বঙ্গবন্ধু, পনেরই আগস্ট এবং আমাদের করণীয়


টাইমস অনলাইনঃ
Published: 2018-08-14 20:16:34 BdST | Updated: 2018-09-26 00:04:11 BdST

মুহাঃ মাহমুদুল হাসান: পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট কালরাতে ঘাতক পাকিস্তানি দোসররা বাঙালী জাতির মহান স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী, বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছিলো। শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, তাদের হাতে একে একে প্রাণ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর সন্তান শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশু শেখ রাসেলসহ পুত্রবধু সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল।পৃথিবীর ইতিহাসে এই ঘৃণ্যতম হত্যাকান্ড থেকে বাঁচতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর সহোদর শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, ভাগ্নে যুবনেতা ও সাংবাদিক শেখ ফজলুল হক মনি, তার সহধর্মিনী আরজু মনি ও কর্নেল জামিলসহ পরিবারের ১৬ জন সদস্য ও আত্মীয়-স্বজন।সেনাবাহিনীর কিছুসংখ্যক বিপদগামী সদস্য সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর গোটা বিশ্বে নেমে আসে তীব্র শোকের ছায়া এবং ছড়িয়ে পড়ে ঘৃণার বিষবাষ্প।
টাইমস অব লন্ডন এর ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট সংখ্যায় বলা হয় ‘সবকিছু সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে সবসময় স্মরণ করা হবে। কারণ তাঁকে ছাড়া বাংলাদেশের কোন অস্তিত্ব নেই।’
ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের লাখ লাখ লোক শেখ মুজিবের নৃশংস হত্যাকান্ডকে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করবে।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর নোবেল জয়ী উইলি ব্রানডিট বলেন, শেখ মুজিবকে হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না। যে বাঙালি শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারে তারা যেকোন জঘন্য কাজ করতে পারে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক নীরদ শ্রী চৌধুরী বাঙালিদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বিশ্বের মানুষের কাছে নিজেদের আত্মঘাতী চরিত্রই তুলে ধরেছে।
ওরা যখন দেখেছিলো বাঙালী ও বাঙলার একক আধিপাত্য শেখ মুজিবুর রহমানের। ঠিক যেমনটি দেখেছিলো পলাশীর প্রান্তরে মীর জাফর। তখনই ওরা আদাজল খেয়ে বঙ্গবন্ধুকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে। কুড়িগ্রামের বাসন্তী থেকে শুরু করে দক্ষিণ পঞ্চিমাঞ্চলের সর্বহারা পার্টি সবদিক থেকেই সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুকে বিতর্কিত করতে। বহির্বিশ্বের বঙ্গবন্ধুর অবিসংবাদিত নেতার উপাধীতে কালিমা লেপনে চেষ্টা করেছে ওরা। ওরা পাকিস্তানের পরাজিত শক্তি। তৎকালীন আওয়ামীলীগের ভিতরে ও বাইরে ওদের শক্ত অবস্থান ছিলো। সমস্ত কৌশল ব্যার্থ হওয়ার পর পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টকে ওরা বেছে নিয়েছিলো জাতির কলংকিত অধ্যায় রচনা করতে আর ওদের ভাষায় স্বৈরাচারী শাসকের পতন এবং ওদের ঘৃন্য স্বার্থ চারিতার্থ করা।

এখন প্রশ্ন হলো এই হত্যাকান্ডে ওদের চাওয়া কি এবং কতটুকু সফল। জাতির এই কালো অধ্যায়ের পিছনে শত শত কারণ রয়েছে। প্রতিটি কারণই হলো বাঙলাকে বিশ্ব বুকে মাথা তুলে দাড়াতে না দেয়া এবং জাতির জনককে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা। ওরা কতটুকু সফল হয়েছে ? এই প্রশ্নটির উত্তর শতভাগ সফল না হলেও বাঙালীদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্ত তৈরি করতে পেরেছে। এই বাংলাদেশ, যে বাংলাদেশের একমাত্র স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির জনক তাঁর সাথে যখন অন্য কোনো অধীনস্থ কর্মচারীর তুলনা করা হয় কিংবা তার সমকক্ষ বানানোর পায়তারায় সর্বদা লিপ্ত একটি মহল তখন বলাই যায় ওরা সফল হয়েছে। দীর্ঘ একুশ বছর ওরা বাঙালীদের পিছিয়ে রেখেছিলো এটাইবা কম কিসে। ওরা বাঙালী ও বাঙালীয়ানায় দুটো ভাগ করে দিয়েছে। এটাইবা কম কিসে। ওরা যা চেয়েছিলো তার শতভাগ না হলেও তারচেয়ে একটু কম সফল হয়েছে।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সময়ে বঙ্গবন্ধু সবার ছিলো, জয় বাংলা স্লোগান সবার ছিলো কিন্তু এখন কি সবার আছে? উত্তর হলো নাই । তাহলে কেন নাই? বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর কি তাঁর আদর্শের মৃত্যু হয়েছিলো? নাকি আমাদের দায় এড়ানোর সংস্কৃতিতে ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে আমরা সহযোগীতা করেছি। আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় বঙ্গবন্ধু কতটুকু প্রভাব ফেলেছে। আমরা যারাই বঙ্গবন্ধুকে বুকে ধারণ করার কথা বলিনা কেন কতুটুকু ধারণ করতে পেরেছি। যতটুকু করছি লোক দেখানো বৈ কিছুইনা। বঙ্গবন্ধু এদশের জাতির পিতা অথচ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে মাত্র একটি এমফিল গবেষণা করা হয়েছে। দেশে এত এত বঙ্গবন্ধুপ্রেমী , এত এত বঙ্গবন্ধুর উপর লেখা; গবেষণা মূলক লেখা কয়টা আছে? অথচ অন্যান্য দেশের জাতির পিতাকে নিয়ে প্রতি বছর গবেষণা, সিনেমা, ডকুমেন্টারী থেকে শুরু করে বাৎসরিক নানান আয়োজন থাকে।

লেখক 

আমরা যেটুকু করি সেটা হলো পনেরই আগস্ট আসলে সারাদিন রাস্তার মোড়ে মোড়ে মাইকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজাই। কতটুকু আমাদের মধ্যে ধারণ করেছি? আমরা আরো কি করি প্রত্যেক ওয়ার্ডে গরু জবাই করে কাঙালী ভোজের নামে বনভোজন সেরে ফেলি । আমরা এগুলো করি দায়মুক্তি থেকে। যা না করলেই নয়। অথচ সারা বছর আমরা বেমালুম বঙ্গবন্ধুকে ভুলে থাকি। তাঁর প্রত্যেকটি ভাষণ ছিলো একেকটি দর্শন, একটি জাতি গড়ার সংবিধান আমরা কতটুকু এই সংবিধান মেনে চলেছি। পাকিস্তানের প্রেতাত্মাদের বাদ দিলাম যদি আওয়ামীলীগের কর্মীরা মানতো তবে বঙ্গবন্ধু সবার হতো। টাইমস অব লন্ডনের কথাগুলো সত্যি হতো।

তবে আশার বানী হচ্ছে এইযে বঙ্গবন্ধু তনায়াদ্বয়ের বেঁচে থাকা। কারণ যে আওয়ামীলীগ রেখে গিয়েছিলন বঙ্গবন্ধু সে আওয়ামীলীগ হয়তো ওদের পথ সুগম করে দিতেন যারা প্রতিবাদ করতো কিংবা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইতো তাদেরকে চার নেতার মতো হত্যা করা হতো। বঙ্গবন্ধু তনায়াদ্বয়ের চেষ্টায়ই কেবল বঙ্গবন্ধু তাঁর আদর্শ তরুনদের মধ্যে ফিরতে শুরু করেছে। বৃদ্ধ এবং তরুণরা বঙ্গবন্ধুকে লালন করে। কিন্তু পঁচাত্তর পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এখনো বঙ্গবন্ধুকে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মনে হয়। তাইতো তারা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের ম্যাগাজিনে এরকম পরিচয় দেয়ার ধৃষ্টতা দেখায়।
আমাদের পনেরই আগস্টের শোক ও অতঃপর দায়মুক্তি থেকে বেড়িয়ে এসে এই বাঙলা ও বাঙালী জাতি সত্ত্বার জন্য হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিটি দর্শন এবং গৃহীত পদক্ষেপ যা তিনি সমাপ্ত করতে পারেননি সেগুলোকে পরিপূর্নতা দিলেই হয়তো বঙ্গবন্ধুর সত্যিকারের সোনার বাংলা পাওয়া যাবে। একজন মানুষ যিনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা তাঁর বাবার আদর্শ প্রতিষ্ঠার দায়ভার তাঁর উপর না ছেড়ে প্রতিটি মানুষের জায়গা থেকে, দল মত নির্বিশেষে সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বঙ্গবন্ধুর রক্তের ঋণ শোধ করা সম্ভব অন্যথায় দায়মুক্তিতে কোনো লাভ হবেনা।
আমরা আনুষ্ঠানিকতার আরম্ভরতায় না পরে সত্যিকার অর্থেই যেন বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করি। তবেই পনেরই আগস্টের শোক শক্তিতে রূপান্তরিত হবে।

লেখকঃ মুহাঃ মাহমুদুল হাসান
বিতার্কিক ও গবেষক
সাবেক সহ- সভাপতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।