ঢাবি জীবনের কথা: যে পথে আলো জ্বলে


Dhaka
Published: 2020-07-10 13:35:35 BdST | Updated: 2020-08-07 10:01:13 BdST

জীবনের পথ চলি আর বারেবারে স্মৃতিতে ফিরে আসে প্রিয় ক্যাম্পাস কার্জন হল। রসায়নের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই। কোথায় হারিয়ে গেছে সোনালি সেই দিনগুলো! আজ আর নেই। সত্যিই নেই। আমাদের বন্ধুরা কে কোথায়? ছড়িয়ে আছি দেশে-বিদেশে। কথার রাজা আলিম থাকেন নিউইয়র্কে। মাহবুব, সাদেক, রাজীব, আর লিমা কানাডায়। মিষ্টি মেয়ে আফরিন থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়। জাপানে থাকে রসায়ন যুগল হাকিম ও টুশি। ছোটকু মুনির আর চুপচাপ থাকা রাহুল থাকেন কোরিয়াতে।

তখনকার অসচেতন মেধাবী মাহবুব, ভালো ছাত্রী লিমা, বাকপটু বাহাদুর, স্পস্টভাষী লুম্বীনি, চুপচাপ থাকা রাহুল, সুইট রোজি তাঁরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। পিএইচডি তাঁরা সবাই। কে আছেন পিছিয়ে? সেই বুদ্ধিজীবি হাকিম, রাগী মেয়ে টুশি, কিশোরগঞ্জের পোলা মতিন, ছোটকু মুনির, স্মার্টবয় রাজীব তাঁরা সবাই পিএইচডি। এই গল্পের লেখক আলাভোলা সাদেকও একই দলে, সবার আগেই ডক্টর হয়েছে অবশ্য। মিষ্টি হাসির সূচি, আর শান্ত মেয়ে নাদিয়া পিএইচডিতে গবেষণারত।

বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংকের ম্যানেজমেন্টে আছেন মিঠু, আশিক, মাসুম, মানিক, জুয়েল, রফিকসহ হয়তো আরও অনেকে। কেমিক্যাল ও ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টরে আছেন স্বল্পভাষী টিটু, ক্যাডেট রোকন, সদাহাস্য রাশেল, চোখ ভরা কথা নিয়ে নির্বাক থাকা নাদির, শান্ত মাহবুব, ভাবুক শহীদ, ক্লাস ভালো না লাগা সেই আদিল, কবি কাদেরসহ আরও অনেকে। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকতায় জিনিয়াস প্রদীপ, ভদ্র ছেলে কাজিম, সদাহাস্য রিপক, ভদ্র ছেলে নির্মল, আর ইংলিশে তুখোড় সেই বিপলব। সুন্দরী লিন্ডা হলেন স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথোলজিষ্ট। টিভিতে সোলায়মান। আর্মিতে শান্ত মেয়ে নাদিয়া।

একসঙ্গে প্রায় সাত বছর কেটেছে আমাদের। আহ কী মজার সেই সব দিনগুলো! নাহ,আজ সেই আড্ডাটা আর নেই। ভালো লাগা, খারাপ লাগা, বন্ধুত্ব, মনোমালিন্য সবই ছিল আমাদের। প্রেমও ছিল। লিমা ও রাজীবের ভালোবাসার রসায়নটা সফলতা পেয়েছে। হাকিম ও টুশি এতটুকু পিছিয়ে ছিলেন না, তাঁরাও সুখে-শান্তিতে ঘর বেঁধেছেন। এই আলাভোলা গল্পলেখক ছেলেটাও কীভাবে যেন ভালোবাসার রসায়ন খুব ভালোই বুঝেছিল। জুনিয়র রসায়নবিদকে জীবনে চলার জন্য সঙ্গে পেয়েছে। অন্যদিকে কাকে যেন ভালোবেসে, না পাওয়ার আঘাত পেয়ে যে শেষে পাগলা গারদে না গিয়ে প্রেমিক পুরুষ মাহবুব বিয়েটাই শুধু করছিলেন না। দেরিতে হলেও তিনিও ঘর বেঁধেছেন। এখন খুব সংসারীও।

আহ সেই সব দিন! জীবনের বাস্ততায় আজ আমরা কাছাকাছি নেই। তাতে কী! আমাদের প্রাণের রসায়ন বিভাগটা আছে, থাকবে। নতুনেরা আসছে, আগামীতেও আসবে। তারা আসে অনেক স্বপ্ন নিয়ে। সেই স্বপ্নগুলো আলোর মুখ দেখে। স্বার্থান্বেষী মহলের কালো থাবায় কিছু স্বপ্ন মাটি চাপা পড়ে। ভুক্তভোগীকে কাদায় জনম জনম। আমিও কাঁদি মাঝে মাঝে।

স্মৃতির পাতায় সেই সাত বছরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। ১৯৯৬ থেকে ২০০২। ছিল সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না। পেয়েছি শিক্ষা, করেছি ভালো ফলাফল। আমরা অর্জন করেছি বিবেকবোধ, বুদ্ধিমত্তা, অভিজ্ঞতা, পরিচিতি, আর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকার শক্তি। অপূর্ণতা আছে, খুব বড় অপূর্ণতা। চোখের অবিরাম জলে ভেজা অপূর্ণতা।

খুব যত্নে লালিত স্বপ্ন আমার। একদিন শিক্ষক হব, এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। না সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। এমএসসি শেষ করে উড়াল দিয়ে চলে যাই দেশের বাইরে। জাপান সরকারের বৃত্তি নিয়ে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট গবেষণা শেষ করি। টোকিওতে কতই না সুযোগ, গবেষণার, চাকরির। নাহ সেখানে না, আমার স্বপ্ন আমার প্রাণের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছুটলাম দেশের টানে, বারেবারে। মোট তিনবার (২০০৬ থেকে ২০০৯)। রসায়ন বিভাগের শিক্ষক হওয়ার চেষ্টায়। যোগ্যতার কোনো ত্রুটি ছিল বলে মনে হয় না। হয়নি, অজানা কারণে। বিখ্যাত টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের স্বনামধন্য দুজন শিক্ষক অধ্যাপক কিতাহারা ও অধ্যাপক ওয়াতানাবেরও সে কী সাপোর্ট! আমার জন্য তাঁরা চিঠি ও ই–মেইল লিখেছেন সিলেকশন কমিটির সবাইকে, ভিসি, ডিন, চেয়ারম্যানসহ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার চেষ্টায় বারেবারে অনেক হতাশ হয়েছি। তৃতীয়বারে, প্রাণের কার্জন হলে দাঁড়িয়ে চোখের অবিরাম জলে ভিজিয়েছি গায়ে থাকা জামাটা। গড়িয়ে পড়া সেই জলে কার্জন হলের মাটিও সিক্ত হয়েছে। রসায়ন বিভাগের একজন তরুণ শিক্ষক তখন পাশে দাঁড়িয়ে। বিচারের ভার দিয়েছি সৃষ্টিকর্তার কাছে, উনি নিশ্চয়ই সব অবগত আছেন। ভেঙে পড়িনি। আছে মৃত্যুর আগে না মরার দৃঢ় মনোবল।

কথা বলার শিক্ষা, বর্ণশিক্ষা, নীতি ও আদর্শের শিক্ষা এসব আসে পরিবার থেকে। মানব সন্তান, তুমি বড় হবে। কোনো বিপদে হতাশ হতে পারো তুমি, তবে ভেঙে পোড়ো না। তুমি উঠে দাঁড়াও। চলতে থাকো, খুঁড়িয়ে হলেও। ভয়ে ভীত হবে না, সাহস রাখো। তুমি গর্জে ওঠো! না পাওয়ার বেদনায় ব্যথিত হতে পারো তুমি, মনে শক্তি রাখো। তুমি জ্বলে ওঠো! মনোবলকে করো আরও দৃঢ়, মৃত্যুর আগে কখনো মরিও না। তোমার আছে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকার শক্তি। তুমি পারবেই, পারবে। খারাপ সময়ে অনেক সাহসী আর গুণীজনের চেহারা আমার চোখে ভাসে। চোখটা বন্ধ করো, ভাবো। এই তো, তোমার আশেপাশে তুমিও দেখতে পাচ্ছো সেসব সাহসী আর গুণীজনদের। তা–ই না? শেষ।

*সাদেকুল ইসলাম, টরন্টো, কানাডা, পিএইচডি: রিসার্চ সায়েন্টিস্ট, টরন্টো, কানাডা। [email protected]