নদী বাঁচলে বাঁচবো আমরা!


ঢাকা
Published: 2019-08-08 15:19:44 BdST | Updated: 2019-08-25 13:46:57 BdST

পৃথিবীর বিখ্যাত ব-দ্বীপ গুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম, যার পুরো ভিত্তি জুড়ে রয়েছে অসংখ্য নদী, ৭০০ নদী এবং উপনদীর সমন্বয়ে বাংলাদেশের রয়েছে সর্ববৃহৎ জলাশয় ভিত্তিক নেটওয়ার্ক। এই নদীসমূহ জাতির ভূমিবৃত্তি ও মানুষের জীবন উভয়ই চিহ্নিত করে, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে দেশটি তার জল সম্পদ হারাচ্ছে। দেশের কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা শহর বুড়িগঙ্গা নদী, তুরাগ নদী, ধলেশ্বরী নদী এবং শীতলক্ষ্যা নদী দ্বারা আবদ্ধ, কিন্তু এই নদীগুলো মানব ও শিল্প বর্জ্য দিয়ে ক্রমাগত দূষিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, এই চারটি প্রধান নদী ৭০০০ শিল্প ইউনিট থেকে প্রতিদিন ১.৫ মিলিয়ন ঘনমিটার বর্জ্য জল এবং অন্যান্য উৎস থেকে আরও ০.৫ মিলিয়ন ঘনমিটার বর্জ্যে দূষিত হয়। এই দূষণের অন্তর্নিহিত কারণে নদীর অবাধ পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, নদীপথে যাতায়াতকারী যাত্রীদের ফেলে দেওয়া বর্জ্যের ফলে নদীর পানি মানুষ ও প্রানীদের ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে ওঠে। বুড়িগঙ্গা নদীর ক্ষেত্রে, যা "ওল্ড গঙ্গা" হিসাবে বিখ্যাত এবং দর্শনীয় দৃশ্য এবং নদী ভ্রমণের জন্য জনপ্রিয় তা এখন নদীর তীরের কয়েক ডজন ট্যানারির বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। সরকার নদী রক্ষার উদ্দ্যশ্যে এই ট্যানারিগুলি স্থানান্তরিত করার জন্য ২০১৭ সালে আদেশও পাস করেছে, তবে পরিবেশবাদীদের মতে ট্যানারি মালিকরা তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে বা লোককে ঘুষ দিয়ে এই জাতীয় নির্দেশকে অমান্য করে ঠিকই নদীর তীরে তাদের ট্যানারি পরিচালনা করছে। এদিকে, বিশ্বব্যাংকের পরিবেশ ও জল ব্যবস্থাপনার বিশেষজ্ঞ খাজা মিনাতুল্লাহ বুড়িগঙ্গা নদীকে মৃত নদী ঘোষণা এবং সেপটিক ট্যাঙ্কের সাথে তুলনা করেছেন। অন্যদিকে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান ডঃ সামসুদ্দোহা খন্দকার উল্লেখ করেছেন যে, "ঢাকা ওয়াসার ৭০% নর্দমা বর্জ্য সরাসরি নদীতে প্রবেশ করছে এবং বসিলা, শ্যামপুর, শোলমচি এবং কামরাঙ্গীরচর এলাকায় দূষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।"

তবে, এই নদীগুলোকে দূষণকারীর হাত থেকে রক্ষার জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৫ সালে একটি আইন প্রণীত করে যেখানে সকল শিল্প প্রতিষ্ঠানকে নদীর পানি দূষণ থেকে বাঁচাতে Effluent Treatment Plants ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে। বাংলাদেশ হাইকোর্ট কর্তৃক আরেকটি ঐতিহাসিক বিচারকার্য সম্পাদিত হয় ৩ ফেব্রুয়ারী, যেখানে নদীগুলিকে আইনী সত্তা হিসাবে ঘোষণা করা হয় এবং জলাশয়, খাল, বিল, উপকূল, পাহাড় এবং বনের অধিকার রক্ষায় তাদের অভিভাবক হিসাবে কাজ করার জন্য জাতীয় নদী সংরক্ষণ কমিশন (NRPC)-কে আইনী অভিভাবক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া। প্রকৃতপক্ষে, বিশ্বের যে কোনও আদালত কর্তৃক নদী বা অন্য কোনও প্রাকৃতিক সত্তার অধিকার রক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনাসহ এটিই সবচেয়ে বিস্তৃত রায়।

আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বুড়িগঙ্গার মৃত্যুর মূল কারন ব্যাখ্যা করতে পারেননি কর্তৃপক্ষ। বুড়িগঙ্গা সহ আরো কিছু নদী সমূহ কে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে ধারাবাহিক সরকার। বাংলাদেশের সংবিধান ধারা ১৮(ক) তে নদী, জলাভূমি ও বন রক্ষা করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে যা সঠিকভাবে সম্পাদনায় ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশ পানি আইন ২০১৩, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০১৩, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ তেও নদী রক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে অনেক ছোট নদীর মৃত্যু ইতিমধ্যে জলবায়ুর উপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। সুতরাং, সরকারের এখনই সময় নদী ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলিকে গুরুত্বের সাথে নেয়ার এবং কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করে অবৈধ দখলদার, শিল্পকর্মীদের থেকে নদীগুলিকে সুরক্ষা দেয়ার। নীতি ও বিধিমালা বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার যেমন: পানির গুণমানের নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণ, জলাশয়গুলিকে দখল থেকে মুক্ত করা, পানিসম্পদ গবেষণা বৃদ্ধি করা, স্থানীয় পানির অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরির ক্ষেত্রে বন্যা নিয়ন্ত্রণের দাবি গ্রহণ, বিভিন্ন সেক্টরের পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, ভূগর্ভস্থ জলের স্রাব, প্রধান নির্মাণ প্রকল্প লেআউট এবং সামগ্রিক নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন।তবে, ২০২০ সালের মধ্যে দেশে মোট ব্যবহারের পরিমাণ ৬৬০ বিলিয়ন ঘনমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। এই উদ্যোগটি জল সম্পদ মন্ত্রণালয় দ্বারা পরিচালিত এবং সে অনুযায়ী ব্যবহারগুলি সীমাবদ্ধ করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

লেখক: নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান এর ছাত্র ছাত্রীর জুবায়ের আহমেদ সাব্বির ,নওরীন নূর সাবাহ, রাকিব বিন হোসেন রাকিব, মাহি ওয়াসিম, মাহি মেহজাবিন, এলমা নাহিয়ান।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।