ধন্যবাদ ভারত : পেঁয়াজ না দেওয়ার জন্য


মিরাজ আহমেদ
Published: 2020-09-16 10:31:35 BdST | Updated: 2020-09-23 19:21:54 BdST

বিভিন্ন সংবাদাধ্যমে দেখলাম ভারত নাকি পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। এই ঘোষণা এমন সময়ে আসলো যখন আমরা ভারতে ইলিশ রফতানির ঘোষণা দিলাম। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে অনেকে খুব ক্ষুব্ধ, আলোচনা, সমালোচনা এবং ট্রলও হচ্ছে অনেক। কিন্তু আমার তো মনে হয় ভারতকে গালি না দিয়ে বরং ধন্যবাদ দেওয়া উচিৎ। কেনো?

১. ভারত থেকে পেঁয়াজ না আসলে কি আমরা মারা যাবো? নিশ্চয় না। আগেও এমন হয়েছে , তাতে কি আমাদের খুব কষ্ট হয়েছে কিংবা জীবনযাত্রায় খুব ছেদ পড়েছে? ভারত যখন গরু রফতানি বন্ধ করে দিল তাতে লাভ কিন্তু আমাদের হলো। আমাদের দেশীয় অনেক বড়ো বড়ো খামার গড়ে উঠলো। ঘটাতি ত পূরণ হলোই বরং এখন উদ্বৃত্ত ও থাকে। অন্যান্য পণ্য কিংবা পেয়াজের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই হবে। পাশাপাশি আমাদের আমদানি খরচ আমাদের বেঁচে যাবে। লাভের উপর ডাবল লাভ হবে ইলিশ রফতানির টাকা। অংকের হিসেবে যদি প্রতি কেজি পেয়াজ ৫০ টাকা হয়, বাংলাদেশ শুধুমাত্র একমাস বাঁচাতে পারবে ৫০০ কোটি টাকা (প্রতিমাসে ১ লাখ টন হিসেবে)। আর বছর ঘুরতে সেটা হবে ৫০০০ কোটি টাকার মতো। আর একান্তই যদি আমরা পেঁয়াজ উৎপাদন না করতে পারি, বর্তমানে অনেক দেশই উদ্বৃত্ত পেঁয়াজ নিয়ে বসে আছে রফতানির অপেক্ষায়। তাই ভারতকে গালি না দিয়ে বরং দুইবার ধন্যবাদ দিন।

২. পেঁয়াজ পচনশীল হওয়ায় কাছের কোনো দেশ থেকে আমদানি করলে সময় কম লাগে আবার যাতায়াত খরচও কিছুটা কম পড়ে। সেজন্য আমাদের ৯৫% পেঁয়াজই আমরা ভারত থেকে নেই। পৃথিবীর পেঁয়াজ উৎপাদনে চিন শীর্ষ আর রফতানিতে নেদারল্যান্ড, আমদানিতে আমেরিকা। তাই ভারত ছাড়াও আমরা সহজেই সল্প মেয়াদি সংকট কাটাতে পারবো, হয়ত কিছুটা দাম বেশি পড়তে পারে। পৃথিবীর অন্যান্য শীর্ষ পেঁয়াজ উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে আছে মিসর, তুরস্ক, ব্রাজিল, রাশিয়া যাদের সাথে আমাদের ভালো সম্পর্ক বিদ্যমান। পক্ষান্তরে, করোনাকালীন প্রথম কয়েক মাস তো ভারত থেকেও আমদানি বন্ধ ছিল। তার মানে আমাদের মজুদ খুব কম ছিল না, এখনও কম নয়। তাই হঠাৎ করে একদিনে দাম ১০-৪০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া কোনো সুস্থ, বিবেকবান মস্তিস্কের ব্যাবসায়ীদের কাজ না। নতুন করে আমদানির ঋণপত্র খুলতে এবং আনতে যে কয়দিন সময় লাগবে, মজুতদারদের উচিৎ সে কয়দিন সময় সরকার এবং আমদানিকারকের দেওয়া, একটু মানবিক হওয়া। উপরন্তু বর্তমান বাজার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সরকার একটি মনিটরিং সেল গঠন করতে পারে।

৩. বাংলাদেশে সাধারণত শীতকাল পেঁয়াজ উৎপাদনের উপযোগী আবহাওয়া, এখন নতুন জাতের পেঁয়াজ গরমকালে উৎপাদন করা গেলেও সেগুলো বেশিদিন সংরক্ষণ করা যায় না। এছাড়া বৃষ্টিপাতের কারণে জমিতে পানি জমে পেঁয়াজ নস্ট হয়ে পড়ে। আবার আলুর যে কোল্ডস্টোরেজ আছে আদ্রতা এবং তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে সেটাতে পেয়াজ সংরক্ষণ করা যায় না।কারণ পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজে আর্দ্রতা লাগবে ৬০%, তাপমাত্রা লাগবে আট ডিগ্রী থেকে ১২ ডিগ্রী সেলসিয়াস। আলুর কোল্ড স্টোরেজে এই মাত্রাটা ভিন্ন থাকে। আমাদের গবেষণা করে দেখা উচিত এমন কোনো স্টোরেজ সিস্টেম আবিস্কার করা যায় কিনা যাতে আলু এবং পিয়াজের মত পণ্য একসাথে সংরক্ষণ করা যায়। আবার চাল কিংবা অন্যান্য মৌসুমী ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে কৃষক যতোটা আগ্রহী, পেঁয়াজের ক্ষেত্রে তেমনটা নয়। কারণ চাল বা অন্যান্য উৎপাদন অপেক্ষাকৃত লাভজনক। সে ক্ষেত্রে সরকার যদি কিছুটা ভর্তুকি দেয় তাহলে কৃষক উৎসাহিত হবেন।

৪. বাংলাদেশের বাস্তবতায় চাইলেই ফসল ফলানোর জন্য জমি বাড়ানো যাবেনা। সে ক্ষেত্রে গবেষণার বিকল্প নাই। নতুন নতুন জাত আর বড়ো বড়ো সাইজ, অল্প জমিতে কিভাবে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন করা যায় সে ব্যাবস্থা করতে হবে। অবশ্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টটিউটের উদ্ভাবিত বারি -১ চিভ, পেঁয়াজের বিকল্প হিসেবে ধরা হলেও প্রয়োজনীয় প্রচারের কারণে অনেকের কাছেই অজানা। আর দীর্ঘময়াদি পরিকল্পনার জন্য দেশী- বিদেশি গবেষকদের স্মরনাপন্ন হওয়া যেতে পরে। মাত্র একটি বছর কষ্ট করলে ভারত থেকে আমদানি পরিমাণের ৫০০০ কোটি টাকা দিয়ে যদি পৃথিবীর নামকরা পেঁয়াজ গবেষকদের আমরা আনতে পারি, পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা দিতে পারি, আমার বিশ্বাস আমাদের আবহাওয়া উপযোগী করে নতুন নতুন জাতের পেঁয়াজ উৎপাদন করে নিজেরাই সয়ংসম্পূর্ন হব। সেটাও যদি না করতে পারি, তাহলে আমাদের কিছু স্যাম্পল পেঁয়াজ চীনাদের পাঠিয়ে দিলে তারা একই ঝাঁঝের, স্বাদের, সাইজের পেঁয়াজ বানিয়ে আমাদের কাছে কম দামে রফতানি করবে।

বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাঝে আবদার থাকতে পারে কিন্তু ভিক্ষাবৃত্তি নয়। গ্লোবালাইজেশনের যুগে, মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে কারো দয়া বা মুখাপেক্ষী হবার আশা করা ভিক্ষারই শামিল। পেঁয়াজের মত একটি কৃষিজাত পণ্যের জন্য হাহাকার করে অন্যের দোষ না দিয়ে নিজের সামর্থ্য দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই অধিক যুক্তিযুক্ত। তাতে করে বহির্বিশ্বে এমনকি পাশের দেশগুলোকে ও প্রচ্ছন্ন একটা বার্তা দেওয়া যায় আর নিজের সক্ষমতার ও কিছুটা বহিঃপ্রকাশ ঘটে। সেক্ষেত্রে গণমাধ্যম কিংবা সামাজিক মাধ্যমে আমাদের আরো সহনশীল, দায়িত্বশীল আচরণ কাম্য।

মিরাজ আহমেদ, সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
গুয়াংডং ইউনিভার্সিটি অফ ফাইনান্স এন্ড ইকোনমিকস