করোনাভাইরাস: বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি আছে তো?


ঢাবি টাইমস
Published: 2020-03-11 23:47:45 BdST | Updated: 2020-04-03 17:23:40 BdST

করোনাভাইরাসে বিশ্বের ১০১টি দেশ আক্রান্ত হওয়ার পর গত রোববার বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দেশবাসীকে জানানো হলো যে ভাইরাসটি আমাদের ঘরেও হানা দিয়েছে। প্রথম দিনের খবরে বলা হয়েছে আক্রান্ত হয়েছেন তিন ব্যক্তি। তারপর থেকে ভয়–শঙ্কা, নানা রকমের জল্পনাকল্পনা শুরু হয়েছে। মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিনতে ছুটেছে অনেক মানুষ; ফলে এগুলোর দাম অনেক বেড়ে গেছে, কোথাও কোথাও শেষ হয়ে গেছে, পাওয়া যাচ্ছে না বলে রব উঠেছে। এ-ওকে ফোন করছে, দাম নিয়ে এখন মাথাব্যথা নেই, যে করেই হোক পেতে হবে এগুলো। মোবাইলে–ফেসবুকে সতর্কতা ও করণীয় পন্থাসংবলিত বার্তা চালাচালি চলছে। কেউ কেউ অন্যান্য দেশের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এখনো পরিস্থিতি

এমন হয়নি যে স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করতে হবে।

করোনাভাইরাস মোকাবিলা করার প্রস্তুতির পর্যাপ্ততা–অপর্যাপ্ততা নিয়ে কথা হচ্ছে। সরকার বলছে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আমি ভাবছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের প্রস্তুতি নিয়ে। যদিও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কারও আক্রান্ত হওয়ার খবর এখনো পাওয়া যায়নি, তবু ভাবনা হচ্ছে। কারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা অনেক বেশি; তাঁদের ঘনবদ্ধ বসবাস করোনাভাইরাসের মতো অতি মাত্রায় ছোঁয়াচে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণ হতে পারে। তাই আগাম প্রস্তুতি এবং করণীয় জানা থাকলে সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করা সহজ হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইতিমধ্যে করোনাভাইরাসের ভয় দেখা দিয়েছে বলে আমি জানতে পেরেছি। কোনো কোনো শিক্ষার্থীর অভিভাবক তাঁদের বাড়ি চলে যেতে বলছেন। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের জন্য ১৪টি ও ছাত্রীদের জন্য ৫টি আবাসিক হল রয়েছে। এ ছাড়া চারুকলা অনুষদ ও ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের ছাত্রছাত্রীদের জন্য রয়েছে আলাদা হোস্টেল এবং বিদেশি ছাত্রদের জন্য আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাস। এসব হল ও হোস্টেলের মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ২০ হাজার, তবে এগুলোতে মোট ২৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর বাস। গণরুমগুলোতে অনেক শিক্ষার্থীকে থাকতে হয় গাদাগাদি করে। তাদের শৌচাগারগুলো বারোয়ারি।

ছাত্রী হলগুলোর অভিজ্ঞতায় বলতে পারি যে চার সিটের একটি কক্ষে আমরা ছয়-সাতজন করে ছাত্রীদের রাখি। একজনের বিছানা দুজন ভাগাভাগি করেন। এটিই সব হলের চিত্র। ছেলেদের হলগুলোর চিত্র আরও নাজুক; মেঝেতে বিছানা পেতেও অনেককে থাকতে হয়। তাই একজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে দ্রুতই আরও অনেকের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা খুব বেশি। বর্তমান কাঠামোতে কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে প্রথমে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যাই। অবস্থা বেশি খারাপ বোধ হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অসুস্থ ছাত্রীর সঙ্গে হল কর্তৃপক্ষের কেউ এবং তাঁর রুমমেট বা বন্ধুরা যান। কিন্তু এই করোনার ক্ষেত্রে তার সঙ্গে যঁারা যাবেন, তাঁদেরও এই রোগের সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাহলে সে ক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তুতি কী হবে, এ বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। এমন সম্ভাব্য পরিস্থিতি মাথায় রেখে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিচ্ছে কি? এখন পর্যন্ত আমরা সেই ধরনের কোনো নির্দেশনা পাইনি।

অনেক সময় শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হলে নিজেদের বাসায় চলে যান। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে এ রকম ঘটলে আক্রান্ত শিক্ষার্থীর পরিবারসহ আরও অনেকের মধ্যে, এমনকি তার পুরো এলাকায় করোনা ছড়িয়ে পড়তে পারে।

গত বছর ডেঙ্গু মোকাবিলায়ও বেশ কঠিন অবস্থা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবু মশা মারা ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানসহ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ায় ডেঙ্গু মোকাবিলা করা গেছে। সে সময় অনেক শিক্ষার্থী বাড়ি গিয়ে দীর্ঘদিন থেকে এসেছেন। কিন্তু করোনাভাইরাস ডেঙ্গুর তুলনায় অনেক বেশি সংক্রামক। করোনায় আক্রান্ত হলে শিক্ষার্থীদের বাড়ি পাঠানো উচিত হবে না, তাঁদের বিচ্ছিন্ন করে চিকিৎসা দিতে হবে। গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেঙ্গু শনাক্ত করার যন্ত্র কেনা হয়েছিল; পরীক্ষার চাপে তিন দিনের মাথায় সে যন্ত্র অকেজো হয়ে পড়েছিল। এবার এ বিশ্ববিদ্যালয়ে করোনাভাইরাস দ্রুত শনাক্ত করার কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, আমরা এখনো জানি না। তা ছাড়া, একই সঙ্গে ডেঙ্গুর মৌসুমও তো এগিয়ে আসছে।

করোনাভাইরাস নিয়ে দেশের অন্যান্য জায়গার মতো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও ভুল তথ্য, গুজব, ভিত্তিহীন জল্পনাকল্পনা ইত্যাদি থাকবে। রুমমেটদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে; করোনা–আতঙ্কের কারণে সহপাঠী, রুমমেট, বন্ধুদের পারস্পরিক সম্পর্কে নাজুকতা দেখা দিতে পারে, ভুল–বোঝাবুঝি হতে পারে। কিন্তু সবাইকে বিবেচনায় রাখতে হবে যে এটি একটি বিশেষ সংকটময় পরিস্থিতি। সবাইকে মিলিতভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সচেষ্ট হতে হবে। প্যানিক বা আতঙ্কে ভোগা কিংবা অন্যদের মধ্যে তা সঞ্চারিত হয়—এমন তথ্য, গুজব প্রচার করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। আশা করছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অচিরেই এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করবে।

জোবাইদা নাসরীন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক
[email protected]

Prothomalo