বঙ্গভঙ্গ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


ঢাকা
Published: 2019-07-01 03:14:15 BdST | Updated: 2019-12-11 20:48:31 BdST

এহসানুল হক জসীম
---------------------------------------------------

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শত বছর পূর্তি হতে বাকি আর মাত্র দুই বছর। একটি জনপদের সবচেয়ে প্রাচীন ও সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের দীর্ঘ পথপরিক্রমার সাথে জড়িয়ে থাকে ওখানকার জনগোষ্ঠীর সাফল্য-ব্যর্থতা এবং অর্জন-বিসর্জনের ইতিহাস। পেছনে ফেলে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ অতীতের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে নানা অধ্যায়। দীর্ঘ সংগ্রামের পথপরিক্রমায়, ইতিহাসের নানা ভাস্বর অধ্যায়ের রূপকার হয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আজ ৯৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ বিদ্যাপীঠ রচিয়াছে বহু সাফল্যগাঁথা। ১০০ বছরে পা রাখতে যাচ্ছে স্বর্ণালী অতীত নিয়ে।

আশাহীন-দিশাহীন জাতিকে মুক্তির নেশায় উজ্জীবিত করতে, পূর্ববাংলা তথা আজকের বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে শুধু আলোকিত অধ্যায়ই সৃষ্টি করেনি, এ বিশ্ববিদ্যালয় এ দেশের সব অংশে তৈরি করেছে অনেক কৃতিমান সন্তান। বঙ্গভঙ্গ রদের পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গবঙ্গের আগে এবং রদের পরবর্তী সময়ে পূর্ববাংলার বৃহত্তর জনগোষ্ঠী উচ্চশিক্ষার সার্বিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। পূর্ববাংলা ও আসাম অঞ্চলে কলেজ কম ছিল। উল্লেখ্য, আজকের সিলেট তখন আসাম প্রদেশের অন্তর্ভূক্ত ছিল। আসাম ও পূর্ব বংলা নিয়ে গঠিত হয়েছিল বঙ্গভঙ্গ।

বঙ্গভঙ্গ রদ-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে, পূর্ব বাংলার আশাহত, বিক্ষুব্ধ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সান্তনা দিতে ও বিক্ষোভের মাত্রা প্রশমিত করতে তৎকালীন বৃটিশ রাজ এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। বাহ্যত এমনটি হলেও এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সুচতুর বৃটিশদের উদ্দেশ্য খারাপ ছিল। কৃষক মুসলমানের সন্তানরা শিক্ষাদীক্ষাসহ সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে যাক, এমন মহৎ উদ্দেশ্য ছিল না। সহজ কথায় বৃটিশরা তাদের রাজত্ব দীর্ঘস্থায়ী করতে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। প্রথমত, বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে মুসলমানরা ছিল বিক্ষুব্ধ। এ বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে ক্ষুব্ধ রেখে শাসন দীর্ঘস্থায়ী করা যাবে না। এমন উপলব্ধি থেকে শাসনক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার কূটকৌশলের অংশ হিসেবে বৃটিশ সরকার এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। দ্বিতীয়ত, তারা চেয়েছিল কিছু ‘মহৎ বর্বর’ (Noble Savage) তৈরি করতে, যারা তাদের দালালি করবে। সাত সমূদ্র তেরো নদী পেরিয়ে এ ভারতবর্ষে শাসন দীর্ঘস্থায়ী করতে কিছু অগ্রসর শ্রেণীর দালাল প্রয়োজন ছিল। এমন মানসিকতা নিয়ে তারা ইতোপূর্বে কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বাই শহরে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী যোগ দেয়নি। আর ইংরেজরা এ বিষয়টি সামনে রেখেই ওই তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে। সেই ঘটনার পর পরই সে বছরই ভারতের বড় লাট লর্ড ক্যানিং ‘দ্য অ্যাক্ট অফ ইনকরপোরেশন’ পাশ করে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। শাসনকার্য পরিচালনার সুবিধার জন্য তারা চেয়েছিল ভারতীয়দের একাংশকে সভ্যতা ও ভব্যতার শিক্ষা দিয়ে ‘মহৎ বর্বরে’ রূপান্তর করতে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে।

যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল এ বিশ্ববিদ্যালয় ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গের ক্ষতিপূরণ, কিন্তু ক্ষতিপূরণ পেয়ে ছাত্ররা সন্তুষ্ট থাকবে, স্বাধীনতার আন্দোলনে যোগ দেবে না- এমন নিশ্চয়তা ছিল না। ইংরেজদের সে কূটকৌশল ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আপন গতিতে এগোতে থাকে। কেড়ে নেওয়া জাতির মাতৃভাষা রক্ষার জন্যই শুধু রক্ত ঝরায়নি, পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে এ জাতিকে স্বাধীনতার সোনালি সকালও উপহার দিয়েছে। এ কথা বললে অতিরঞ্জিত হবে না যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা না হলে ‘বাংলাদেশ’ নামের স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থান হয়তো পৃথিবীর মানচিত্রে হতো না। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের প্রায় সকলেই তথা বড় অংশটিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র ছিলেন।

বঙ্গভঙ্গ রদের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যোগসূত্র থাকলেও এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী কিন্তু আরো আগে ওঠে। ড. সুফিয়া আহমেদের মতে, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ১৯০৫ সাল থেকেই ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আসছিলেন। সৈয়দ আবুল মকসুদ তাঁর ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা’ বইতে লিখেন, “সর্বপ্রথম এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী তুলেন ‘মোহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্স’-এর অনারারি জয়েন্ট সেক্রেটারি ব্যারিস্টার সাহেবজাদা আফতাব আহমেদ খাঁ। ১৯০৬ সালের ২৭-২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত কনফারেন্সের বিশতম অধিবেশনে তিনি এই দাবি করেন। চার বছর পর ১৯১০ সালে তৎকালীন পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য বাবু অনঙ্গ মোহন সাহা ঢাকায় একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি হাইকোর্ট স্থাপনের দাবি তোলেন। ১৯১১ সালের ১৯ আগস্ট ‘পূর্ববঙ্গ-আসাম প্রাদেশিক মুসলমান সমিতি’ ও ‘প্রাদেশিক মুসলিম লীগ’ লেফটেন্যান্ট গভর্নর হেয়ারকে বিদায় ও নতুন লেফটেন্যান্ট গভর্নর সি বেইলিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানায়।”

ঢাকাকে রাজধানী করে পুর্ববাংলা ও আসাম নিয়ে ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ‘বঙ্গভঙ্গ’ প্রদেশটি কার্যকর হয়। শিক্ষাদীক্ষাসহ সব দিক থেকে পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের জন্য বঙ্গভঙ্গ ছিল এগিয়ে যাওয়ার সোপান। হিন্দু নেতাদের বড় অংশটি ছিল এর প্রচন্ড বিরোধী। তাদের বিরোধিতার মুখে শেষ পর্যন্ত ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর ‘বঙ্গভঙ্গ রদ’ ঘোষিত হয়। এতে মুসলিম সমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সালের ২৯ জানুয়ারি তিন দিনের সফরে ঢাকা আসেন। এ সময় নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হকসহ ১৯ জন মুসলিম নেতার একটি প্রতিনিধিদল ৩১ জানুয়ারি গভর্নর জেনারেলের সঙ্গে দেখা করেন। তারা আবার বঙ্গভঙ্গ চালুর দাবি জানান। না হয় ক্ষতিপূরণ স্বরূপ কমপক্ষে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। সাথে সাথে লর্ড হার্ডিঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন।

লর্ড হার্ডিঞ্জ কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা বিশাল বিতর্কের সৃষ্টি করে। হিন্দুরা বিরোধিতা করতে থাকেন; প্রচণ্ড বিরোধিতা। বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতার মতো এর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সভা-সমিতি ও পত্রপত্রিকায় জনমত গড়ে তোলার জন্যে বক্তৃতা-বিবৃতি প্রকাশ করতে থাকেন। সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেন, “ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারি ঘোষণা আসার পর প্রধানত উচ্চবর্ণের হিন্দু বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ ও উকিল শ্রেণি এর বিরোধিতা শুরু করেন।” অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ তার ‘বঙ্গভঙ্গ: তৎপরবর্তী সমাজ ও রাজনীতি’ বইয়ে লিখেন, “বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে আশাহত পূর্ববঙ্গবাসীর জন্য সান্ত¡না হিসেবে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যে প্রতিশ্রুতি ব্রিটিশ শাসকরা দেয়, সেটি হিন্দু ভদ্রলোকদের বিরোধিতার মুখে ১০ বছর বিলম্বিত হয়।”

লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা থেকে কলকাতায় ফিরলে ১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ড. রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল তার সঙ্গে দেখা করেন। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তীব্র বিরোধিতা করেন। এই প্রতিনিধিদলে ছিলেন রাজা পিয়ারী মোহন মুখার্জি, বাবু ভূপেন্দ্রনাথ বসু, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, অম্বিকা চরণ মজুমদার, কিশোরী মোহন চৌধুরী প্রমুখ। তারা গভর্নর জেনারেলের কাছে একটি স্মারকলিপি পেশ করেন, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে বিভিন্ন যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করা হয়। এছাড়া এই বিশ্ববিদ্যালয় আরো যেসব জাতীয় নেতা বিরোধিতা করেছিলেন তাদের মধ্যে রয়েছেন বিপিন চন্দ্র পাল, সুরেন্দ্রনাথ সমাজপতি, ব্যারিস্টার ব্যোমকেশ চক্রবর্তী প্রমুখ। ঢাকার হিন্দু নেতাদের মধ্যে ছিলেন প্রভাবশালী আইনজীবী ও সাবেক পৌরসভা চেয়ারম্যান আনন্দচন্দ্র রায়, বাবু ত্রৈলোক্যনাথ বসু প্রমুখ। কিছু কংগ্রেসপন্থী মুসলিম নেতাও বিরোধিতা করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ব্যারিস্টার আব্দুর রসুল, মাওলানা আকরম খাঁ, মৌলবি আবুল কাসেম, বিহারের মৌলবি লিয়াকত হোসেন। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দানকারী লর্ড হার্ডিঞ্জও ভেতরে ভেতরে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধী ছিলেন। লেফটেন্যান্ট গভর্নর সি বেইলি ১৯১২ সালের ৮ অক্টোবর লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় ও হাইকোর্ট স্থাপনের প্রস্তাব করেন। বেইলির সেই প্রস্তাবে সেদিন তিনি সাড়া দেননি। হিন্দুদের প্রবল বিরোধিতায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা সূচনা বিলম্বিত হলেও কোন কোন হিন্দু নেতার ভূমিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে ছিল। এদের মধ্যে ঢাকার বালিয়াটির জমিদার অন্যতম। জগন্নাথ হলের নামকরণ হয় তাঁর পিতা জগন্নাথ রায় চৌধুরীর নামে।

যাহোক, বিরোধিতা সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তদানীন্তন ভারত সরকার একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। সরকার ১৯১২ সালের ৪ এপ্রিল এক পত্রে বাংলার গভর্নরকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আর্থিক খতিয়ানসহ একটি পরিপূর্ণ প্রকল্প প্রণয়নের নির্দেশ দেন। এই পত্রে বাংলার মুসলিমদের স্বার্থ ও প্রয়োজন মেটানোর দিকে লক্ষ্য রাখার জন্য বিশেষ নির্দেশ ছিল। এ মর্মে একটি নির্দেশ ছিল, যাতে শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলমানদের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে এবং মুসলমান ছাত্ররা নিজেদের ধর্মীয় তাহজিব ও তমদ্দুন রক্ষায় সফল হয়। ভারত সরকারের নির্দেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলা সরকার ১৯১২ সালের ২৭ মে ১৩ সদস্যবিশিষ্ট ‘নাথান কমিটি’ গঠন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে ৪৫০ একর জমিবিশিষ্ট একটি মনোরম এলাকার সুপারিশসহ এ কমিটি প্রদত্ত রিপোর্ট ১৯১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ‘ভারত সচিব’ কর্তৃক চূড়ান্তভাবে গৃহিত হয়। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর ফলে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে প্রকল্পটি চূড়ান্তভাবে বস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ সময়ে ১৯১৫ সালে সংক্ষিপ্তভাবে হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ সম্পন্ন করার জন্য আবার প্রস্তাব করা হয়। ফলে ১৯১৬ সালে ভারত সরকার বাংলা সরকারের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি সর্বনিম্ন খরচের সংশোধিত পরিকল্পনা পেশ করার নির্দেশ দেয়।

প্রস্তাবিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিলম্বিত হতে থাকায় মুসলিম নেতাদের মনে সরকারের সদিচ্ছার ব্যাপারে সন্দেহ বাড়তে থাকে। নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী বিষয়টি ১৯১৭ সালের ৭ মার্চ রাজকীয় আইন পরিষদে উত্থাপন করেন। ২০ মার্চ সরকারের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অচিরেই প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে একটি প্রস্তাব পেশ করেন। রাজকীয় আইন পরিষদের সমাপনী অধিবেশনে ১৯১৭ সালের ২৩ এপ্রিল এ প্রকল্প বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়া হয়।

নাথান কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিশাল জমির প্রয়োজন দেখা দেয়। জমি অধিগ্রহণ করা যাচ্ছে না- এমন অজুহাতেও এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ বিলম্বিত হতে থাকে। এগিয়ে আসেন নবাব স্যার সলিমুল্লাহ। তিনি তাঁর জমিদারির বড় অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ছেড়ে দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি দান করেন। ১৯১৫ সালে নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বিলম্বের একটি কারণ হতে পারে। একদিকে তাঁর মৃত্যু এবং অন্যদিকে আর্থিক সংকট দেখা দিলে এগিয়ে আসেন নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী। তিনি টাঙ্গাইলের তাঁর জমিদারির বিরাট একটা অংশ বিক্রি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ড গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। আর শেরে বাংলা একে ফজলুল হক তাঁর সোচ্চার ভূমিকা অব্যাহত রাখতে থাকেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পটি বিজ্ঞ মতামত ও পরামর্শের জন্য ১৯১৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনে পাঠানো হয়। নাথান কমিটির রিপোর্টটি যথাযথভাবে পর্যালোচনার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে রিপোর্ট দেয়। তবে কিছু মতানৈক্য দেখা দেয়। এটা কি কেবল একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হবে, না ‘টিচিং’ এবং 'এফিলিয়েটেড' থাকবে? এই বিতর্কের সময়ে জনমত যাচাইয়ের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন একবার রাজশাহীতে আসে। তখন একটি মুসলিম প্রতিনিধিদল তাদের সঙ্গে দেখা করে দাবি করে যে, পূর্ববাংলার সব কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ‘এফিলিয়েটেড’ বা সংযুক্ত থাকবে। নাথান কমিটির সঙ্গে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন এ মত পোষণ করে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হবে একটি স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ভারত ও বাংলা সরকার এবং নাথান কমিটি এ মর্মে ঐকমত্য পোষণ করে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন তা সব জাতি ও শ্রেণীর ছাত্রদের জ্ঞান আহরণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। তবে মুসলমান ছাত্রদের জন্য একটি আরবি ও ইসলামি শিক্ষা বিভাগ খোলা হবে। অবশেষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতামত ও নাথান কমিটির সুপারিশের আলোকে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল’ ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ আইন আকারে পাস হয়। শত বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে একটি স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯২১ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু কওে এই বিশ্ববিদ্যালয়। ৬০ জন শিক্ষক, ৮৪৭ জন ছাত্র, তিনটি অনুষদ ও ১২টি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু। ৬০০ একর জমির ওপর প্রথম এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে জমির পরিমাণ ৩২০.৮২ একর। ১৯৪৭ সালে ঢাকা আবার রাজধানীর মর্যাদা পাবার পর হাইকোর্ট ও সচিবালয় স্থাপনের প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের জমির পরিমাণ কমে যায়।

বঙ্গবঙ্গের আগে এবং রদের পরবর্তী সময়ে পূর্ববাংলার বৃহত্তর জনগোষ্ঠী উচ্চশিক্ষার সার্বিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা পূর্ববঙ্গের পশ্চাৎপদ মুসলমান কৃষক সন্তানদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে। বর্তমান বাংলাদেশে প্রগতি, আধুনিকতা ও উন্নত সংস্কৃতি ও সভ্যতা নির্মাণে যত রকম প্রয়াস আমরা লক্ষ করি, তার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯২১ সালে এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় না হলে আমরা আমাদের বর্তমান অবস্থানে পৌঁছাতে পারতাম না। বঙ্গভঙ্গ না হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও হতো না।

প্রতিষ্ঠার প্রথম থেকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম-সুখ্যাতি অনেক উর্দ্ধে ছিল। আগের সেই গৌরব এখন নেই। অন্যতম প্রধান কারণ- গবেষণা কমে যাওয়া বা মানসম্মত গবেষণা না হওয়া। আরো নানা কারণ রয়েছে। বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গবেষণার উপর জ্বোর দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আরো বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করছেন। কিছু ভাল কাজে হাত দিয়েছেন। ইতিবাচক দিক। কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ঠ অন্য সকলের প্রচেষ্টায় এই বিশ্ববিদ্যালয় ফিরে পাক আগের সেই গৌরব ও খ্যাতি।