বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় সঙ্কট : প্রকৃত সমস্যা কোথায়? সমাধানই বা কী?


Sanjay Sarker
Published: 2019-04-22 19:26:30 BdST | Updated: 2019-07-20 12:16:26 BdST

বাংলাদেশের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যা প্রায় একই প্রকৃতির। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ও ঠিক সেরকমই। তবুও বিশ্ববিদ্যালয়ের বুঁকে চেপে বসেছে দারুণ অনিয়ম। এই অনিয়মের কেন্দ্রে বসে আছেন একজন ব্যর্থ উপাচার্য। তার দায়িত্বগ্রহণের শুরুতে শিক্ষকদের এক মিটিংএ তিনি বললেন- আমরা সবাই রাজা এই কথাটি এখানে চলবে না। এখানে রাজা একজন। সেদিনই আমি বুঝেছিলাম দিন সামনে ভাল আসছে না। এই উপাচার্য এখনো দম্ভের সাথে বলেন যে 'নীতি নিয়ে চললেই যত সমস্যা'! এও বলেন- কেউ একটা দুর্নীতির কথা বলুক আমি চলে যাবো। অথচ চাকুরি স্থায়ীকরণের বোর্ডে তিনি আমাকে ইচ্ছাপূর্বক আটকে দিলেন। বিভাগের অন্য একজন শিক্ষককেও আটকে দিলেন অহেতুক অজুহাতে। আমার যেহেতু কোনো অজুহাত ধরতে পারেন নাই তখন বললেন - আমি দেবো না। চেয়ারম্যানকে বললেন কত বড়ো সাহস তুমি ওর জন্য সুপারিশ করো! অনেক পরে যখন তার কাছে জানতে চাওয়া হলো তিনি বললেন - শোনো রমজান মাসের দিন রোজা থেকে মিথ্যা বলবো না, আমিতো দিতেই চেয়েছি, তোমাদের এক্সপার্টরাতো দিলো না! আমি শুনে আশ্চর্য হয়েছি! ধর্ম ব্যবহার করতে তিনি দ্বিধা করেন না। একবার ১লা বৈশাখের শোভাযাত্রা ও অনুষ্ঠান হলো ৩ রা বৈশাখ। বলা হলো সেদিন শবে-মেরাজ তাই পরে হবে। অথচ পুরো বরিশালে ১লা বৈশাখ পালিত হয়েছে। কোথাও কোনো সমস্যা হয়নি। তিনি ধর্ম ব্যবহার করে ১লা বৈশাখকে ৩রা বৈশাখে নিয়ে গেলেন! আসলে তার পরিবারের নিকটতম কেউ বিদেশে যাচ্ছিলেন এমনটাই শুনেছি। বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান নিয়োগে যে অনিয়ম করেছেন। পুরনো চেয়াম্যানকে ইচ্ছা করেই দায়িত্ব দেননি। সেসব কি অনিয়ম নয়! শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছিলো ২২ দফার। কিন্তু আন্দোলন চলাকালীন তিনি একবারও ক্যাম্পাসে আসেন নাই। যতবারই আন্দোলন হয়েছে ততবারই উপাচার্য অস্থিতিশীল পরিবেশে ঢাকায় বসে বসে বড়ো বড়ো নির্দেশ নামা পাঠাতেন। অথচ সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়ালে কত ভালো সমাধান হতে পারতো। যখন চারিদিকে ঠান্ডা তখন এসেছেন। অনেকেই তাকে বাহবা দিয়েছে। কতজনই তার পথ পরিস্কার করে ঘরে তুলেছে। শিক্ষার্থীরা কিছুই পায়নি। আন্দোলন থামানোর হোতাগণ অনেককিছুই পেয়েছেন। শিক্ষার্থীরা এখনো অনার্স শেষ করে মাস্টার্সের ক্লাস শুরু করতে পারে না। অনার্সে ৩.০০ না থাকেল মাস্টার্স করতে পারবে না সেই নিয়ে উপাচার্য কত ধরনের বাহানা করেছেন তা সকলেই জানা। এখনো অহেতুক জরিমানা চাপিয়ে দেয়া হয় তাদের ওপর। বিকেলে ৫টার পর খেলার মাঠ খেলাধুলার জন্য নিষিদ্ধ করলেন। কেন? শিক্ষার্থীরা রোদে পুড়ে মাঠে, করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের বসার কমনরুম বা বৃক্ষ ছায়ায় ঢাকা ঘাসের মাঠ কই? যেটুকু কমনরুম আছে তাতে ১৫জন ছাত্রীও বসতে পারে না ঠিকঠাক। শিক্ষার্থীরা ঝুলে ঝুলে দপদপিয়া সেতু পার হয় বাসে। পর্যাপ্ত বাস কোথায়? কেন বাস সাড়া শহর ঘুরবে না? কেন গৌরনদী, ঝালকাঠি, পটুয়াখালীর মত জায়গা বা দূরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা থেকে বাস সার্ভিস থাকবে না। এতগুলো না হোক একটা তো হোক। শিক্ষার্থীরা টিউশনি করে, হাতের সম্বল ১০ টাকা বাঁচিয়ে, বাবার ঘামের টাকা হিসেব করে চলতে চায়। সকলে আমলার সন্তান হয়ে এখানে আসেনি। যুগ যুগ ধরে একটা মসজিদের কাজ চলে। খুপরি ঘরের মতো একটা মন্দির হয়! একাডেমিক ভবন-২ এর দরজা বছরের পর বছর রংহীন থাকে। লাইব্রেরিতে বইয়ের বরাদ্দ নেই। এসবই কি দাবি মেনে নেয়ার নজির! জনগণের টাকায় বানানো উপাচার্যের বাসভবন জনপ্রাণীহীন পড়ে থাকে। হুট করেই সেটা হয় যায় অফিস। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যখন ১০০ বা ২০০ শিক্ষক নিয়োগ হয় তখন আমাদের এখানে ইউজিসি কোনো পদই দেয় না। কেন দেয় না। আপনি ঢাকায় থাকেন। দায়িত্ব আপনার। কেউ পদ সেধে দেবে না একথা শিশুও জানে। বহু অনিয়মের কথা বলা যায়। শেষ হবার নয়। আপনি এখানকার মেয়রকে নিয়ে কটাক্ষ করেন, এমপিকে নিয়ে করেন, ডিসিকে নিয়ে করেন। কেন? সবাইকে খোঁচানোর দরকারটা কি? আপনি বিশ্ববিদ্যালয়কে ওয়াল্ড ক্লাস করতে চেয়েছেন। খুবই ভালো। আমরা সাধুবাদ জানাই। জানিয়েছি। শিক্ষকরা দুবছর পূর্তিতে গ্র্যান্ড সেলিব্রেশন করেছি! যদিও সেটাতে আমি ইচ্ছা করেই যাইনি। আমি ও আমরা বলেছিলাম- আমাদের এই দাবি উনি আগামী একবছরে পূরণ করুক আমরা আরও বড়ো করে তার তিনবছর পূর্তি উদযাপন করবো। কিন্তু এখন সবই ইতিহাস। একটা বিশ্ববিদ্যালয় মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করে। শিক্ষকরা বসার জায়গা পান না। গাদাগাদি করেন একরুমে ৪ থেকে ৫ জন। ক্লাস রুমের সংকট। নবীন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২টি ডিপার্টমেন্ট। কোথায় ল্যাব! কোথায় সেমিনার লাইব্রেরি! কোথায় বিভাগের জায়গা। শিক্ষকদের দেড়টায় একটা বাস ছিলো সেটা উপাচার্য বন্ধ করলেন। কারণ কেউ নাকি এরপর ক্লাস নেবে না দেড়টায় বাস থাকলে। অথচ এই বাসটা থাকলে বিকেলে এসেও অনেকে ক্লাস নিতে পারতেন। ক্লাসরুমের সংকটও কম হতো। কথা হলো এতো অনিয়মের পরও তিনি প্রায় ৪বছর বহাল তবিয়তে ছিলেন কিভাবে। তার জন্য উপাচার্য প্রশ্ন তুলতেই পারেন। হ্যাঁ আপনি প্রশংসা পাওয়ার যোগ্যই! আমরা শিক্ষকরা ছোট ছোট স্বার্থ আর হীন ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার করতে গিয়ে বড়ো স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছি। আপনি সুকৌশলে সেটা করেছেন তাও ঠিক আবার শিক্ষকরা নিজেরাও করেছে তাও ঠিক। (কেউ দ্বিমত করলে করতে পারেন। তবুও এখন শুভবুদ্ধির সময় এসেছে।) আপনি প্রায়ই বলতেন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডি ইউনিট তুলে দিতে চেয়েছিলাম। আমি ভিসির গাড়িতে পতাকা লাগানোর প্রথম পরামর্শ দিই। কিন্তু আপনি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কি করেছেন? পুরনো বিল্ডিং এর ফিতা কাটা ছাড়া! প্রকৃত সমস্যা হলো - যখন চাকুরিতে অবসরে যাওয়া অথবা প্রায় যাওয়া একজন ব্যক্তি অন্য নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি হয়ে আসেন তিনি তার দায়িত্বকে আর বহন করার সক্ষমতা রাখেন না। থাকে না কোনো দায়বদ্ধতা। শেষ বয়সে এসব দায়িত্বকে তার রামরাজত্ব মনেহয়। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকে না কোনো অভিজ্ঞ অধ্যাপক বা বয়সী শিক্ষক। থাকে না কোনো চাকরির নীতিমালা। এখানে ভিসি নিজেই নিয়ম। তিনি যদি বলেন- চাকরির বয়স অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ হবে তাও ঠিক, আবার তিনি যদি বলেন জন্ম সাল অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ হবে তাও ঠিক। কত হাস্যকর! আপনি আজ চেয়ারম্যান, কাল এসে দেখবেন চিঠি দিয়ে আপনাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এটা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়েছে। নতুনরা চাকুরির নিয়ম পার হতেই ব্যস্ত থাকেন। ফলে প্রতিবাদের ভাষাগুলো মিলিয়ে যায়। আর ধামাধরা লোকের দেখাতো প্রত্যেক সমাজে মিলবেই। সেই দিক থেকে শিক্ষার্থীদের পিছুটান কম। বাঁধা কম। বয়স কম বলে নীতির দেয়ালও অনেক উঁচু। ফলে আপনি যখন নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেন আর সেটা ফেক প্রমাণিত হয় তখন পরিহাসের পাত্র হতে হয়। বর্তমান প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশ নিয়ে গর্ব করে। আপনি তার অংশীদার না হয়েও যখন সেটা দাবি করেন তখন তার প্রতিবাদ হতে বাধ্য। বেশ কিছু শিক্ষক চাকুরি ছেড়ে গিয়েছেন অন্যখানে এখনো আপনি তাদের ছাড়পত্র দেন নাই। উল্টো যেখানে গেছে সেখানে চিঠি পাঠিয়েছেন। কেন? এটা কোন ধরনের নিয়ম? আপনার অপছন্দের লোক হলেই কেউ যদি তার নামে কোনো অভিযোগ করেন আপনি সাথে সাথে তাকে শোকজ ধরিয়ে দিয়েছেন। আর ধামাধারী লোকজন আপনাকে বাহবা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যতগুলো সামাজিক-সাংস্কৃতি সংগঠন রয়েছে তার প্রায় সবই আপনার ধামাধারী। এই কি মুক্ত জ্ঞানের নমুনা! আপনি শিক্ষার্থীদের কথা শুনতেন, সুবিধা অসুবিধায় খোঁজ নিতেন। যেগুলো দাবি সম্ভব মেনে নিতেন। ক্যাম্পাসটাকে বৃক্ষে-ছায়ায় ভালোবাসায় ভরিয়ে তুলতেন। আমরা সকলে আপনাকে আরও সহযোগিতা করতাম। শিক্ষার্থীরা করতো। কিন্তু আপনি শিক্ষার্থীদের রাজাকারের বাচ্চা বললেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সন্ত্রাসী বললেন। নোটিশ দিয়ে বেতন ভাতা বন্ধ করে দিলেন। শেষ সময় কতটুকুন সম্মান রইলো। শিক্ষার্থীরা ২৭ দিন ধরে অহিংস আন্দোলন করে আসছে। তারা সাধুবাদ পাওয়াযোগ্য। দীর্ঘদিন আন্দোলন করলে অনেক কিছুই ঠিক থাকে না। শিক্ষার্থীরা যাতে শেষ পর্যন্ত ধৈর্য বজায় রাখতে পারে সেই প্রত্যাশাই করবো। আচরণে, ভাষায়, ব্যবহারে শিক্ষার্থী হয়ে নমনীয়। সত্য দাবিতে হবে কঠোর। বরাবরই বরিশাল বিশ্বিবদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তার পরিচয় দিয়ে এসেছে। উপাচার্যের একগুয়েমি আর ধামাধারী শিক্ষকদের স্বার্থচিন্তা আপনাকে ডুবিয়েছে। প্রকৃত সমস্যাটা সেখানেই। এখনো অনেকেই ধামেধারী হয়েই আছেন। হয়তো জুজুর ভয়ে, নয়তো স্বার্থে। কিন্তু আমি মনেকরি অচলাবস্থা দ্রুতই কাটবে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী সদয় দৃষ্টি দেবেন। আর সমাধানের পথ হলো আপনি যা করেছেন করেছেন। এখন আমাদের রেহাই দিন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এখন বলতে চায়- আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে। আর স্মরণ করাতে চায়-

অনাচার করো যদি,
রাজা তবে ছাড়ো গদি
যারা তার ধামা-ধারী,
তাদেরও বিপদ ভারি ...

সঞ্জয় সরকার

লেখকঃ শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয় 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।