যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইরান: বিপদে দুই দেশই


Dhaka
Published: 2020-01-09 08:16:13 BdST | Updated: 2020-01-26 08:24:18 BdST

একটু দেরিই করে ফেললেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরপরই বিশ্বব্যাপী একটি আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল। বলা হচ্ছিল, যেকোনো সময় পাগলামি করে বসতে পারেন এই ধনকুবের রাজনীতিবিদ। শেষ পর্যন্ত ইরানকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে অশান্তি তিনি তৈরি করলেন বটে, তবে সময়টা বড্ড গোলমেলে। হিসাবে গরমিল হলে গদি নিয়েও টানাটানি পড়তে পারে ট্রাম্পের।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে এখন সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ জন্য তাঁর ব্যর্থ নেতৃত্বকেই দায়ী করা হচ্ছে। একজন নেতা তখনই সফল হন, যখন তাঁর সুষ্ঠু বিবেচনাবোধ থাকে এবং প্রতিপক্ষের সামর্থ্য সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল থাকেন। এই দুই ক্ষেত্রেই ট্রাম্প অনেক পিছিয়ে। নিন্দুকেরা বলে থাকেন—ট্রাম্প কখন কী করবেন বা করতে পারেন, সেই সম্পর্কে অনুমান করা তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির পক্ষেও সম্ভব নয়। তিনি এতটাই খামখেয়ালি! এহেন ব্যক্তি যখন পরমাণু হামলার নির্দেশ দেওয়ার মতো চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী হন, তখন আরও বেতাল হওয়াই স্বাভাবিক। এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় শত্রু ও মিত্রকে হেলা করার প্রবণতা, তখনই সংঘাত অনিবার্য। এবার তেমনই এক সংঘর্ষের সূচনাপর্ব দেখা যাচ্ছে।

একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে যুদ্ধ এমন একটি জটিল ধাঁধা, যাতে ঢুকে পড়া সহজ, কিন্তু বের হওয়া বেজায় কঠিন। চলতি শতকের শুরুতেই বেশ কয়েকবার তা দেখা গেছে। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া এখনো যুদ্ধক্ষেত্র হয়েই আছে। এর পাশাপাশি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র নতুন যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছে। মূলত দুই পক্ষই কিছু ভুল অনুমান থেকে একে-অপরকে জব্দ করার চেষ্টা করেছিল। আর তাতেই ঘটেছে বিপত্তি।

ওয়াশিংটন পোস্টের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই পক্ষই ভেবেছিল, অন্যদের নাকাল করা কোনো ব্যাপারই নয়। ট্রাম্প ভেবেছিলেন, খুব সহজেই হয়তো ইরানের সঙ্গে করা পরমাণু চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়া যাবে, কোনো পাল্টা প্রতিক্রিয়া হবে না। তাই যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও চীনের মতো পরাশক্তির মতামতের তোয়াক্কা করেননি তিনি। উল্টো ইরানের ওপর আরোপ করলেন নানাবিধ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। তাতে ইরানও গেল খেপে, শুরু হলো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের সঙ্গে দেশটির সংঘাত। কিন্তু মজার বিষয় হলো, দুই পক্ষই হয়তো এসবের প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ঠিক অনুমান করতে পারেনি। তাই একদিকে যেমন কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করল যুক্তরাষ্ট্র, তেমনি অন্যদিকে মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাল ইরান। সব মিলিয়ে পুরো বিশ্বজুড়ে এক ভীষণ উত্তেজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে গেল।

তবে এ নিয়ে সন্দেহ নেই যে, প্রথম ইটটা ছুড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সিএনএন বলছে, এ কারণে যতই আত্মপক্ষ সমর্থন করুন না কেন, সংঘাত শুরুর দায়টা মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘাড়েই চেপে বসছে। ইরাক যুদ্ধে হাজার হাজার মার্কিন সেনার প্রাণহানি হয়েছে, নষ্ট হয়েছে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার। কিন্তু তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার বদলে সেই সংঘর্ষের পথেই পা বাড়িয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর পেছনে অন্যতম কারণ, সম্প্রতি অভিশংসনের প্রস্তাবনা থেকে পাওয়া অপমান। নিজের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারেই কিছু ধুন্ধুমার কাণ্ড প্রয়োজন ছিল ট্রাম্পের। আবার সামনেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। অন্যান্য প্রার্থীদের নকআউট করতেও নিজের কাজ দেখানো প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। এই দুটি বিষয়কে প্রেরণা হিসেবে নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য তথা পুরো বিশ্বকেই অস্থির করে দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সংঘাত যদি যুদ্ধে মোড় নেয়, তবে এই দুই উদ্দেশ্যই কেঁচেগণ্ডূষ হয়ে যেতে পারে। এমনকি গদিও ছেড়ে দিতে হতে পারে। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানকে ঠিকমতো সামাল দিতে না পেরে যেমনটা হয়েছিল জিমি কার্টারের, ঠিক তেমন অবস্থাই হতে পারে ট্রাম্পের।

এদিকে ইরান সেই ১৯৭৯ সালের পর থেকেই ছায়াযুদ্ধের মাধ্যমে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধির চেষ্টা করে আসছে। কাসেম সোলাইমানি এই প্রক্রিয়ার মূল কারিগর ছিলেন। তাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল এবং হচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এবারই প্রথম সরাসরি কোনো মার্কিন স্থাপনায় ঘোষণা দিয়ে হামলা চালাল ইরান। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘাতেই আগ্রহী ইরান, তবে তা আনুপাতিক হারে। অর্থাৎ, বাড়াবাড়ি করার পক্ষপাতী নন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক আলিরেজা নাদের মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কখনোই পুরোপুরি যুদ্ধে জড়াবে না ইরান। কারণ, দুই দেশের সামরিক শক্তির মধ্যে পার্থক্য এতটাই যে, তাতে ইরানের ক্ষতিবৃদ্ধি বাদে অন্য কিছু হবে না। এমনকি যতই হুংকার দেওয়া হোক, যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর সক্ষমতাও নেই ইরানের। তাই ঝিকে মেরে বউকে শেখানোর মতো সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্ষতি করেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে ইরানকে। আর তাই মার্কিন বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর মতো প্রত্যক্ষ সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার পরপরই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুদ্ধের পথে না হাঁটার আহ্বান জানিয়েছেন। এখন ট্রাম্পের তাতে মতি হলেই হয়।

আবার যুদ্ধ যদি বেঁধেই যায়, তবে বেশি বেকায়দায় পড়বে ইরানই। রাশিয়া দেশটির পাশে থাকার ঘোষণা দিলেও, যুদ্ধাবস্থায় সেই প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। ব্লুমবার্গের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সিরিয়া প্রশ্নে রাশিয়া ইরানের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তাই বলে ইরানের হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সক্রিয় যুদ্ধে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেওয়া ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য বেশ কঠিন। কারণ, রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রাখতে আগ্রহী ঠিকই, তবে তার জন্য যুদ্ধের দায়ভার নিজের কাঁধে নিতে চায় না। আর আঞ্চলিক রাজনীতির কারণে মৌখিকভাবে ইরানকে সমর্থন দিলেও, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করে ফেলতে আগ্রহী নয় রাশিয়া। বরং বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে মধ্যস্থতায় পুতিনের দেশ উৎসাহী বেশি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বৈরী সম্পর্ক তাই এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। একচুল এদিক-ওদিক হলেই আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সাক্ষী হবে পুরো বিশ্ব। তাতে কোনো পক্ষই ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে পারবে না। এরই মধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে চলেছে, স্টক মার্কেটে মন্দার লক্ষণ দেখা দিয়েছে। কোন পক্ষের শেষ ঘুষির পর সাদা পতাকা আকাশে ওড়ে, সেটিই এখন দেখার।