শিক্ষার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও সৃজনশীলতা নিয়ে কিছু কথা


Dhaka//Jagonews24
Published: 2020-06-29 20:53:27 BdST | Updated: 2020-07-12 16:15:08 BdST

●●● মাছুম বিল্লাহ ●●●

আজ সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ফেসবুকে চাপ দিতেই একটি ছোট নাটিকা সামনে উপস্থিত হলো। বর্তমানকালের জনপ্রিয় অভিনেতা মোশাররফ করিম সস্ত্রীক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের রুমে হাজির হয়েছেন। সেখানে অন্যান্য শিক্ষকও ছিলেন। তার ছেলেকে প্রতিটি বিষয়েই একেবারে কম নম্বর দেয়া হয়েছে। অভিভাবক হিসেবে মোশাররফ করিম অত্যন্ত বিনয়ের সাথে প্রধান শিক্ষকের কাছে জানতে চেয়েছেন তার ছেলেকে এত কম নম্বর দেয়া হয়েছে কেন অর্থাৎ নম্বরগুলো কেন অকৃতকার্যের ঘরে। খাতা উল্টিয়ে দেখা গেল কোন কোন বিষয়ে বিশেষ করে রচনায় ‘শূন্য’ দেয়া হয়েছে। শূন্য পাওয়ার কথা নয় বিধায় তিনি প্রধান শিক্ষকের দ্বারস্থ হয়েছেন। সঙ্গে তার স্ত্রী বারবার প্রধান শিক্ষককে অনুরোধ করছেন যে, তার ছেলেকে যাতে বিদ্যালয় থেকে টিসি দেয়া না হয় এবং তারা যে এখানে এসেছেন এ জন্য বারবার ক্ষমা চাচ্ছেন।

খাতা খুলে দেখা গেল ছেলেকে রচনায় ‘শূন্য’ দেয়া হয়েছে? ছেলে ‘আমার জীবনের লক্ষ্য’ রচনায় লিখেছে ‘আমি জীবনে অর্থ উপার্জন করতে চাই। রচনার মধ্যে লিখেছেন সৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করতে চাই।’ প্রধান শিক্ষকসহ সবাই হাসাহাসি করলেন শিক্ষার্থীর সামনেই। সবাই বললেন, ‘এ কেমন রচনা। আমার জীবনের লক্ষ্য রচনায় লিখবে আমি ডাক্তার হব, না হয় ইঞ্জিনিয়ার হব, না হয় শিক্ষক হব ইত্যাদি। এ কেমনতর রচনা।’ মোশাররফের স্ত্রী তার স্বামীকে বলছেন, ‘আজ তোমার জন্য সবার কাছে আমার মাধা হেট করতে হলো। বাসায় দরজা আটকিয়ে বাচ্চাকে কী পড়াও? এসব আজে বাজে কথা!’ তখন মোশাররফ করিম ধীরস্থিরভাবে বললেন, ‘আমরা সবাই আসলে অর্থ উপার্জন করতে চাই। আমার ছেলে সেই সঠিক কথাটিই লিখেছে। অর্থ উপার্জন করতে হবে সৎ উপায়ে।’

তখন হেডমাস্টার বললেন, ‘আপনার এইসব আজগুবি গল্প বা আজগুবি শিক্ষা ছেলেকে দিয়ে আপনি কী করাতে চান? কী করতে চান?’ মোশাররফ করিম তখন বললেন, ‘গত ঈদে আমি ছেলেকে নিয়ে দোকানে পাঞ্জাবি কিনতে গিয়েছি। তিন হাজার টাকায় পাঞ্জাবি ঠিক করেছি। ঠিক সেই মুহূর্তে ছেলে বলল, ‘বাবা তোমার বাজেট কত। আমি এই টাকা দিয়ে নয়। আমি এক হাজার টাকা দিয়ে একই কালারের দুটো পাঞ্জাবি কিনব।’ দুটো এক কালারের কেন? বলল ‘একটি আমার জন্য, আর একটি আমাদের বাসায় বুয়ার ছেলের জন্য।’ উপস্থিত সকল শিক্ষক তার মর্মার্থ কতটা বুঝেছেন জানি না, তবে হেডমাস্টারকে দেখলাম একটু পরিবর্তন হয়ে গিয়েছেন। আর মোশাররফ করিম বলেছেন, ‘আমি আমার ছেলেকে এই শিক্ষাই দিচ্ছি। আমার বাবা চেয়েছিলেন আমি শিক্ষক হই, কিন্তু আমি হয়েছি ব্যাংকার।’

ছেলের অন্যান্য বিষয়ের খাতা এনে দেখা গেল সবই আলাদা লেখা। তখন এক শিক্ষক বললেন, ‘কত সুন্দর করে আমি লিখে দিয়েছি সেগুলো না লিখে কী সব গাঁজাখুরি গল্প লিখে বসে আছে। তো নম্বর কীভাবে পাবে?’ করিম সাহেব তখন আবার বললেন, ‘ঐ লেখা তো তার নয়, আপনার লেখা। তাতে তার লাভ কী? তার নিজের স্বকীয়তা কী. সে কীভাবে নিজের ভেতরের শক্তিকে প্রকাশ করবে?’ এবার দেখলাম প্রধান শিক্ষক নড়েচড়ে বসলেন এবং একটু চিন্তা করে প্রতিটি খাতাতেই নম্বর পরিবর্তন করে দিলেন। আর বললেন, ‘আমরা মানুষকে তোতাপাখি বানানো নিয়ে ব্যস্ত আর উনি তোতাপাখিকে মানুষ বানানোর কাজ করছেন। উনিই ঠিক কাজটি করছেন।’

এই সময় আর একটি কথা মনে পড়ে গেল। আমার এক নিকটাত্মীয় যিনি বর্তমানে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, বিদেশে আছেন। বরিশাল জিলা স্কুলে পড়তেন। এসএসসি পরীক্ষায় আলেকজান্ডার পোপের ‘হ্যাপি দ্য ম্যান’ কবিতাটি তখন দশম শ্রেণিতে পাঠ্য ছিল এবং প্রায় প্রতিবছরই ওখান থেকে প্রশ্ন আসত ‘কবির মতের সাথে তুমি একমত পোষণ করো কিনা এবং কেন করো?’ সবাই তার উত্তর লিখত, ‘হ্যাঁ, কবি চেয়েছেন নিজের বাবার জমিতে থাকা, জমির কাঠ দিয়ে আগুন জ্বালানো, নিজের পুকুরের মাছ খাওয়া, শহর সভ্যতার দূরে থাকা এবং মারা যাওয়ার পর কেউ যেন জানতেও না পারে যে, আমি মরে গেছি এবং এখানে শায়িত আছি।’

সবাই তখন কবির মতের সাথে একমত পোষণ করে লিখত। কিন্তু আমার নিকটাত্মীয় লিখলেন, ‘আমি কবির সাথে একমত পোষণ করি না, কারণ এটি হলে দুনিয়ায় আবিষ্কার, অগ্রগতি কিছুই হতো না।’ বোর্ডের খাতা কে কেমন দেখে তার তো কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। কিন্তু তিনি ফল ভালো করেছিলেন, উচ্চ মাধ্যমিকেও বোর্ডে স্থান নিয়ে পাস করে উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে চলে যান। এটি এক ধরনের সৃজনশীলতা।

সৃজনশীলতার ওপর বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের সভা-সেমিনার হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সেখানে বক্তব্য রাখেন, পেপার উপস্থাপন করেন কিন্তু আমাদের শিক্ষার্থী যারা প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় তাদের সৃজনশীল করার প্রক্রিযা কী ধরনের হবে সে বিষয়ে কিন্তু কথা হয় না। শুধু থিওরিটিক্যাল বিষয়াবলি এবং কোন লেখক সৃজনশীলতা নিয়ে, সৃজনশীল লেখক হতে কী গুণাবলি থাকতে হবে ইত্যাদি নিয়ে কথা হয়। প্রশ্ন রাখা হলে তারা উত্তর দেন শিক্ষকদের প্রশিক্ষিত হতে হবে, পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি পরিবর্তন করতে হবে ইত্যাদি। এগুলোর কোনো কিছুই কিন্তু একজন শিক্ষক করতে পারেন না। শিক্ষাব্যবস্থার মতো পাহাড়সম বিষয়কে একজন শিক্ষক সহজে নাড়া দিতে পারেন না। তবে একজন শিক্ষক পারেন তার শ্রেণিকক্ষ থেকে, তার পরিচিত প্রতিষ্ঠানের আঙিনা থেকে পরিবর্তনে হাওয়া চালু করতে।

একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে প্রশ্ন করা হলো, ‘কীভাবে আমরা আমাদের ছেলেদের ক্রিয়েটিভ লেখক হিসেবে তৈরি করব?’ তিনি উত্তরে বললেন, ‘এখন তো ছেলেমেয়েরা বই পড়তে চায় না, বই না পড়ে তো ক্রিয়েটিভ লেখক হওয়া যাবে না।’ এটিতো সবাই জানে যে, বর্তমান যুগে শিক্ষার্থীরা বই পড়তে চায় না। এখন সেখানে শিক্ষককে কী করতে হবে, কীভাবে তিনি তাদের শ্রেণিকক্ষে নিয়ে আসবেন, বই পড়াবেন ইত্যাদি টেকনিকগুলো আলোচনা করতে হবে।

যেমন বর্তমান কোভিড-১৯ অবস্থার ওপর আলোচনা হতে পারে। শিক্ষার্খীদের জিজ্ঞেস করা যেতে পারে এই পরিস্থিতিতে শিক্ষায় বিশেষ করে তোমাদের জীবনে যেসব পরিবর্তন এসেছে, শিক্ষার যে ক্ষতি হয়েছে সে সম্পর্কে কিছু লেখ। পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি দাও। রাষ্ট্রীয় কোন বিষয়টি তোমার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ মনে হচ্ছে, কেন হচ্ছে। তুমি এ ব্যাপারে কী বলতে চাও সে বিষয়গুলো লিখতে পারো।

করোনা বিষয়টি যেহেতু তাদের জীবনকে ছুঁয়ে যাচ্ছে তারা অবশ্যই কিছু না কিছু অ্যাকশন, রিঅ্যাকশন, জমানো কথা, বিরক্তি, ভালোলাগা সবকিছুই প্রকাশ করতে চাইবে, প্রকাশ করতে পারবে। যে ভাষায়ই প্রকাশ করুক ভাষায় সমস্যা থাকবে, শিক্ষকের দায়িত্ব হচ্ছে ভাষা সংশোধন করে দেয়া। তাদের যে জগৎ তার বাইরের জগৎ থেকেও নতুন কিছু ধারণা শিক্ষক দিতে পারেন তাদের লেখার গণ্ডিকে আরও বিস্তৃত করার জন্য। এভাবে শ্রেণিকক্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা চর্চার, সৃজনশীল লেখক হওয়ার প্র্যাকটিস শুরু হতে পারে। বাজারের গাইড বইয়ের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীলতা কমানো যেতে পারে।

আমাদের নৈতিক ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণের প্রাথমিক কাজ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা স্তর থেকেই কিন্তু শুরু হয়। আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এর আলোকে প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে মোট ত্রিশটি। এর মধ্যে দ্বিতীয়টিতেই রয়েছে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের কথা। দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস, বিজ্ঞান মনস্কতা, আবিষ্কার, প্রযুক্তি প্রভৃতি বিষয় মিলে এই ত্রিশটি লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে যেগুলো পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।

শিক্ষার লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল করে তোলা যাতে তারা জীবনের সমস্যাগুলো বিশ্লেষণ করে সমাধান বের করতে পারে, শুধু গ্রেডিং নিয়ে পাস করা নয়। একটি সফল জীবিকায়নের পথ নিশ্চিত করার মধ্যেই জীবনের সত্যিকার স্বার্থকতা নিহিত রয়েছে অনেকে মনে করেন। আর তাই শিক্ষার্থীরা রচনায় লেখে- আমি ডাক্তার হবো, আমি সরকারি কর্মকর্তা হবো, ইঞ্জিনিয়ার হবো। কিন্তু দেশ, মানুষ ও মানবতার সেবা করতে হবে সেটি কীভাবে করতে হবে, তার শিক্ষা তারা কোথায় পাবে বিদ্যালয়ে যদি এগুলোর চর্চা করা না হয়? তাদের মধ্যে জীবিকা আর জীবনের লক্ষ্যকে এক করে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এটি অবশ্য তাদের দোষ নয়। পরিবার থেকে শিশুকে বলা হচ্ছে মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করো, তোমাকে ডাক্তার হতে হবে। কেন? বেশি অর্থ উপার্জন করতে পারবে, সমাজে সবাই অন্যচোখে দেখবে। কারণ তো আসলে এগুলোই। আমরা শিক্ষার্থীদের না পারছি সৃজনশীল মানুষ বানাতে, না পারছি মানবিকতা শিক্ষা দিতে। শুধু উচ্চতর গ্রেড পাওয়া আর পাওয়ানো নিয়ে ব্যস্ত সবাই।

আমাদের মূল্যায়ন পদ্ধতিকে যদিও ক্রিয়েটিভ বা সৃজনশীল বলা হয় কিন্তু প্রশ্ন করা, পরীক্ষার উত্তর লেখা বা শ্রেণিকক্ষে পড়াশুনা এগুলোর কোনো ক্ষেত্রেই প্রকৃত সৃজনশীলতা নেই। সঠিক মূল্যায়ন হলে প্রচলিত পদ্ধতির মধ্য থেকেই অনেকে অকৃতকার্য হবে, এটি শিক্ষা কর্তৃপক্ষ কিংবা সরকার চাইবে না। এটিই স্বাভাবিক। তাই বলে শিক্ষকের যে দায়িত্ব সেটি কিন্তু এড়ানো যাবে না। প্রশ্ন প্রকৃত অর্থে সৃজনশীল না তাই শিক্ষকও শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা উস্কে দেবেন না তা হওয়া ঠিক নয়। শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে অবশ্যই সৃজনশীলতার চর্চা করাতে পারেন। সেটি কীভাবে করাবেন, শিক্ষার্থীদের কীভাবে শ্রেণিকক্ষে ধরে রাখবেন, এখন তারা পড়তে চাচ্ছে না কীভাবে পড়ানো যায়, আনন্দদানের মাধ্যমে কতটা শিক্ষাদান করা যায় সে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা, ওয়ার্কশপ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম হতে পারে এবং হওয়া উচিত। তাহলে শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলো সবার কাছে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে এবং সে ধরনের প্র্যাকটিসই তখন অনুসরণ করা হবে।

লেখক : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক