বিশ্ববিদ‌্যালয় সংকটের মূলে অতি আনুগত্য


Dhaka//Risingbd
Published: 2019-11-11 22:54:16 BdST | Updated: 2019-12-12 16:38:57 BdST

সাক্ষাৎকার গ্রহণ | আবু বকর ইয়ামিন
ছাত্রলীগের পিটুনিতে ৭ অক্টোবর ছাত্র আবরার ফাহাদ খুন হওয়ার ঘটনায় স্থবির হয়ে আছে বুয়েট। শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দিয়ে বন্ধ রেখেছেন ক্লাস পরীক্ষা। ছাত্রদের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের জের ধরে গত ২ নভেম্বর থেকে বন্ধ হয়ে আছে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)। আন্দোলনের মুখে সর্বশেষ মঙ্গলবার অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার শান্তিপূর্ণ যে পরিবেশ ফিরে এসেছে, তা বিনষ্ট হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি, নিয়োগ ও উন্নয়ন কাজে ঘুষ লেনদেনসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ তুলছেন আন্দোলনকারীরা। নানা সংকট ও জটিলতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। চলছে অস্থিরতা।

শিক্ষাবীদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক অনাস্থা, স্বমন্বয়হীনতা, অনিয়ম-দুর্নীতি, দলীয় আনুগত্যের বিচারে ভিসি নিয়োগ, অন্যায়ের প্রশ্রয়ই মূলত এসব অসন্তোষের মূল কারণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য শিক্ষাবীদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অস্থিরতা অনেকগুলো কারণ আছে। মোটা দাগে বলতে গেলে প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগপ্রক্রিয়া। অতি অনুগতদের ভিসি হিসেবে বাছাই করা। আগে যেভাবে ভিসি নিয়োগপ্রাপ্ত হতেন এখন সেভাবে হয় না। আগে যোগ্য ব্যক্তিকে বিবেচনা করা হতো বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়োগ দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে। এখন আর যোগ্যতার ভিত্তিতে হয় না।

তিনি বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করলে একাডেমিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা খুবই কঠিন ব্যাপার। শিক্ষক এবং ছাত্রদের আন্দোলনের সুযোগ দেয়ার দরকার ছিল না। অস্থিরতা বন্ধের জন্য প্রয়োজন যোগ্যতার ভিত্তিতে এই জায়গায় বসানো (ভিসি পদে) । ।শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে যথাযথ ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজন হবে যোগ্য শিক্ষক এবং একাডেমিক এনভায়রনমেন্ট। নিয়ন্ত্রিত কোনো একাডেমিক এনভায়রনমেন্ট হলে চলবে না। বিশ্ববিদ্যালয় একটু উন্নত একাডেমিক এনভারমেন্ট থাকতে হবে যেখানে উন্নত শিক্ষার পাশাপাশি উন্নত সংস্কৃতি চর্চা হবে।

শিক্ষাবিদ, লেখক ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় দেখা যায় এ জাতীয় আন্দোলন লেগেই আছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন না হওয়াটা অস্বাভাবিক বিষয় হয়ে গেছে। এখন ছাত্র-শিক্ষক সবারই চিন্তা করা দরকার যে আমরা যা করছি এর ফলে পড়াশোনা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোথাও আন্দোলনের কারণে ভিসি পদ ছেড়ে দিচ্ছেন আবার কোথাও কোথাও ছেড়ে দিতে অস্বীকার করছেন। ফলে তৈরি হচ্ছে অসন্তোষ। মূলত সমস্যার চাইতে বেশি সমাধান খোঁজা উচিত। যারা প্রশাসনে থাকেন তাদের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ বলেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিবিরোধী আন্দোলন কেন হচ্ছে? এর কারণ হলো, ভিসিদের নিয়োগ দেয় সরকার। আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় মানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় না, এই ভুলটি প্রধানমন্ত্রীর মাথায়ও শক্তভাবে গেঁথে আছে।

তিনি মনে করেন, এগুলো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে জনগণের অংশগ্রহণ থাকে। তাদের কাছে জবাবদিহি থাকতে হয়। এখানে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ভিসিদের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিয়োগ পাওয়ার কথা। কিন্তু, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একজনও নির্বাচিত ভিসি নেই। এগুলোতে সরকার চাকরির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে নিয়োগ দেয়। এ কারণে তারা সরকারের কোনো কথায় প্রশ্ন তোলেন না। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত না যারা, তারাই ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান। যার ফলে সরকারের কথামতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চালাতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভিসিদের মত পার্থক্য সৃষ্টি হচ্ছে। পরে সেটা আন্দোলনে রূপ নেয়।

ইতিহাসবিদ, শিক্ষাবীদ ও গবেষক অধ্যাপক মেসবাহ কামাল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিসির সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মতবিরোধের মূলত তিনটি কারণ। প্রথমত, ভিসি নির্বাচনে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের গুরুত্ব না দিয়ে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ। দ্বিতীয়ত, জবাবদিহিতার অভাব। তৃতীয়ত, ঢাকার বাইরের যে ইউনিভার্সিটিগুলো আছে সেগুলোতে সরকারদলীয় স্থানীয় নেতাদের প্রভাব প্রতিপত্তি থাকা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক অনাস্থাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সংকট তৈরি করছে। সমন্বয়হীনতার কারণে নানা অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন আন্দোলন এর উদ্রেক ঘটছে। একজন শিক্ষকই পদোন্নতি পেয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্যে দায়িত্বে আসেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক একটা ভিন্নমাত্রার সম্পর্ক। শিক্ষকের কাজ শেখানো, শিক্ষার্থীর কাজ শেখা। শেখা ও শেখানোর কাজ সব সময় যদি আন্তরিকতার মধ্যে রাখা যায়, তাহলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইদানীং যে সমস্যা দেখা দিচ্ছে, তা অনেকটা দূর করা যেত।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব কিছু কাঠামো রয়েছে। আইন রয়েছে। সেগুলোর মধ্য দিয়ে যদি সকল সমস্যাগুলো সমাধান করা যায় তাহলে বহুলাংশেই এ জাতীয় সমস্যা সৃষ্টি হয় না। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে হচ্ছে, যখনই এ জাতীয় ঘটনার সম্ভাবনা দেখা দেয় তখনই তদন্ত কমিটি কিংবা নিজেরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে সমস্ত সমস্যার সমাধান করা। যদি সেটি সম্ভব না হয় তাহলে তারা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে বা বিভিন্ন মহলে সংশ্লিষ্ট যারা রয়েছেন তাদের সহযোগিতা চাইতে পারেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান সেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব গতিধারা অনুযায়ী সকল তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে সকল সমস্যার সমাধান করা উচিত।

ভিসি দায়িত্ববোধের বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ভিসির বিরুদ্ধে শিক্ষকদের অসন্তোষের সৃষ্টি হওয়ার অন্যতম কারণ সমন্বয়হীনতা। ভিসি ও অন্যান্য শিক্ষকদের মাঝে সমন্বয় প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রেও ভালভাবে যাচাই-বাছাই করা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে যাতে ভিসির দক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন না ওঠে। এবং ভিসি দায়িত্ব পাওয়ার পর সকল শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যে বিষয়টাকে বেশি গুরুত্ব দেয় সেটিকে প্রাধান্য দিয়েই কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত।

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি, পদে বসার মানসিকতাসহ অন্যান্য কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা তৈরির ইতিহাস পুরনো। কিন্তু সাম্প্রতিককালে সৃষ্ট অসন্তোষের মূলে আছে অনিয়ম-দুর্নীতি।