একটি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি দেশের ইতিহাস


ধীরাজ কুমার নাথ
Published: 2018-12-04 23:18:13 BdST | Updated: 2018-12-12 03:33:44 BdST

পূর্ববাংলার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু ১৯২১ সালের ১ জুলাই। শুরু থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার বিভিন্ন অঙ্গনে এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশে যে অবদান রেখেছে, তার মূল্যায়ন করেই এই বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। সৌরভে-গৌরবে এই বিশ্ববিদ্যালয় এখনো তার সুনাম রক্ষা করতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

আর মাত্র ২ বছর পর উদযাপিত হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ মহাসমারোহে। আবার ২০২১ সালেই উদযাপিত হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। মাত্র ২ বছর পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপরিচালনায় সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হবে সর্বত্র এবং বিভিন্ন মহলে। সঙ্গে অবশ্যই আলোচিত হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমূল্য অবদানের কথা, যেখানে আসবে রাষ্ট্রভাষা ও স্বাধীনতা অর্জনের পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানের কথামালা এবং একই সঙ্গে থাকবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার বিকাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানের কাহিনি। তবে একটি বিষয় অবশ্যই বড় হয়ে আসবে তা হচ্ছে মানবিক চেতনার বিকাশে এই উপমহাদেশে তথা বিশ্বপরিম-লে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্ররা যে বিশাল ভূমিকা রেখেছেন তার মূল্যায়ন হবে সর্বত্র এবং বিস্তারিতভাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমূল্য অবদান হচ্ছে চিরভাস্বর, প্রোজ্জ্বল। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে মিশে আছে এ দেশের ইতিহাস।

কার্জন হল 

মাত্র তিনটি অনুষদ ও ১২টি (কলা, বিজ্ঞান ও আইন ছিল প্রধান এবং সংস্কৃত ও বাংলা, ইংরেজি, শিক্ষা, ইতিহাস, আরবি, ইসলামিক স্টাডিজ, ফার্সি ও উর্দু, দর্শন, অর্থনীতি ও রাজনীতি, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত এবং আইন) বিভাগ নিয়ে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু ১৯২১ সালে। প্রথম বর্ষে বিভিন্ন বিভাগে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৮৭৭ জন এবং শিক্ষক সংখ্যা ছিল মাত্র ৬০ জন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী ছিল লীলা নাগ, বিভাগ ইংরেজি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্নে পাঠদান করতেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, এফসি টার্নার, জিএইচ ল্যাংলি, ডব্লিউ এ জেনকিন্স, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, রমেশচন্দ্র মজুমদার, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, কাজী মোতাহার হোসেন এবং স্যার এএফ রহমানের মতো প্রথিতযশা শিক্ষাবিদরা।

লেখকঃ ধীরাজ কুমার নাথ

প্রতিষ্ঠালগ্নে ৬০০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়। তবে পাকা ভবনের সংখ্যা ছিল সামান্য কয়েকটি মাত্র। এখন হয়েছে অনেক এবং তাতে আছে দেখার মতো ভবনের সৌন্দর্য ও গাছগাছড়াসহ ফুলের সমারোহ। বর্তমানের সিনেট ভবনে যারা সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করেন, তাদের মতে এ হচ্ছে এক অভিনব স্থান। এমনি হচ্ছে অহঙ্কার করার মতো জগন্নাথ হলের সন্তোষ ভট্টাচার্য ভবন। আমাদের ছাত্রাবস্থায় ৬০-এর দশকে জগন্নাথ হলের আবাসিক ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থার কথা ভাবলে আমাদের ভালো লাগে।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে ১৩টি অনুষদ, ৮১টি বিভাগ, ১১টি ইনস্টিটিউট, ৪৯টি গবেষণা বুরে‌্যা ও কেন্দ্র, ১৯টি আবাসিক হল, ৫টি হোস্টেল, ১ হাজার ৯৫৫ জন শিক্ষক, ৩১ হাজার ৯৫৫ জন ছাত্রছাত্রী, ১ হাজার ৯২ জন কর্মকর্তা, ১ হাজার ১৩৭ জন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী, ২ হাজার ২০৫ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। বিশাল এক ভুবনের অধিকারী হচ্ছে এই বিশ্ববিদ্যালয়, সর্বদা চিন্তা ও চেতনায় আছে উদ্বুদ্ধ এবং ভাবাবেগে উদ্বেলিত।

ডাকসু 

এ ছাড়া প্রায় ১ হাজার ৩৮৭ জন পিএইচডি এবং ১ হাজার ৩৩৮ জন এমফিল ডিগ্রি লাভ করেছেন এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ ও ইনস্টিটিউটের সংখ্যা প্রায় ১০৪টি। এসব কলেজ ও ইনস্টিটিউটে শিক্ষক আছেন প্রায় ৭ হাজার ৫৯১ জন এবং তাতে শিক্ষার্থী আছে প্রায় ৪০ হাজার ৬৯৮ জন। এক কথায় বলতে হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার প্রসারে এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞার বিকাশে এবং দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা রেখে আসছে। পৃথিবীতে এত বড় বিশাল শিক্ষাঙ্গন এবং তার বলয় খুবই স্বল্পসংখ্যক।

নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন একটি দর্শনীয় ভবন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) প্রতিনিধি এই সিনেটে নেই, তাই সিনেটের সভা কবে হচ্ছে জানাই যায় না। কারণ ডাকসুর নির্বাচন হচ্ছে না প্রায় ২৫ বছর। এই ডাকসু ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে, ১৯৬২-এর শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, ১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ, ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে এবং জাতির উত্থান পর্বের প্রতিটি পর্বে অসামান্য ভূমিকা রেখেছে। পরবর্তীকালে স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনসহ বিভিন্ন সংস্কার প্রক্রিয়ায় সবকিছুতেই দিয়েছে নেতৃত্ব। দীর্ঘ ৯৫ বছর হচ্ছে গৌরবের ইতিহাস।
এখন কোনো প্রতিনিধিত্বমূলক ছাত্র সংসদ নেই। এখন সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে। ছাত্রদের দাবি এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের ভাবনা, মানবিক চেতনার বিকাশে তাদের কর্মসূচি কিছুই জানার উপায় নেই। তাই সবার অজান্তে গড়ে উঠছে ছাত্রদের মাঝে সন্ত্রাস এবং উগ্রপন্থিদের পদচারণাকে প্রতিরোধ করার কোনো ফোরাম নেই। আধুনিক শিক্ষার প্রতি আকর্ষণ করার মতো সংগঠন নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত কলেজ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংগঠন নেই বলে রাতের অন্ধকারে শিক্ষিত ছেলেদের উগ্রপন্থি হতে সাহায্য করছে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলা শিক্ষার মান সংরক্ষণে মনোযোগী হচ্ছে না এবং এর প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করার কোনো ফোরাম নেই। বড় কথা হচ্ছে, গণতন্ত্রের কথা বলছি চিৎকার করে অথচ গণতন্ত্রের সূতিকাগার বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক চর্চার পরিবেশ দৃশ্যমান হচ্ছে না, এমনটা হচ্ছে অনভিপ্রেত চেতনার এক অধিক্ষেত্র।

মধুর ক্যান্টিন 

শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে অবক্ষয় হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক বৈচিত্র্য এসেছে, গবেষণার সাম্রাজ্যে এসেছে নিত্যনতুন ভাবনা। সরকার শিক্ষার ক্ষেত্রে বাজেটে অর্থ বরাদ্দ বাড়িয়েছে কিন্তু শিক্ষার মান ও নীতিমালা নির্ধারণে অনেক মতভেদ এবং ফাঁক আছে। আধুনিক শিক্ষা ও বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে যদি ধর্মীয় শিক্ষাকে সমান আর্থিক বরাদ্দ দেওয়া হয়, তবে বিজ্ঞান ও ধর্র্মীয় ভাবনার বিরোধ বাড়বে এবং সন্ত্রাসী আচরণ বৃদ্ধি পেতে বাধ্য। এখানে সরকারকে একটি পথ বেছে নিতে হবে। বেকার যুবক সৃষ্টি করার নাম মানবসম্পদ উন্নয়ন নয়। বাস্তবতা হচ্ছে, কারিগরি দক্ষতার চাহিদা, প্রযুক্তিবিদ্যা এবং প্রকৌশলীদের বর্তমান ভুবনে ‘কাব্য ব্যাকরণ তীর্থ’ সৃষ্টির অপর নাম হচ্ছে মানবসম্পদের অপচয়। এ ব্যাপারে অনেক আলোচনা করা যায় কিন্তু তাতে ভাবাবেগে তাড়িত কিছু ব্যক্তি বিরূপ হতে পারেন। কিন্তু সরকারকে সঠিক পথের দিকনির্দেশনা দিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এখন প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে মানবিক চেতনার বিকাশে অনেক বেশি বিনিয়োগ করার। এই বিনিয়োগের অর্থ হচ্ছে একটি পৃথক বিভাগ খুলে সেখানে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন এবং মানবিক চেতনার বিকাশে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা। অনেকেই মনে করেন, বর্তমানে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হয়েছে দারুণভাবে। কারণ অর্থকরী শিক্ষার সঙ্গে কিছুতেই আদর্শগত শিক্ষা তার অবস্থান দৃঢ় করতে পারছে না। আরও অনেক দায়িত্ব পালন করতে হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও তাকিয়ে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং সিলেবাসের প্রতি। তাই দিক নির্ধারণে নেতৃত্ব দিতে হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। সাম্যের বার্তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে শিক্ষাঙ্গন থেকে এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার উন্মেষ ঘটাতে হবে প্রতি পদে পদে।

টিএসসি 

অনেক মনীষীর পদচারণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অভিষিক্ত। অনেক গৌরবের স্মৃতি নিয়ে এগিয়ে চলেছে এই মহান শিক্ষাঙ্গন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা, জ্ঞান ও বিজ্ঞানের চর্চায় এই বিশ্ববিদ্যালয় হোক বিশ্বব্যাপী অভিনন্দিত এক বিদ্যাপীঠ।

লেখক : ধীরাজ কুমার নাথ , সাবেক সচিব ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।