ইতিহাসের জীবন্ত এক সাক্ষীর দৈহিক প্রস্থান


Dhaka
Published: 2020-11-16 20:41:43 BdST | Updated: 2021-01-24 03:00:22 BdST

এম.এস.আই খান
ভাবুন তো, সেনাবাহিনীর মধ্যে ‘বিদ্রোহের পরিকল্পনা’ করার অভিযোগে কাউকে গ্রেফতার করলে তার আত্মা কতটা শুকিয়ে যাবার কথা! তারা যে মৃত্যুর পেয়ালায় চুমুক দিতে যাচ্ছেন সে বিষয়ে হয়ত মোটামুটি নিশ্চিত-ই হয়ে গিয়েছিলেন। বিশেষ করে একই অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া সার্জেন্ট জহুরুল হক-কে যখন কারাগারের মধ্যেই গুলি করে মেরে ফেলা হল তখন বাকিদের তাদের পরিণতি আঁচ করতে পারার কথা।

সে-বারের সেই নিশ্চিত মৃত্যুর যাত্রা থেকে ফিরে আসতে পারা ভাগ্যবানদের একজন কর্নেল শওকত আলী। ইতিহাসের সেই চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তের সাক্ষী কর্ণেল শওকতের জন্ম ১৯৩৭ সালের ২৭শে জানুয়ারি শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার লোনসিং বাহের দিঘীরপাড় গ্রামে। পিতা মুন্সী মোবারক আলী ও মাতা মালেকা বেগমের সন্তান শওকত আলী নিজ এলাকা শরীয়তপুর-২ আসন থেকে টানা ছয় বার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি দুই ছেলে ও এক কন্যার জনক।

শিক্ষা জীবনে সোহরাওয়ার্দী কলেজের ছাত্র ছিলেন তিনি। সেখান থেকে আইকম ও বিকম পাশ করেন। পরে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। ২৪শে জানুয়ারি ১৯৫৯ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন প্রাপ্ত হন। পেশাগত দক্ষতা বিবেচনা করে তাকে করাচির নিকটবর্তী মালির ক্যান্টনমেন্টে অর্ডন্যান্স স্কুলের প্রশিক্ষক নিয়োগ করা হয়। ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বিপ্লবী পরিষদের সদস্য ছিলেন। তাকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। তিনি ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’ মামলার ২৬নং আসামী ছিলেন। এ মামলায় ১৯৬৮ সালের ১০ জানুয়ারি ক্যাপ্টেন পদে চাকরিরত অবস্থায় মালির ক্যান্টনমেন্ট থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তিনি প্রায় ১৩ মাস (১৯৬৮-৬৯ সময়কালে) কারাভোগ করেন।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট কারাগার থেকে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পেলেও ওই বছরই তাকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এ সময় তিনি এলএলবি ডিগ্রি নেন। দুই দুই বছর বাদে ১৯৭১’এ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। প্রথমে মাদারীপুর এলাকার কমান্ডার পরে ২ নম্বর সেক্টরের সাব- কমান্ডার ও প্রশিক্ষণ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। চৌকস দক্ষতায় সামলেছেন মুজিবনগরের সশস্ত্রবাহিনীর সদর দপ্তরের স্টাফ অফিসারের দায়িত্বও। দেশ স্বাধীন হবার পর আবার সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। ১৯৭৫সালে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তাকে সেনাবাহিনী থেকে অকালে অবসর দেওয়া হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করা শওকত আলী বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সনদপ্রাপ্ত হন এবং ১৯৭৮ সালে সুপ্রীমকোর্ট বার এসোসিয়েশনের সদস্যপদ লাভ করেন। একই বছর তিন বছরের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য নির্বাচিত হন। এরই মধ্যে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগদান করেন এবং ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের হুইপ (বিরোধী দলের হুইপ) নির্বাচিত হন।

স্বৈরশাসক এরশাদের শাসনামলে তিনি প্রায় ১৬ মাস (মে, ১৯৮২ - সেপ্টেম্বর, ১৯৮৩) কারাবরণ করেন। এরপর ১৯৯১,১৯৯৬ ও ২০০১ জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৩ সালে বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময়ে তিনি আরো একবার কারাবন্দী হন।২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদে প্রথমে সদস্য ও পরে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি সাংসদ হয়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত এবং দেশের প্রতি তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মাদার তেরেসা গোল্ডমেডেল লাভ করেন। রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি কয়েকটি বইও লিখেছেন। তার প্রকাশিত বইয়ে মধ্যে রয়েছে- সত্য মামলা আগরতলা, ইংরেজিতে আর্মড কোয়েস্ট ফর ইনডিপেন্ডেন্স(Armed Quest for independence), কারাগারের ডায়েরি ও বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রাম ও আমার কিছু কথা।

কর্নেল শওকত আলী তার ‘সত্য মামলা আগরতলা’ বইয়ে লিখেছেন- ‘‘যারা মামলাটিতে অভিযুক্ত ছিলাম, ‘ষড়যন্ত্র’ শব্দটি তাঁদের জন্য খুবই পীড়াদায়ক। কারণ আমরা ষড়যন্ত্রকারী ছিলাম না। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সশস্ত্র পন্থায় বাংলাদেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে আমরা বঙ্গবন্ধুর সম্মতি নিয়ে একটি বিপ্লবী সংস্থা গঠন করেছিলাম। আমাদের পরিকল্পনা ছিল, একটি নির্দিষ্ট রাতে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ে আমরা বাঙালিরা বিভিন্ন গ্রুপে বিভিক্ত হয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সব কটি ক্যান্টনমেন্টে কমান্ডো স্টাইলে হামলা চালিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের অস্ত্র কেড়ে নেব, তাদের বন্দী করব এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করব।”

১৬ নভেম্বর, ২০২০ তারিখে বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর ০৯ মাস ২০ দিন। শরীয়তপুরের নড়িয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজসহ অসংখ্য শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ায় অবদান রেখেছেন গুণী এই মানুষটি। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের ইতিহাসের জীবন্ত এক সাক্ষীর দৈহিক প্রস্থান ঘটল।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

----------------------------------------------------------
তথ্য সূত্র:
১. https://web.archive.org/web/20110823073046/http://www.parliament.gov.bd/biography_deputyspeaker.pdf


২. দেশমাতৃকার অতন্দ্র প্রহরী ছিলেন কর্নেল (অব.) শওকত আলী- চ্যানেল টোয়েন্টিফোর

(https://youtu.be/Jvr3Yz3_k2s)

৩. https://www.banglanews24.com/national/news/bd/823908.details


৪. কর্নেল (অব.) শওকত আলী আর নেই- ডিবিসি নিউজ (https://youtu.be/JxR1iDsqGa0)
৫. https://bn.wikipedia.org/wiki/শওকত_আলী_(ডেপুটি_স্পিকার)

৬. সত্য মামলা আগরতলা, প্রথমা প্রকাশন, পৃষ্ঠা ০৮