ্যেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) কর্তৃপক্ষ রেসিডেন্সি ও নন-রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের পরীক্ষার আয়োজন করতে যাচ্ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার বিভিন্ন কোর্সে ভর্তি থাকা প্রায় ১৪শ' শিক্ষার্থী বিপাকে পড়েছেন। তারিখ নির্ধারিত না হলেও আগামী মাসে এই পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়েছে। সব বিভাগের চেয়ারম্যানকে এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি নোটিশ আকারে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত ২২ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল হান্নান স্বাক্ষরিত এ-সংক্রান্ত একটি নোটিশ জারি করা হয়েছে।

নোটিশে বিভাগীয় চেয়ারম্যানদের পরীক্ষা গ্রহণের সময়সূচি নির্ধারণ করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসে পাঠাতে বলা হয়েছে। বিএসএমএমইউ সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় ও এর অধিভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম জুলাই-২০২০ সেশনের মেডিসিন, সার্জারি, ডেন্টাল ও পেডিয়াট্রিক্স অনুষদের অধীনে ৬২টি বিভাগে এমডি ও এমএস কোর্সে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী ভর্তি আছেন। ফেইজ-বির থিসিস অ্যান্ড থিসিস ডিফেন্স পরীক্ষা জুলাই মাসের মধ্যে নেওয়ার কথা ছিল। তাদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে কর্মরত। অন্যরা বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। এমডি এবং এমএস কোর্সের শিক্ষার্থীদের প্রথমে থিসিস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। এরপর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে।

আর ডিপ্লোমা কোর্সের শিক্ষার্থীদের শুধু লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়। চলতি শিক্ষাবর্ষে ডিপ্লোমা কোর্সে আছেন প্রায় এক হাজার ১০০ শিক্ষার্থী। তারা নন-রেসিডেন্সি হিসেবে বিবেচিত।

অর্থাৎ কর্মস্থলে চাকরির পাশাপাশি তারা ওই কোর্সটি সম্পন্ন করেন। রেসিডেন্সি কোর্সের শিক্ষার্থীরা ট্রেনিং পোস্টে ছুটি নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার বিভিন্ন কোর্সে অধ্যয়নরত ছিলেন। করোনা মহামারির কারণে তাদের ছুটি বাতিল করে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে পদায়ন করা হয়েছে। ওইসব চিকিৎসক আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত রয়েছেন। এ অবস্থায় হঠাৎ করে পরীক্ষার সিদ্ধান্তের ঘটনায় তারা হতবাক হয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসএমএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ূয়া বলেন, এখনও পরীক্ষার দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়নি। চলতি বছরের জুলাই সেশনের পরীক্ষা গ্রহণের জন্য বিভাগীয় চেয়ারম্যানদের মতামত চাওয়া হয়েছে। তাদের মতামত পাওয়ার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।

উপাচার্য আরও বলেন, জুলাই সেশনের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবর্ষ শেষ হতে যাচ্ছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে এখনও পরীক্ষা নেওয়া যায়নি। এ অবস্থায় শিক্ষাবর্ষ ঠিক রাখার জন্য চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। রেসিডেন্সি কোর্সে ভর্তি থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা থিসিস পেপার জমা দিয়েছেন শুধু তাদের পরীক্ষাই গ্রহণ করা হবে। যারা থিসিস পেপার জমা দেননি তাদের পরীক্ষা এখন নেওয়া হবে না।

থিসিস পেপার জমা না দেওয়া শিক্ষার্থীদের কীভাবে একই শিক্ষাবর্ষের সঙ্গে যুক্ত করা হবে- এমন প্রশ্নে উপাচার্য বলেন, যারা থিসিস পেপার জম দেননি তারা পরের শিক্ষাবর্ষে আসবেন। যারা থিসিস জমা দিয়েছেন তারা পরীক্ষা দেবেন। থিসিস গৃহীত হওয়ার পর তাদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হবে। কোর্সে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের কিছুটা এগিয়ে রাখার জন্য থিসিস পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

পরীক্ষার জন্য ফি নির্ধারণ করে সার্কুলার জারি : পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়ার কথা মুখে বললেও ফি নির্ধারণ করে সার্কুলার জারি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গত রোববার জারি করা ওই সার্কুলারে এমডি ও এমএস বি-ফেইজের জন্য ১১ হাজার ৪৫০ টাকা এবং অনিয়মিতদের জন্য আরও ৫০০ টাকা ধার্য করে তা আগামী ২৬ আগস্টের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে। বিএসএমএমইউর ওয়েবসাইট থেকে অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন করতে বলা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার থেকে আগামী ২৭ আগস্ট পর্যন্ত এ আবেদন করা যাবে। এ ছাড়া থিসিস পেপার ২৭ জুলাই থেকে ২৭ আগস্টের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল হান্নান বলেন, পরীক্ষার জন্য একটি প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট বিভাগের চেয়ারম্যানরা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে মতামত দেবেন। কর্মস্থলে থাকা চিকিৎসকদের বিষয়েও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করবে। সবার সঙ্গে আলোচনা করেই পরীক্ষার বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। সুতরাং, এটি নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই।

কোর্সের শিক্ষার্থীদের ছুটি বাতিল যেভাবে : গত মার্চে দেশে করোনার সংক্রমণ শুরু হয়। একপর্যায়ে দেশজুড়ে চিকিৎসক সংকট তৈরি হয়। করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকদের মধ্যে অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হন। তাদের সংস্পর্শে থাকায় আরও অনেককে আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইনে যেতে হয়েছে। এ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে অতিরিক্ত চিকিৎসকের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়। এরপরই উচ্চ শিক্ষার বিভিন্ন কোর্সে ভর্তি থাকা চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল করে সরকারি হাসপাতালে পদায়নের সিদ্ধান্ত নেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এরই অংশ হিসেবে গত ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাস থেকে বিভিন্ন কোর্সে ভর্তি থাকা চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল করে দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের করোনা ইউনিটে পদায়ন করা হয়। এরপরও সংকট নিরসন না হওয়ায় ৩৯তম বিশেষ বিসিএস উত্তীর্ণদের মধ্য থেকে ২ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়। আরও ৩ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। ছুটি বাতিল করে সরকারি হাসপাতালে পদায়ন করা ওইসব চিকিৎসককেই এখন পরীক্ষা নিতে চাইছে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ। এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী চিকিৎসকরা।

শিক্ষার্থীরা হতবাক : বিএসএমএমইউতে বিভিন্ন কোর্সে ভর্তি থাকা অন্তত ৫ জন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে করোনার সংক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ শিক্ষার কোর্সে ভর্তি থাকা চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল করে পদায়নের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাস থেকে ধাপে ধাপে সবার ছুটি বাতিল করে বিভিন্ন হাসপাতালে পদায়ন করা হয়। গত ৪-৫ মাস ধরে তারা সরকারি হাসপাতালে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসায় নিয়েজিত রয়েছেন। চিকিৎসা দিতে গিয়ে অনেকে আক্রান্তও হয়েছেন। আবার কেউ আইসোলেশনে, কেউ কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন। তাদের কেউই পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাননি। এ অবস্থায় হঠাৎ করে পরীক্ষার ঘোষণায় তারা হতবাক হয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বরিশাল অঞ্চলের একটি জেলার সরকারি হাসপাতালে পদায়নকৃত এক চিকিৎসক  বলেন, রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালে তিনি কর্মরত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এমডি কোর্সে ভর্তির সুযোগ পান। পরে ট্রেনিং পোস্টে ছুটি নিয়ে তিনি রেসিডেন্সি কোর্সে ভর্তি হন। গত ফেব্রুয়ারিতে তার ছুটি বাতিল করে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে পদায়ন করা হয়। এরপর থেকে তিনি ওই হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে কাজ করে আসছেন।

ওই চিকিৎসক বলেন, কাজ করতে গিয়ে তিনি আক্রান্তও হয়েছেন। আবার টানা ১০ দিন কাজ করার পর তাকে ১৪ দিনের আইসোলেশনে যেতে হচ্ছে। পরিবারের সঙ্গেও সময় কাটাতে পারছেন না। সব মিলিয়ে কঠিন মানসিক চাপ নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় কোর্সের পড়াশোনা করা সম্ভব হয়নি। এসব বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষা আয়োজনের চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন ছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর এক চিকিৎসক বলেন, করোনা মহামারির মধ্যে বিশ্বের কোনো দেশে এ ধরনের পরীক্ষার আয়োজন করা হয়নি। তাহলে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কেন এই সিদ্ধান্ত নিল তা জানা প্রয়োজন। প্রস্তুতি ছাড়া একজন শিক্ষার্থী কীভাবে পরীক্ষা দেবেন। করোনা ইউনিটে দায়িত্ব পালন করার পর কারও পক্ষেই পড়াশোনা করা সম্ভব নয়। সুতরাং এ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত অবান্তর।

রাজধানীর একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক চিকিৎসক জানান, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা না হলে থিসিস পরীক্ষা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা কি সেটি জানা প্রয়োজন। করোনা সংক্রমণের মধ্যে যেখানে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে থিসিস পরীক্ষা গ্রহণ করলে তা মানা সম্ভব হবে না। কারণ থিসিস পরীক্ষার জন্য একজন শিক্ষার্থীকে ৪০ থেকে ৫০ মিনিট শিক্ষকদের সামনে অবস্থান করে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। বর্তমান সময়ে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন ওই চিকিৎসক।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। নিজস্ব আইনের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হয়। সুতরাং, সেখানকার কর্তৃপক্ষ সার্বিক বিষয় চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। তাছাড়া পুরো বিষয়টি সম্পর্কেও তিনি অবহিত নন। এ অবস্থায় মন্তব্য করা কঠিন। বিষয়টি সম্পর্কে পুরোপুরি জেনে তিনি মন্তব্য করতে পারবেন। এ ছাড়া কোনো জটিলতা সৃষ্টি হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। তখন আলোচনার মাধ্যমে জটিলতা নিরসন করা যাবে। তবে এটি নিয়ে সংকট হবে না বলে মনে করেন তিনি।