ভিকারুননিসায় নকলের হয়রানি এখনো মর্মপীড়া দেয়


টাইমস অনলাইনঃ
Published: 2018-12-05 20:42:34 BdST | Updated: 2018-12-12 03:33:48 BdST

শুরুতেই বলে নিই, এ গল্পটা আমার। ২০০০ সালের কথা বলছি। তখন ডিজিটাল কোন ডিভাইস আমাদের হাতে আসেনি। বাসায় ল্যান্ডফোনই ভরসা দ্রুত যোগাযোগের জন্য। পত্রপত্রিকায় ‘নকল’ শব্দটা পড়লে এবং বিষয়টা বুঝলেও তা করবার মতন অবস্থা বা চিন্তা কোনটাই আমার ছিল না।

চতুর্থ শ্রেণীর গণিত পরীক্ষা চলছিলো। পরীক্ষার হলের নিয়মাবলীর মধ্যে আমাদের ক্লাসে আগে কখনো বলে দেয়া হয়নি যে বাইরে থেকে রাফ করবার জন্য সাদা কাগজ আনা যাবে না কিংবা আনলে কি সমস্যা হতে পারে। গণিত পরীক্ষায় রাফ করাটা তখন কেবল শুরু। ৪০ নম্বরের ওপর উত্তর করে ফেলেছি। আবছা মনে আছে সাথে আনা সাদা কাগজে জ্যামিতির একটা অংশ ‘ত্রিভুজ’ এর ছবি এঁকে পেন্সিলে রাফ করেছি। কোন একটা মেয়ে বলে উঠলো-‘মিস, ও নকল করছে।’

সাথে সাথে পরীক্ষার ডিউটিতে দায়িত্বরত শিক্ষিকা এসে ছোঁ মেরে খাতাটা নিয়ে নিলেন। ওইটুকুন বয়সের একজন মানুষের পক্ষে যা বুঝিয়ে বলা সম্ভব তা বললাম। আমার কোন কথাই শোনা হলো না। ‘কি সাংঘাতিক! এই বয়সেই নকল করা শুরু করেছো!’ ইত্যাদি ধরনের কথা...। কান গরম হয়ে গেলো। মাথাটা বনবন করে ঘুরছিলো শুধু। আমি বুঝতেই পারছিলাম না যে কি থেকে কি হয়ে গেলো। বাকিরা পরীক্ষা দেয়া বাদ দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। বাজে একটা অবস্থা!

পরীক্ষা দেয়া বন্ধ করে দিয়ে আমাকে সরাসরি প্রিন্সিপাল আপার রুমে নেয়া হলো। তখন ধানমন্ডি ভিকারুন নিসার প্রভাতী শাখার দায়িত্বে ছিলেন দিলারা জামান আপা। উনি বাজেভাবে কখনো কথা বলতেন না। রাগ হয়েছিলেন মনে আছে। তবে বার বার জিজ্ঞেস করছিলেন-‘এটা কেন করেছো? ভুল করেছো, স্বীকার করো। কারো জিনিস না বলে নেয়া যেমন চুরি, এটাও এক ধরনের চুরি। ভুল স্বীকার করো। মাফ পাবে।’

আমি বারবার বলে গেলাম যে আমি নকল করিনি। অফিস রুমের বাহিরে দাঁড় করিয়ে রাখা হলো। পরীক্ষাশেষে একজন শিক্ষার্থী আমার দিকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে বলছিলো- ‘আম্মু জানো এই মেয়েটা না নকল করেছে...’। মেয়েটার মা আরো চোখ বড় বড় করে আমাকে দেখছিলো। লজ্জায় আমি কোথায় মুখ লুকোবো তা ভেবে পাচ্ছিলাম না। আমার অভিভাবককে ডাকা হয়েছে ততক্ষণে। আমার মা আসবার পর তার সামনে তো আরো একচোট ঠাণ্ডা অপমান চললো। ‘এই বয়সে আপনার মেয়ে নকল কাকে বলে বুঝে গেছে! এ বয়েসে আমরা তো কিছুই বুঝতাম না!... ইত্যাদি। স্পষ্ট মনে আছে আমি তখন কাঁদছিলাম। আমার অন্তরাত্মা জানে যে আমি নকল করিনি কোনভাবেই।

আমার মা আমার হয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছিলেন, বলেছিলেন- ‘ম্যাডাম, ও ছোটমানুষ। বুঝতে পারেনি, ভুল করে ফেলেছে।’ চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছিলো। দাঁতে দাঁত পিষে বললাম- ‘আমি নকল করিনি!’ আমার মাও একজন আদর্শবান শিক্ষক। মায়ের কথার ওপর কখনো কথা বলিনি।

আমার মা কয়েকবার বললেন- ‘বলো, আমি ভুল করেছি, আর কখনো এমন হবে না।’
অবশেষে বলতে বাধ্য হলাম- ‘আমি ভুল করেছি, কখনো এমন হবে না।’ এতে করে আমার পরীক্ষা বাতিল হলোনা ঠিকই, কিন্তু মনে দাগ পড়ে গেলো একটা বিশ্রী।

যে ভুল আমি করিনি তার দায় জোর করে আমাকে দিয়ে স্বীকার করিয়ে নেয়া হয়েছে। আমার মনের ওপর দিয়ে সেদিন কি গেছে তা আমি আর আমার সৃষ্টিকর্তাই ভাল জানেন। আজও আমি ওই পরিস্থিতি ভুলতে পারিনা। ‘নকল’ শব্দটা কোথাও পড়লে বা শুনলে ঐ সময়টা মাথায় আসে, যন্ত্রণা হয় অদ্ভুত একটা। রাগ হয়।

এখন আমি আর সেই চতুর্থ শ্রেণীতে পড়া মেয়েটি নেই। আমিও এখন একজন শিক্ষক। সুযোগ পেয়েছি বিভিন্ন বয়সের মানুষ এবং শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ এবং নানা দিক সম্পর্কে পড়াশোনা করবার।

শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মনে রাখে দু’ভাবে- সুশিক্ষক কিংবা চরম বাজে আচরণের শিক্ষক হিসেবে। যেখানে শিক্ষাদান একটি উভয়মুখী ও শিক্ষার্থীবান্ধব প্রক্রিয়া সেখানে ‘শিক্ষার্থী মাত্রই ভুল এবং শিক্ষকমাত্রই সবজান্তা/সঠিক’- এমন ধারণা পোষণকারীদের জন্য একরাশ সমবেদনা।

স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীরা শিখতে আসেন। যতটুকু সম্ভব নমনীয় থেকে তাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেয়া এবং শোধরাবার সুযোগ দেয়াটাই শিক্ষকদের কর্তব্য, ক্রমাগত ভুল ধরে শাস্তি দিতে মুখিয়ে থাকাটা একেবারেই নয়। একজন শিক্ষার্থী কেন তার শিক্ষককে ভয় পাবে? কেন ভালোবাসবে না কিংবা অশ্রদ্ধা করবে যেমনটা আমি ঐ শিক্ষিকাকে করি এখনো?

আমি বলছি না যে আমার স্কুল-কলেজের স্বনামধন্য সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খারাপ কিংবা সেখানকার শিক্ষকরা খারাপ। জীবনে প্রচুর ভাল শিক্ষক আমি পেয়েছি যারা আমাকে তিলে তিলে গড়েছেন। কিন্তু ভাবুন তো একবার, ঐ ঘটনায় যে মানসিক আঘাত আমি পেয়েছি তা সহ্য করতে না পেরে যদি নিজের কোন ক্ষতি করে বসতাম তবে এ দায়টা কার হতো?

সম্প্রতি আমার স্বনামধন্য সেই স্কুলের নবম শ্রেণীর একজন শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারী আত্মহত্যা করেছে। হয়তো তার কিছু দোষ ছিল, হয়তো ছিল না। আমি শুধু জানি-এটি আত্মহত্যা নয়, এটি হত্যা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া যখন চলমান তখন পাঠদানের দক্ষতা যাচাইয়ের পাশাপাশি খেয়াল করা হয় কি যে, প্রার্থী কতখানি শিক্ষার্থীবান্ধব? বিভিন্ন জরুরী পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীবান্ধব কোন সিদ্ধান্তগ্রহণে তিনি কতখানি পারদর্শী তাও কি দেখা হয়?

শিক্ষকরা তো মানুষ গড়ার কারিগর। একজন শিক্ষকের কাছে একেকজন শিক্ষার্থীর জীবন প্রজ্বলিত একেকটি দীপশিখার মতন। চাইলেই কি খেয়াল-খুশি মত দ্বীপ বুজিয়ে ফেলা যায়? মানুষের জীবন কি এতই সস্তা? প্রশ্নটা রেখে গেলাম আপনাদের সকলের কাছে।

লেখক: শাহজীদা নাজনীন, প্রভাষক (বিজ্ঞান, ইংরেজি ভার্সন), ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল এন্ড কলেজ,
শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।