সাত কলেজ ভাই ও তাদের পারুল বোন চম্পা


ঢাকা
Published: 2019-08-08 01:02:13 BdST | Updated: 2019-11-13 06:44:04 BdST

[পূর্বকথা: হিন্দুস্তানের বদমেজাজি বাদশাহ শাহরিয়ার তথাকথিত চরিত্রহীনা এক বেগমের পরকীয়ার যারপরনাই নারাজ হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, প্রতি রাতে তিনি এক যুবতীকে নিকাহ-এ-মুতা করবেন এবং ভোর হলেই এক রাতের সেই বেগমকে কতলের আদেশ দেবেন। শত শত যুবতী কন্যা বেঘোরে ইন্তেকাল ফরমালো কয়েক বৎসরে। তারপর একদিন ক্ষুরধার বুদ্ধিমতী উজিরকন্যা শেহেরজাদি স্বজাতির প্রতি করুণাপরবশ হয়ে বোন দিনারজাদির সঙ্গে সল্লা করে নিজে থেকেই বাদশা শাহরিয়ারকে নিকাহ করেন। জীবনের শেষ রাতে শেহেরজাদির আবদার রাখতে বাসরঘরে ডেকে আনা হয় দিনারজাদিকে। রাত গভীর হলে পূর্বপরিকল্পনামাফিক ছোটবোন দিনারজাদি একেকটি সওয়াল পুছতে থাকেন আর বড়বোন শেহেরজাদিও কালবিলম্ব না করে সেই সব সওয়ালের জওয়াব দিতে শুরু করেন। কিন্তু ভোরের আজান শোনা মাত্র জওয়াব বন্ধ করে নকশি লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েন দুই বোন। সওয়াল-জওয়াব শুনতে শুনতে বাদশাহ মজা পাচ্ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং-এর ব্যাপারে বাদশাহের বিশেষ আগ্রহও ছিল। সুতরাং পর পর চার দিন মৃত্যুদণ্ড বাতিল হয় শেহেরজাদির। আজ সেই সওয়াল-জওয়াবের পঞ্চম রাত্রি]

বছর কয়েক আগে ঢাকা নগরীর সাতটি কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তে নারাজ হয়ে তখনও তুলকালাম করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সম্প্রতি কয়েক দিনের ধর্মঘটও করেছে তারা উপাচার্যের অনুপস্থিতিতে। সাত কলেজ ভাইয়ের সঙ্গে তাদের পারুল বোন চম্পা ওরফে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্কের এই টানাপোড়েনটা একটু বুঝিয়ে বলবে কি, প্রিয় দিদি শেহেরজাদি?

প্রিয় বোন দিনারজাদি, শিশির ভট্টাচার্য্য রচিত ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস: আদিপর্ব’ পুস্তকে পড়েছি, বিশ্ববিদ্যালয় যখন থেকে শুরু, অর্থাৎ সেই মধ্যযুগ থেকে কলেজ এবং হল বা ছাত্রাবাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। অতীতে হল ও কলেজের কাজ ছিল পড়ানো আর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ ছিল পরীক্ষা নেওয়া। ব্রিটিশ আমলে স্কুল-কলেজের সব পরীক্ষাই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতো। শিক্ষাবোর্ড তো অনেক পরের ব্যাপার। এখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, একেকটি হলে ভর্তি হয়, হলের শিক্ষার্থী হিসেবে পরীক্ষা দেয় এবং হলের শিক্ষার্থী হিসেবেই সনদ পায়।

হাজার বছরের এই ঐতিহ্যকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে জাতীয়তাবাদী আমলে এক ‘জাতীয়’ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এ এক অদ্ভূত বিশ্ববিদ্যালয় যার কাজ শুধু কলেজগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা। জানি না কেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার বছরের ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান দেখাতে, নাকি শ্রেফ ‘জাতীয়তাবাদী’ উদ্যোগ বলে, নাকি আমরা কেউ জানি না এমন অন্য কোনো কারণে, শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশের সব কলেজকে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছত্রছায়ায় নিয়ে আসতে চায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাত কলেজের অন্তর্ভূক্তি দিয়ে এই প্রক্রিয়ার পরীক্ষামূলক সূচনা হয়েছে মাত্র।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারের এই সিদ্ধান্তে খুশি নয়, কারণ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শুদ্র শিক্ষার্থীরা একই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোমবাত্তিমার্কা লোগোযুক্ত সার্টিফিকেট পাবে, ঢাবি ব্রাহ্মণদের সঙ্গে একই বাসে চড়বে– এও কি কখনও হতে পারে? এটা শুধু মর্যাদার প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ধান্ধাও জড়িত। বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক কলেজের পরীক্ষার প্রশ্ন করতে চান, কলেজের পরীক্ষার খাতা কাটতে চান, কলেজে শিক্ষক নিয়োগ দিতে চান, কলেজের বিভিন্ন কমিটিতে, মিটিংয়ে শরিক হতে চান। কেন চান? কারণ এই সব কিছুতে কমবেশি টু পাইস আছে।

কোথাকার ছাত্র?– এই প্রশ্নের উপর টিউশনির রেট নির্ভর করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকা ছাত্রের যে রেট, ঢাকা কলেজের ছাত্রের নাকি সেই রেট নয়। রেট বাড়াতে অনেকে মিথ্যাও বলে, যার প্রতিফলন হয় স্কুলের সামনে ফুটপাথে নিনজা ভাবীদের নাই দুনিয়ার বাহুল্য প্যাঁচালে: ‘জানেন ভাবী, আমার বাচ্চার টিচার খুব ভালো ছাত্র! বুয়েটে ইংলিশে অনার্স পড়ে, কার্জন হলে থাকে!’

২১ জুলাই দুপুরের দিকে ধর্মঘটী ছাত্রেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বললো: ‘বেরিয়ে যান আপনারা। ইনস্টিউিটটের সব গেটে তালা লাগাবো!’ তালা লাগিয়ে, সিলগালা মেরে, চাবি নাকি ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয় দূরে কোথাও। পরে ঝামেলা মিটে গেলে সেই সব তালা হাতুড়ি দিয়ে ভাঙা হয়। অপেক্ষাকৃত ভদ্রগোছের এক ধর্মঘটী পুরো প্রক্রিয়াটা ব্যাখ্যা করলো আমাকে দয়াপরবশ হয়ে। প্রতি হরতালে অনেকগুলো তালা এভাবে নষ্ট হয়। ‘লাথি মার, ভাঙরে তালা, যতসব বন্দীশালা, আগুন জ্বালা, আগুন জ্বালা।’ বাংলাদেশের জাতীয় কবিইতো লিখে গেছেন।

শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করবে, করতেই পারে, কিন্তু তাই বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংক কেন বন্ধ হবে? অ্যামবুলেন্স কেন ঢুকতে পারবে না বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়? শিক্ষকদের কেন তাদের কক্ষে আটকে থাকতে হবে? সবাই ভেবেছিল, ডাকসু নির্বাচনের পর ছাত্রদের ভালোমন্দ দেখবে ডাকসু। এখন দেখা যাচ্ছে, বাঘের উপর যেমন ‘টাঘ’ থাকে, তেমনি ডাকসুর উপরেও আছে একাধিক ‘টাকসু’। বাংলাদেশে shoe-এর অভাব নেই, কারণ ‘অমুকের চামড়া তুলে নেবো আমরা’ এবং তার উপর সামনে কোরবানি। ক্যাম্পাস ছাত্রলীগ ২১ তারিখ দুপুরে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোগান দিয়ে অল্পবিস্তর মিছিল করেছিল, কিন্তু ভাব দেখে মনে হচ্ছিল, তারাও তলে তলে কলেজ অধিভুক্তি-বিরোধী আন্দোলনে শরিক।

২০১৯ সালের ২১-২৩ জুলাই, রবি, সোম, মঙ্গল ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাঁপানো’– এই তিন দিনে কত লক্ষ শিক্ষাঘণ্টা ও কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী-শিক্ষকের? কারা ছিল এর পেছনে? কীভাবে, কার অঙ্গুলিহেলনে প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের আনকোরা শিক্ষার্থীরা শিক্ষক-কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করার এবং তাঁদের সঙ্গে বেয়াদবি করার সাহস পেয়েছিল? কারও না কারও অর্থায়ন ছাড়া এই আন্দোলন হতেই পারে না। ছাগল নাচে খুঁটির জোরে। কারা সেই খুঁটি হয়ে গত চার দিনের আন্দোলন অর্থায়ন করেছে, আন্দোলনকারীদের উসকে দিয়েছে? কমপক্ষে ১০০ তালা কেনার (প্রতিটি ৫০০ টাকা করে) ৫০,০০০ টাকা কার পকেট থেকে এসেছে? কমপক্ষে ২০০ ছাত্রের তিন দিনের দুপুরের বিরিয়ানির প্যাকেট কেনার (প্রতি প্যাকেট ২০০ টাকা করে প্রতিদিন) ৪০,০০০ টাকা কে দিয়েছে? আর আন্দোলনকারীদের পকেট খরচ? যে ছাত্রসংগঠন এই আন্দোলনে বাধা দিতে পারতো, যারা উপাচার্যের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে তালা ভেঙেছে, কারা দিয়েছে তাদের নিষ্ক্রিয় থাকার বখশিস? ছাগলের দড়ি ধরে টান দিলেই খুঁটির খবর বেরিয়ে আসবে।

যদি গুন্ডোমিটার বলে কোনো যন্ত্র থাকতো, তবে ধর্মঘটীদের জিহ্বা কিংবা বগলের তলায় এই যন্ত্র দিলে দেখা যেতো পারদ লাফিয়ে উপরে উঠে গেছে। কেন এখনও এই ছাত্রদের রাশটিকেট করা হয়নি? যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের গুণ্ডামিকে প্রশ্রয় দেয়, মানুষ হওয়ার বদলে তাদের দুর্বৃত্তে পরিণত হতে আশকারা দেয়, সেই বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিং-এ ওঠার আশা করা ঠিক নয়। এই সঙ্কটকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা শিক্ষক সমিতির কোনো বক্তব্য ছিল না। এই দুই প্রতিষ্ঠান অথর্ব হয়ে পড়ছে দিনকে দিন, কারণ, বিশেষ ব্যক্তির হাতে পুঞ্জিভূত হয়েছে অনেক ক্ষমতা। ক্ষমতাও গোবরের মতো, ক্ষেতে ছড়িয়ে দিয়ে ফসল হয়, এক জায়গায় জমে থাকলে দুর্গন্ধ ছড়ায়।

সম্ভাব্য ভিসি পদপ্রার্থীরা কি নিজেদের ক্ষমতা দেখাতে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করেছিলেন? নাকি অন্যদের ব্যর্থতা ছাপিয়ে নিজের ক্ষমতা দেখানোর জন্যে সুদূর শাকদ্বীপ থেকে নিজেই কলকাঠি নেড়েছিলেন অধ্যাপক ম্যান? ষড়যন্ত্রতত্ত্বে বিশ্বাস করলে সবই সম্ভব। ‘না না, এই আন্দোলন স্বতস্ফূর্ত!’ চিৎকার করে উপাচার্য-ভবনের সামনে এই দাবিই করতে শুনেছি এক ভুঁইফোঁর ছাত্রনেতাকে, সোমবার কি মঙ্গলবার সকালে। এমন চিৎকার করছিল সেই মোটু নেতাজি যে ভুলেই যাচ্ছিল, মুখের সামনে মাইক্রোফোন আছে। আন্দোলন যদি স্বতস্ফূর্তই হবে, তবে উপাচার্য ম্যানের অনুপস্থিতিতেই বা কেন তা সংঘঠিত হলো, আবার ম্যানের পুনরাগমনের সঙ্গেসঙ্গেই বা কেন তা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল? প্রতিপক্ষের বোকা খেলোয়াররা ভেবেছিল, আন্দোলন তুঙ্গে উঠলে, সৈন্য দিয়ে হুপুস করে রাজা ম্যানকে খেয়ে নেবে। বরিশালের লোক আমড়া খায়, আমড়া কাঠ দিয়ে ঢেঁকি বানায় না। সব ‘বোঝছো মনু! হ তোমাগো কইতাছি, অইধ্যাফিকা ড্যাকা, অইধ্যাফক ম্যাড, অইধ্যাফক জ্যাজ, অইধ্যাফক উড… ফুঃ! তোমরা কেউ কিস্সু না, ঢাবিতে আমি এক জনই সুফারম্যান, আমিই ‘বাফের ব্যাডা’ সাদ্দাম!’ অধ্যাপক ডিকির সমর্থকেরাও নাকি এখন অধ্যাপক ম্যানকেই সমর্থন করছেন। ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু!’ মাওবাদী নীতি। খাওবাদীও বটে।

সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত করার প্রকল্প কিংবা আইডিয়াটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের নয়, বাংলাদেশ সরকারের তথা খোদ শেখ হাসিনার। ছাত্রলীগ, ডাকসুও সরকারের ইঙ্গিতেই চলে। যারাই এই আন্দোলন করে থাকুক, তারা যে প্রকৃতপক্ষে সরকারবিরোধী, শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনই করছেন- সে খেয়াল কি তেনাদের আছে? তাঁরা কি খবর রাখেন, লন্ডনে প্রধানমন্ত্রীর চোখে সফল অস্ত্রোপচার হয়েছে? তিনি এখন সাদাকে সাদা, কালোকে কালোই দেখবেন। জানি না, তিনি কিংবা তাঁর উপদেষ্টা-মন্ত্রীরা জানেন কিনা, নোংরা রাজনীতির খপ্পর থেকে তাঁর প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যতদিন না মুক্ত হবে, ততদিন এর র‌্যাংকিংয়ের আশা না করাই ভালো।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যযুগীয় প্যারিস মডেল অনুসরণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আলোচনার উজানে বলেছিলাম, শিক্ষার্থীরা এখানে হলে ভর্তি হয়, হলের ছাত্র থাকে, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পরীক্ষা নেয়। মধ্যযুগে কলেজ আর হল সমার্থক ছিল। শিক্ষার্থীরা কলেজে ভর্তি হতো, কলেজেই লেখাপড়া করতো। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পরীক্ষা নিতো এবং ডিগ্রি দিতো। সাত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত হবার অর্থ এই নয় যে বিশ্ববিদ্যালয়কে ঐসব কলেজের শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও পরীক্ষাসংক্রান্ত সব কাজের ভার নিতে হবে। কলেজই সব কিছু করতে পারে আগের মতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ও তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সনদ দেবে, যেমনটা আগে হতো। সনদে অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ও কলেজের নাম লেখা থাকবে।

‘কলেজগুলোতে লেখাপড়া কিসসু হয় না!’ মনে করেন অনেকে। তাই যদি সত্য হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ডেপুটেশনে কলেজে পড়াতে পাঠালে সমস্যা কী? যাও, ছয় মাস গিয়ে পড়িয়ে আসো তিতুমীর কিংবা ঢাকা কলেজে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতনভাতা একই থাকবে, বাসাও ছাড়তে হবে না, ঢাকার বাইরেও যেতে হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকেরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বুয়াগিরি করেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলেও করেন অনেকে, স্বনামধন্য অধ্যপকেরাই এক সময় করেছেন। অনেকে নাকি শুক্রবারে মসজিদে খুৎবাও পাঠ করেন। তাহলে সরকারি কলেজে পড়াতে সমস্যা কী? সেক্ষেত্রে কলেজগুলোর পড়ানোর মান উন্নত হবে। কলেজের শিক্ষার্থীরাও এই ভেবে আশ্বস্ত হবে যে তারা বিশ্ববিদ্যালয় মানের শিক্ষা পাচ্ছে, যদিও প্রকৃতপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজেরই কোনো ‘মান’ (উভয়ার্থে) নেই।

প্রিয় দিনারজাদি, শোনো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নীল, সাদা, গোলাপী– এই কয়েকটি নামসর্বস্ব দল আছে। নামসর্বস্ব বলছি, কারণ এদের না আছে কোনো গঠনতন্ত্র, না আছে নিবন্ধন, না আছে কোনো অফিস। কোনো সদস্য তালিকা নেই এদের, যদিও কে কোন দলের সমর্থক, জানে সবাই। সাদা দল কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রচার করার সময় ব্যবহার করে সাদা কাগজ, নীল দল নীল কাগজ আর গোলাপী দল গোলাপী কাগজ। নামের সার্থকতা ঐ কাগজের রঙেই সীমাবদ্ধ। এই অদ্ভূত হাওয়াই মিঠাই সংগঠনগুলো আছে, কিন্তু নেই। নেই আবার আছেও। এরা (লালনের ভাষায়) ‘নড়ে চড়ে হাতের কাছে, খুঁজলে জনমভর মিলে না। কথা কয়রে দেখা দেয় না!’ ।

এই তিন দল সময়ে সময়ে দলীয় সভা করে, বিশেষ করে নিজেদের লাইনের দল ক্ষমতায় ধাকলে তাদের তৎপরতা বেড়ে যায়। বি.এন.পি. ক্ষমতায় থাকলে সাদা দল অনেক লম্ফঝম্ফ করে, কিন্তু ক্ষমতায় না থাকলে সাদা দল এমন চুপসে যায় যে বোঝাই যায় না সাদা দল বলে কিছু আছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাগল নাচে খুঁটির জোরে। সরকারের খুঁটি ঠিক থাকলেই শুধু ছাগলগুলো নাচে। নীল দলও তথৈবচ। এই সত্যটা স্বীকার করার সৎসাহস এদের নেই যে ‘ভাইসকল, আমরা মূলতঃ সরকারি দলের ধামাধরা!’ আওয়ামী লীগ বা বিএনপি যখন রাষ্ট্রক্ষমতা হারায় তখন এই শিক্ষক-নেতাদের একেকজনকে মুখ পুঁছে বলতে শুনেছি: ‘আমিতো নীল কিংবা সাদা দল করি না!’ পরে তাদের মধ্যে অনেকে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও হয়েছেন। সরকার সব ভুলে যায়, অথবা সরকার নিরুপায়। ঠক বাছতে গাঁ উজার করে লাভ কী!

উপাচার্য পদে কোন তিনজনের নাম প্রস্তাব করা হবে– এই প্রশ্নে নীল দল সম্প্রতি এক নির্বাচনের আয়োজন করেছিল। অধ্যাপক ম্যাড প্রথম, অধ্যাপক ম্যান দ্বিতীয় এবং অধ্যাপক উড তৃতীয় স্থান পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু সিনেট অধিবেশনে নাম প্রস্তাব করার সময় দেখা গেল, তালিকায় সামান্য (কিংবা অসামান্য) রদবদল হয়েছে। কী এক যাদুবলে অধ্যাপক ম্যান হয়ে গেছেন প্রথম এবং অধ্যাপক ম্যাড হয়ে গেছেন দ্বিতীয়। অধ্যাপক ডিকি নির্বাচক সিনেটরদের তালিকায় অনেকগুলো নাম বদলে দিয়েছিলেন। অধ্যাপক ম্যান এককাঠি সরেস। তিনি নির্বাচিত প্রার্থীদের ক্রম বদলে দিলেন। অধ্যাপক ম্যাড ও অধ্যাপক জ্যাজ সিনেট অধিবেশনেই প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অধ্যাপক ম্যান অনতিবিলম্বে জাতীয় সঙ্গীত বাজিয়ে তাদের দুজনকেই অ-বাক করে দেন। জাতীয় সঙ্গীতের এমন মোক্ষম ব্যবহার জাতিরাষ্ট্রের গত কয়েক শ বছরের ইতিহাসে আর দেখা যায়নি। অধ্যাপক ম্যান এটা করতেই পারেন, কারণ যে তথাকথিত দলের আইনী কোনো অস্তিত্বই নেই, সেই দলের সিদ্ধান্ত মানতে অধ্যাপক ম্যান বাধ্য নন। নীল দল বলে আদৌ যদি কিছু থাকতো, তবে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেওয়া হতো।

অধ্যাপক ম্যানের আচরণে ক্ষতিগ্রস্ত যাঁরা কিংবা যাঁরা বছর দুই আগে আদালতে গিয়ে অধ্যাপক ডিকিকে ঠ্যাং ধরে টেনে নামিয়েছিলেন, সেই মজলিশে শুরার সদস্যরা বলছেন, এটা গণতান্ত্রিক রীতির বরখেলাপ। গণতন্ত্র না ছাই! তাদের অখুশির কারণ মূলত ফস্কায়মান ক্ষমতা। উপাচার্য হবার, নিদেনপক্ষে ক্ষমতার হালুয়ারুটির ভাগ পাবার গোপন খায়েশ প্রত্যেকের মনে। অনেক অধ্যাপক অবসর নেবার পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে নাক গলাতে থাকেন, ভূতের গল্পে অতৃপ্ত অশরীরী আত্মা যেমন নিজের বাড়িঘরের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। পুরোটাই ক্ষমতার খেলা, পাওয়ার গেম। শিক্ষকদের Power এবং কলাটা-মুলোটা পাওয়ার সমস্যাই যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাপ্রবাহের অন্যতম নিয়ামক, তখন লেখাপড়া, গবেষণা, র‌্যাংকিং– এসব ফালতু প্যাঁচাল পেড়ে কী লাভ! শিক্ষকেরা কে ‘কোন দল’ করেন তার চেয়ে তাদের আভ্যন্তরীণ কোন্দলই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে বৃহত্তর ভূমিকা রাখে। সরকারও কি পিছন থেকে কমবেশি কলকাঠি নাড়েন না? সরকারের সম্মতিতেই প্রাক্তন উপাচার্য আট বছর এবং বর্তমান উপাচার্য ইতিমধ্যে দুই বছর কাটিয়ে দিয়েছেন ক্ষমতার মসনদে। সরকারের সবুজ সঙ্কেত আসাতেই হয়তো তালিকায় নামের রদবদল হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ছাত্র– উভয়ের নোংরামিই দেখার মতো। হলগুলোর চারপাশে এমন নোংরা (এবং এই নোংরাই নাকি অ্যাডিস মশার জন্মস্থান) কী করে থাকে এই দুর্যোগপূর্ণ সময়ে? জিগ্যেস করেছিলাম এক হাউজ টিউটরকে। উনি জবাব দিলেন, শিক্ষার্থীদের কারণেই হলের চারপাশ পরিষ্কার রাখা যায় না। হেন নোংরা নেই যা তারা উপরের জানালা দিয়ে নিচে ফেলে না। কথা সত্য। বিজয় একাত্তর হলের পাশের কড়ই গাছের বিভিন্ন ডালে একবার একটা লেপ, কিছু অন্তর্বাস ঝুলতে দেখেছিলাম বটে। ‘ছাত্রদের যখন বলি’, বলেছিলেন সেই হাউজ টিউটর, ‘বাবারা জানালা দিয়ে নোংরা নিচে ফেলো না, নোংরা ফেলার নির্দিষ্ট ঝুড়িতে ফেলো!’, তারা আমার কথাকে এতটুকুও পাত্তা দেয় না। একবারের বেশি বললে, রাগ করে। নিজের সম্মান রক্ষার্থে অগত্যা চুপ করে থাকি।’ বললে বিপদ। শিক্ষকেরা কাগজে-কলমে শিক্ষাগুরু, কিন্তু কাজে-কর্মে লঘুরও অধম। সুতরাং লগুড়াঘাতের আশঙ্কাতো আছেই।

যারা তুলনামূলক অসভ্য তারা মুখের কফটা সাধারণতঃ জানালা দিয়ে ‘খাআআক থুঃ’ ছুঁড়ে মারে নিচে। ঠিকমতো টার্গেট করতে পারলে নিচের রাস্তা দিয়ে যাওয়া কোনো শিক্ষকের মাথায় টিকে থাকা কলপ লাগানো শেষ কয়েক গাছি চুলে সাদাটে, থক্থকে জেল লাগিয়ে দিতে পারা অসম্ভব নয়। যারা তুলনামূলকভাবে সভ্য, তারা নাকি টিস্যু পেপারে কফ সংগ্রহ করে টেবিল বা চৌকির তলায় জমিয়ে রাখে। অ্যাডিস মশা শুনেছি পানিতে বংশবৃদ্ধি করে। পানির অভাবে কফ কিংবা থুথু দিয়েও কি সে কাজ চালাতে পারে না। বাংলাদেশে মানুষের পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম বহুদিন যাবৎ বন্ধ। মানুষ যদি বংশবৃদ্ধির কোনো সুযোগ না ছাড়ে, মশারাই বা ছাড়বে কেন? মশা বলে কি মানুষ না! যত নোংরা, তত মশা, তত ডেঙ্গু। হলগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপের কারণ নোংরা ছাড়া আর কী হতে পারে?

প্রিয় দিনারজাদি। একটা গল্প দিয়েই শেষ করি প্রতি রাতের মতো। হায়াত-মউত যদিও আল্লাহর হাতে, তবুও এত যে তিক্ত সত্য বলছি তোমাদের, বাদশার কখন কী মর্জি হয়, গলাটা যদি কেটেই ফেলে সামনের কোনো এক সকালে, তার আগে বরং পেটের মধ্যে আজীবন জমে থাকা কথা আর গল্পগুলো হলকুম দিয়ে উগরে দিই। এমনিতেও আগে পরে আমি থাকবো না, থাকবে না তুমি কিংবা বাদশাও, কথাগুলো থাকলেও থাকতে পারে। না থাকলেই বা ক্ষতি কী! সেইতো থোর-বড়ি-খাড়া-খাড়া-বড়ি-থোর। যেমন ধরো, সক্রেটিসের শিষ্য আফলাতুনের আমল থেকে মানুষের আচরণ কি বিন্দুমাত্র পাল্টেছে? মধ্যযুগীয় কিংবা আধুনিক সমস্যা বলে কিছু নেই, মধ্যযুগীয় কিংবা আধুনিক সমাধান আছে বটে।

‘আহার দেখো, বাহার দেখো, জিন্নাহ সাবের বাড়ি দেখো, লালবাগের কেল্লা দেখো…’ বলার পর যখন দেখা গেল, নতুন কিছু দর্শক এসে জড়ো হয়েছে অনতিদূরে, তখন পুরনোদের ভাগানোর জন্যে বায়োাস্কোপ-ওয়ালা বলে উঠলো: ‘কত সুন্দর দেখা গেল, পোন্দের কাপড় উইঠ্যা গেল!’ শুনে পুরনো দর্শকেরা যেই নিজ নিজ পশ্চাদ্দেশের দিকে তাকাতে গেল, সেই ফাঁকে নতুন মাথাগুলো ফিট হয়ে গেল বায়োস্কোপের বাক্সে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা রকম বায়োস্কোপ দেখছে সবাই নির্মোহ, চুপচাপ। প্রতিটি ঘটনায় শিক্ষক-নেতাদের কমবেশি ধান্ধা হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্নাঙ্গের অঙ্গবাস খুলে গিয়ে হাড্ডিসার নিতম্ব দৃশ্যমান হচ্ছে দিনকে দিন। ‘মনে রাখবা! কাপড় যখন একবার খুলেছি, কাপড় আবারও খুলবো। এই বিশ্ববিদ্যালয়কে উলঙ্গ করে ছাড়বো! কোনো উলঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়কে র‌্যাংকিংয়ে আনবে, বিশ্ব এখনও অতটা বেহায়া হয়নি, বিশেষতঃ বিশ্ববেহায়াই যখন কদিন আগে ‘পটল পিক’ করেছে।

[বাদশা ও দিনারজাদি অট্টহাসি হাসতে গিয়েও ঢোক গিলে নিলেন হাসিটা। মুখটা তিতা হয়ে গেছে, মনটাও ভরে আছে বিষাদে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। ইতিমধ্যে পূবের আকাশে সুবেহ-সাদিকের চিহ্ন ফুটে উঠলো এবং ভোরের আযানও শোনা গেল: ‘আস সলাতু খাইরুম মিনান নাউম’ অর্থাৎ ‘নিদ্রাপেক্ষা নামাজ উত্তম।’ আগের চার রাত্রির মতোই কথা থামিয়ে দিলেন শেহেরজাদি। ফজরের নামাজ পড়ে নকশি-লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন দুই বোন। বাদশা শাহরিয়ারও বেরিয়ে গেলেন ফজরের নামাজ পড়তে এবং অতঃপর রাজকার্যে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন র‌্যাংকিংয়ে আসে না– এ প্রশ্নের উত্তরে আরও অনেক কিছু বলার আছে শেহেরজাদির। বাদশাহেরও এ প্রসঙ্গে জানার আগ্রহ আছে বলে শেহেরজাদির মৃত্যুদণ্ড ষষ্ঠ দিন পর্যন্ত স্থগিত হলো।]

শিশির ভট্টাচার্য্য
অধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

The opinion was first published at bdnews24.com