সাত কলেজের অধিভুক্তির সিদ্ধান্ত পুনঃবিবেচনা করুন


ঢাকা
Published: 2019-07-26 21:51:16 BdST | Updated: 2019-12-06 08:49:40 BdST

সাত কলেজের অধিভুক্তির সিদ্ধান্ত পুনঃবিবেচনা করুন
মতামত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সাত কলেজের অধিভুক্তি যে সম্পূর্ণ সরকারের সিদ্ধান্ত-এই বিষয়টি কিন্তু পরিষ্কার। তবে, সরকার একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে, সেটি যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক কিছু দিতে না পারে তাহলে সেই সিদ্ধান্ত বদল করা যাবে না-তা আমরা মানতে নারাজ। প্রসঙ্গত, উন্নত বিশ্বের কলেজগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকে-সেই উদাহরণ চলে আসে। কিন্তু উন্নত বিশ্বের শিক্ষা মডেল বাংলাদেশ কেন অন্য যে কোন দেশেই খাপেখাপ মিলে যাবে-তা আশা করা ভুল। একেক সমাজ, একেক দেশের রাজনৈতিক-আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো একেক রকম। তাই একই মডেল একেক প্রতিবেশে একেক প্রভাব ফেলবে তাই স্বাভাবিক।
সরকারের সাত কলেজকে ঢাবির অধীনে নেয়ার সীদ্ধান্তকে আমরা ভুল বলছি না। এটিকে বরং একটি পাইলট প্রোগ্রাম বলা যেতে পারে, যেটি সফল হলে দেশের অন্যান্য সরকারি কলেজগুলোকে তাদের নিকটবর্তী বিশ্ববিদ্যালয়ে আনা যেতে পারত। দেশের সকল কলেজের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান সমতা ও তাদের শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের মহান উদ্দেশ্য থেকেই নিশ্চয়ই সরকার সাত কলেজকে ঢাবির অধীনে আনার মাধ্যমে এর সুত্রপাত ঘটিয়েছিলেন। কিন্তু যখন শিক্ষার এই মডেল শিক্ষাঙ্গনে ইতিবাচক প্রভাব না ফেলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে তখন মনে হয় ভাববার প্রয়োজন আছে।
নেতিবাচক শব্দটি লেখার কারণ হল, যখন আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এবং সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা উভয়েই শ্রেনিকক্ষ ছেড়ে নিজেদের দাবি নিয়ে রাস্তায় নামে তখন এই অবস্থা শিক্ষাঙ্গনের জন্য শিক্ষার্থীদের জন্য অবশ্যই ইতিবাচক কোন বার্তা বহন করে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হলেও একে সরকারের আদেশ মেনে চলতে হয়। আর এটিই আমাদের সামাজিক বাস্তবতা। এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে সরকারের মহান উদ্দেশ্যকে স্বাগত জানিয়ে ঢাবি সাত কলেজকে নিজেদের অধীনে নিয়েছে। কিন্তু সাত কলেজকে নতুন করে সাজাতে এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে গিয়ে যখন উল্টো ঢাবি ও সাত কলেজ উভয় পাশ থেকে একটি স্থিত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তখন, আমাদের মনে হয় এবার একটি সমাধান ভাবা দরকার। কারণ সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা যখন ঢাবির অধীনে এসে উল্টো সেশনজটের শিকার হল তখন তাদের ক্ষোভ আমাদের বুঝতে হবে। একইভাবে ঢাবির শিক্ষার্থীরা যখন শ্রেণীকক্ষে তালা ঝুলিয়ে তাদের নিজেদের শিক্ষার স্বার্থে আন্দোলনে নেমেছে সেই বিষয়গুলোকেও আমাদের অনুধাবন করতে হবে।

আমি আবারো বলতে চাই যে, অতীতে নেয়া সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা যাবে না একথা কোথাও লেখা নেই। যখন ঢাবি ও সাত কলেজের উভয় পাশের শিক্ষার্থীদের দাবি এক হয়ে যায় তখন শিক্ষার পরিবেশ সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক করতে সাত কলেজের ঢাবির অধীনে রাখার সিদ্ধান্ত পুন:বিবেচনার দাবি রাখে। এই পুন:বিবেচনা যত বিলম্ব হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা আমাদের শিক্ষার্থীরা তত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর পাশাপাশি দেশের শিক্ষার্থীদের মাঝে দুটি পরস্পর বিরোধী যে সম্পর্কের সুত্রপাত ঘটেছে তারও আশু সমাধান দরকার। নতুবা দীর্ঘমেয়াদে সেই সম্পর্কের যে আরও অবনতি ঘটবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তাই সরকারের কাছে আকুল আবেদন, অতি দ্রুত আপনারা ঢাবির সাথে সাত কলেজের অধিভুক্তির সিদ্ধান্তকে পুন:বিবেচনা করুন। প্রয়োজনে আপনারা ঢাবি ও সাত কলেজের শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সাথে বসে তাদের দাবি দাওয়াগুলো শুনুন এবং এই বিষয়ের একটি সুন্দর সমাধান বের করুন।
পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছেও অনুরোধ আপনারাও আমাদের শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের ডাকুন তাদের দাবিগুলো শুনুন। তাদের দাবিগুলো যদি যৌক্তিক হয় তাহলে সে অনুযায়ী সাত কলেজের অধিভুক্তি বহাল, বাতিল অথবা বিকল্প কোন পথ খুঁজে বের করুন যাতে কেবল আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই শুধু নয়, বরং এর পাশাপাশি সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্যও মঙ্গল হয়। এক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার পাশাপাশি বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিক্ষাঙ্গনের শিক্ষা পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ১৯৭৩ এর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ (৫) এর প্রয়োগ করা সম্ভব । যেখানে স্পষ্টতই উল্লেখ আছে যে, যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট চায় তাহলে কোন কলেজ কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করতে পারবে এবং তা বাতিল করতে পারবে।
অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্তাস্থানীয় যারা আছেন তারা উভয় পাশের শিক্ষার্থীদের সুপারিশগুলো সরকারের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন এবং বর্তমান পরিস্থিতিকে সমাধানের দিকে যাওয়ার পথনির্দেশ করতে পারেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাত কলেজ উভয় শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসুক সেই কামনা করছি ।

লেখকঃ শান্তা তাওহিদা

শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়