রোবটিক্স প্রযুক্তি ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ


ঢাবি টাইমস
Published: 2020-07-13 13:53:26 BdST | Updated: 2020-08-09 11:45:08 BdST

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন নির্ভর করে তার শিল্পায়নের ওপর। সময়ের সঙ্গে শিল্পায়নের প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়। তাই একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক গতিধারাকে ধরে রাখার জন্য পরিবর্তনের প্রবণতাকে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে উন্নত সোনার বাংলাদেশ গড়তে একটি শ্রমভিত্তিক অর্থনীতি থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর হওয়া অত্যন্ত জরুরী। এই উন্নয়ন যাত্রায় ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে তথ্য প্রযুক্তি হচ্ছে প্রধান হাতিয়ার। উন্নত বিশ্বে শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন সেক্টরে রোবটের ব্যবহার বেড়েছে বহগুণে। যেহেতু বাংলাদেশ কৃষি নির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে শিল্প নির্ভর অর্থনীতির দেশ হয়ে উঠছে, সেহেতু উন্নত দেশের সাথে পাল্লা দিয়ে শিল্পক্ষেত্রের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং বৃহৎ সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে রোবট এবং রোবটিক্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

যেহেতু মানুষকে একটি নির্দিষ্ট টাইম ফ্রেমের মধ্যে কাজ করতে হয় এবং শারীরিক ক্লান্তি বা অবসাদের কারণে তার কাজের গতিও সব সময়ই একই থাকে না, সেক্ষেত্রে রোবট মানুষের সহযোগী হতে পারে; যেমন- মানুষ যে কাজগুলো করতে পারে না; অনেক ক্ষেত্রে রোবট দিয়েই সে কাজগুলো ২৪ ঘন্টা ধরেই করানো যাবে। কারখানায় কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত রোবটের সাহায্যে নানারকম বিপদজনক কাজ; যেমন−ওয়েল্ডিং, ঢালাই, ভারি মালামাল ওঠানো-নামানো যন্ত্রাংশ সংযোজন ইত্যাদি কাজ করা হয়। তাছাড়া বিভিন্ন ধরনের মাইক্রো সার্কিটের কাজ সূক্ষভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারে রোবট, যা মানুষের দ্বারা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে অনেক ইন্ড্রাস্ট্রি আছে যে গুলোতে মানুষের উপস্থিতি পণ্যের গুণগত মানের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে, সেসব ইন্ড্রাস্ট্রিতে গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য তৈরিতে রোবট ব্যবহার করা যেতে পারে। অর্থাৎ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় রোবট ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশের শিল্পের উৎপাদনশীলতা এবং নির্ভুলতা বহুগুণে বৃদ্ধি পেতে পারে।

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট দূর্যোগেও রোবট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মানুষের যেখানে কাজ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে রোবট অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ও সফলভাবে কাজ করতে সক্ষম। যেমন- বাংলাদেশের কোথাও অগ্নিকান্ড কিংবা দূর্ঘটনাকবলিত দুর্গম এলাকা থেকে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা, বোমা ডিফিউজিং কিংবা ত্রাণ ব্যবস্থাপনা পরিচালনায় রোবটের অনিন্দ্য ভূমিকা বেশ প্রশংসার দাবি রাখবে।

বাংলাদেশের চিকিৎসাক্ষেত্রে রোবটের ব্যবহার দেশের সার্বিক উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ করবে। যেমন টেলি অপারেশন (দূর থেকে নিয়ন্ত্রন), মেডিক্যাল সার্জারি কিংবা নির্ভুলভাবে মেডিকেল রিপোর্ট প্রদানের মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতে নতুন মাত্রা যোগ করা যাবে রোবটের মাধ্যমে।

সমুদ্র অর্থনীতিতে বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময়ী দেশ। অ্যান্ডার ওয়াটার ভেহিকেল(পানির নিচে কর্মপোযোগী যান) থেকে শুরু করে সমুদ্রের নিচে অনেক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গবেষণার কাজ রোবটের মাধ্যমে নির্ভূলভাবে সম্পাদন করা যাবে।

বাংলাদেশ যেহেতু স্যাটেলাইট যুগে প্রবেশ করেছে, সেহেতু মহাকাশের গবেষণায় রোবট ব্যবহৃত হতে পারে। বাংলাদেশে যেহেতু প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য্যতা রয়েছে, সেহেতু মাটির নিচে বিভিন্ন দুর্গম পরিবেশে কিংবা বিভিন্ন খনিতে, যেখানে মানুষের বেঁচে থাকাই সম্ভব নয়, সেখানে কাজ করতে রোবটের ব্যবহার করা যেতে পারে।

বাংলাদেশে যেখানে জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করা হয়েছে, সেখানে ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবট তৈরি করে একে একটি রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিণত করা যৌক্তিক ও ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হবে। সবচেয়ে বড় আশার কথা হচ্ছে, জনসম্পদকে ব্যবহার করার মতো শিল্পকারখানা ও রোবোটিক্সের মতো অটোমেশন সংক্রান্ত শিল্পকারখানা গড়ে তোলার মতো সক্ষমতা আমাদের দেশের চেয়ে অন্য কোথাও নেই। আর এ ধরনের দ্বৈত কাঠামোর শিল্পকারখানার মাধ্যমে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি উন্নত দেশগুলোকেও ছাড়িয়ে যাবে। এ জন্য শিল্পায়নের ক্ষেত্রে ম্যান অ্যান্ড অটোমেশন কম্বিনেশন কনসেপ্ট প্রয়োগ করার প্রয়োজন রয়েছে। যে কনসেপ্ট অনুযায়ী অটোমেশন যেমন বাড়বে মানুষের কর্মসংস্থানও তেমনি বাড়বে।

রোবটিক্স হলো প্রযুক্তির একটি শাখা যেটি রোবট সমূহের ডিজাইন, নির্মাণ, কার্যক্রম ও প্রয়োগ নিয়ে কাজ করে। অনেক পরে হলেও বাংলাদেশ বর্তমানে গুরুত্ব দিচ্ছে রোবট ও রোবটিক্স শিক্ষার উপর। এরই ধারাবাহিকতায় রোবট নিয়ে বিশেষায়িত শিক্ষার জন্য ২০১৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু করা হয়েছে রোবটিক্স এন্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং নামে আলাদা একটি বিভাগ। এতোদিন যে প্রযুক্তি ও এর ব্যবহার সম্পর্কে জানার জন্য অন্য দেশের এক্সপার্টদের উপর নির্ভর করে থাকতে হয়েছে, এখন থেকে আমরা নিজেরাই নিজ দেশের এক্সপার্টদের দিয়ে সে জায়গাটা দখল করতে পারবো। আশা করি দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে স্বপ্নের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে মানুষের সহযোগী হিসেবে এই রোবটিক্স প্রযুক্তি অনন্য ভূমিকা পালন করতে পারবে।

লেখক - মোঃ আরিফুল ইসলাম
লেকচারার 
রোবটিক্স এন্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়