মুনতাসীর মামুন এবং তাজ হাসেমীর প্রশ্নের জবাব


Dhaka
Published: 2020-05-11 14:10:27 BdST | Updated: 2020-06-01 00:48:12 BdST

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের পরিচয় বহুমাত্রিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত শিক্ষক, বিশিষ্ট লেখক, সংগঠক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলনের অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব, গবেষক, গল্পকার, অনুবাদক, শিশু সাহিত্যিক, শিল্প সমালোচক, বুদ্ধিজীবী এবং বরেণ্য রাজনৈতিক ভাষ্যকার। ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন। একই বিভাগে ১৯৭৪ সালে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং ‘বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক’ হিসেবে সর্বশেষ অবসরে যান। জন্ম চাঁদপুরের বিখ্যাত প্রগতিশীল রাজনৈতিক পরিবারে। তবে ছোটবেলা কেটেছে চট্রগ্রামে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পড়ালেখা চট্টগ্রামে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে থাকতেন তাঁর চাচা প্রখ্যাত সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের বাসায় যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন।

মুনতাসীর মামুন ১৯৬৩ সালে তার শিশু সাহিত্যের জন্য প্রেসিডেন্ট স্বর্ণপদক লাভ করেন। লেখালেখির হাতেখড়ি হয়েছিল সেই ছোট বেলা থেকেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি করেছেন ছাত্র ইউনিয়নের। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ডাকসু নির্বাচনে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের প্যানেল থেকে সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। ডাকসুর মুখপত্র ‘ছাত্রবার্তা’ বের হত তারই সম্পাদনায়। এ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল ‘দালাল শিক্ষকরা এখনো হালাল কেন?’ এ প্রবন্ধ প্রকাশ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ কর্তা ব্যক্তি ভিসির সাথে তার আলোচনা সুখকর ছিল না। এরপর তৎকালীন ডাকসুর ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের পরামর্শে পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেস থেকে ‘ছাত্রবার্তা’ প্রকাশ না করে অন্য জায়গা থেকে প্রকাশ করা হয়েছিল। তবুও প্রশাসনের অন্যায্য কথায় সায় দেয়নি। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি সংসদের সভাপতি।

ইতোমধ্যে বিচিত্রা পত্রিকা ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠে। সেখানে নিয়মিত লিখতেন তিনি ও তাঁরই বন্ধু শাহরিয়ার কবির। তার বিভিন্ন ধরণের লেখালেখির সাথে সাথে একাডেমিক লেখা প্রকাশ হতে থাকে। ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি, ডাকসুর নির্বাচিত সম্পাদক, সংস্কৃতি সংসদের সভাপতি, এবং ব্যাপক জনপ্রিয় “বিচিত্রা” পত্রিকার লেখক হিসেবে মুনতাসীর মামুন ক্যাম্পাসে ছিলেন জনপ্রিয় মুখ।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক শহিদ হন। অনেক শিক্ষক রাজাকার হিসেবে চাকুরি হারান। ইতিহাস বিভাগের তিনজন শিক্ষক শহিদ হন এবং সম্ভবত দুইজন শিক্ষক রাজাকার হিসেবে বিভাগ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। ১৯৭৪ সালে ইতিহাস বিভাগে যে পাঁচজন শিক্ষক যোগদান করেন মুনতাসীর মামুন তাদের মধ্যে একজন। তিনি শিক্ষাজনিত শূণ্যপদে ৫/৬ বছর চাকুরী করার পরে স্থায়ী হন। তিনি মনে করেন ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষকগণ যদি শহিদ না হতেন তাহলে হয়তোবা তাঁর এ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা হত না। ফলে শহিদ বুদ্ধিজীবী শিক্ষকদের বিচারের দাবী এবং কার্যকর করা তাঁর পবিত্র দায়িত্ব বলে মনে করেন। যে পাঁচজন শিক্ষক যোগদান করেছিলেন তাদের মধ্যে অধ্যাপক শরিফুল্লাহ ভূঁইয়া এবং তিনিই শেষ পর্যন্ত ছিলেন। বাকিরা বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। তবে তিনি শিক্ষকতার থেকে গ্ল্যামার চাকুরী না করে এখানে থাকার কারণ ছিল শিক্ষক এবং লেখক হতে চেয়েছিলেন। সারা জীবন শিক্ষকতা করেছেন আর লিখেছেন।

১৯৭১ সালে তার চাচা বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের সাথে অবরুদ্ধ দেশে পত্রিকা বের করতেন। বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে সংবাদ পৌঁছে দিতেন। ১৯৭২ সালের শুরুর দিকে শহিদ মিনারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যে সমাবেশ হয়েছিল সেখানে উপস্থিত ছিলেন উনিশ বছরের মুনতাসীর মামুন। সে সমাবেশে ছিলেন জাহানারা ইমাম, পান্না কায়সার প্রমুখ। কথা সাহিত্যিক জহির রায়হানের মৃত্যুর আগের দিনও তিনি ও তার বন্ধু বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির একসাথে সময় কাটিয়েছেন।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ইতিহাস বিভাগ থেকে প্রথম পিএইচডি লাভ করেন মুনতাসীর মামুন। পিএইচডি থিসিস ছিল বাংলা ভাষায়। উনিশ শতকের পূর্ব বাংলা ছিল তার গবেষণার বিষয়। তার সুপারভাইজার ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক অধ্যাপক সালাউদ্দিন আহমদ। পরীক্ষক ছিলেন অধ্যাপক এ আর মল্লিক এবং ভারতের অধ্যাপক সুমিত সরকার।

তাঁর দীর্ঘ পাঁচ দশকের কর্মজীবনের আলোচনা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। ক্লাস রুমে যেরকম ছিলেন নিয়মিত তেমনি বাংলাদেশের প্রতিটি সাংস্কৃতিক এবং গণ আন্দোলনে ছিলেন সরব।

দুহাতে লিখেছেন অবিরাম। প্রায় চারশত বই প্রকাশ হয়েছে তার লেখা এবং সম্পাদনায়। ইতিহাসের জটিল কঠিন গবেষণার বিষয় যেমন তার কলমে এসেছে তেমনি লিখেছেন ভ্রমন কাহিনী, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, ছোট গল্প, শিশু সাহিত্য, শিল্প সমালোচনা। নিয়মত লিখেছেন বিভিন্ন পত্রিকায় রাজনৈতিক ভাষ্য- বিশ্লেষণ যা ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পায়।

পূর্ব বাংলার ইতিহাস, ঢাকার ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন বহু ধরণের বই। এ তিনটি বিষয়ে মুনতাসীর মামুনকে যারা অপছন্দ করেন তারাও তার অবদানকে অস্বীকার করতে পারবেন না।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে হলে মুনতাসীর মামুনের লেখা পড়তে হবে এটা তার বিরোধীরাও অকপটে স্বীকার করেন। ব্যক্তি উদ্যোগে অধ্যাপক মামুন “মুক্তিযুদ্ধ কোষ” লিখার মত অসাধ্য কাজ করে দেখান। লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের নানা দিক নিয়ে।

আর বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীর বিচারে যে কয়েকজন ব্যক্তি অসামান্য ভূমিকা পালন করেন মুনতাসীর মামুন তাদের একজন। যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবীতে যেভাবে রাজপথে সরব ছিলেন, “ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি” সংগঠনের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তেমনি লিখেছেন অবিরাম যুদ্ধপরাধীর বিচার কেন জরুরি সে বিষয়ে। তিনি এ সংগঠনের সহ-সভাপতি। এ সংগঠন করতে গিয়ে দীর্ঘ চার দশক সহ্য করতে হয়েছিল বহু অত্যাচার। সমাজের এলিটশ্রেণি যারা পাকিস্তানিমনা, এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও আছেন যারা ঘাদানিক বলে হাসা-হাসি করতেন। রাষ্ট্রযন্ত্র তার সকল শক্তি দিয়ে থামিয়ে দিতে চেয়েছিলো, কারাবরণ করতে হয়েছিল। কিন্তু তারা দমে যাননি বরং তাদের দাবি বাস্তবায়ন করেছেন জনগণে সমর্থন নিয়ে। থামিয়ে দিয়েছেন একাত্তরের পরাজিত শক্তির মিথ্যে আস্ফালন।

আবুল বাশার নাহিদ, অতিথি লেখক