অজস্র জীবনের মধ্যেই এই পথচলা : জোবাইদা নাসরীন


Dhaka
Published: 2020-05-12 04:01:34 BdST | Updated: 2020-06-01 01:21:49 BdST

মাঝেমধ্যে শিক্ষার্থীরা ফোন করে কিংবা ফেসবুকে জানতে চায়, কবে বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে? কিংবা কবে নাগাদ খুলতে পারে, সেই বিষয়ে কোনো তথ্য আমার কাছে আছে কি না? তার টিউশনিটি থাকবে কি না? আমি বুঝে যাই, বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সঙ্গে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শুধু নয়, আরও অনেক কিছু জড়িত। তাদের কয়েকজনের জীবন নিয়ে ব্যক্তিগত সংগ্রামের কথা জানি। তারা অনেকেই টিউশনি করে, কেউবা খণ্ডকালীন চাকরি করত। শুধু নিজেদের খরচই নয়, এই ক্ষুদ্র টিউশনির টাকা থেকে কেউবা মা-বাবার ওষুধের খরচ দিত, কেউবা হয়তো দিত ছোট ভাইবোনের পড়ার খরচ। করোনাকালে তার ভয় শুধু করোনা আক্রমণের নয়, আরও বিস্তৃত। এই করোনার থাবায় সে বেঁচে গেলেও কীভাবে লড়বে আবার বেঁচে থাকা জীবনে?

করোনা হয়তো এই পৃথিবী থেকে চলে যাবে একদিন। এর আঁচড় থেকে যাবে সভ্যতায়। বাংলাদেশ সরকার মার্চের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে শুরু হয়েছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার কিছু পাঠদানও। তবে খুব সহজেই ধারণা করা যায় যে বাংলাদেশের যেখানে সব পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই; সেখানে সবার টেলিভিশন থাকবে এবং সবাই এই পাঠদানে অংশ নিতে পারবে, সেটিও আশা করা যায় না।

এখন তাহলে আমাদের উপায় কী হবে? আমরা নিশ্চিত যে সামনের দিনগুলোতে অর্থনৈতিক অবস্থা মোকাবিলা করতে গিয়ে আমাদের সব স্তরের অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়বে। সেসব বিষয় আমলে নিয়ে কীভাবে আমাদের করণীয় ঠিক হবে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাথমিকভাবে বেশ কয়েকটি বিভাগ নিজ নিজ শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছে। সেই সঙ্গে শিক্ষকদের ক্রমাগত আলাপচারিতার ফল হিসেবে শিক্ষক সমিতিও একটি তহবিল তৈরি করেছে, যা থেকে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়া হবে। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়েরও লক্ষ্য হওয়া উচিত এই ধরনের শিক্ষা তহবিল তৈরি করা। করোনা-পরবর্তী অবস্থায় শিক্ষার ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে নেওয়া হবে, সেটি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এখনই পরিকল্পনা করতে হবে।

প্রতিটি দেশে যেকোনো সংকটের সময়ই বুদ্ধিজীবীদের কাজ থাকে সংকট-পরবর্তী শিক্ষা খাত নিয়ে পরিকল্পনা ও রূপরেখা প্রণয়ন। কিন্তু আমাদের দেশে সেটিও গড়ে ওঠেনি। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এখন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের প্রয়োজন দেশের শিক্ষাবিদদের নিয়ে করোনা-পরবর্তী শিক্ষা কর্মসূচি তৈরি করা, যাতে এই ক্ষত তাড়াতাড়ি সারানো যায়।

আর শিক্ষার্থীদের বলব, করোনার ভয় তো আছেই, তবু সময়টিকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে জন্য বাড়তি পরিকল্পনা করো। নিজের নিরাপত্তা অটুট রেখে কর্মহীন শ্রমজীবী মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর সময়ও এটি। নিজেকে শাণিত করা এবং নিজের মানবিক গুণাবলির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের সময়ও হয়তো এখন। মনে রাখবে, অজস্র জীবন নিয়ে এবং অজস্র জীবনের পাশাপাশিই তুমি হাঁটছ...।

জোবাইদা নাসরীন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক