ইরানে অস্থিরতার অন্তরালে  


ইত্তেফাক
Published: 2018-01-05 00:28:31 BdST | Updated: 2018-01-17 07:21:15 BdST

ইসলামি প্রজাতন্ত্রী ইরান নতুন বছরটা শুরু করেছে আন্দোলন আর অস্থিরতার মধ্য দিয়ে। ইরান আরব বিশ্বের একমাত্র শক্তিধর রাষ্ট্র যারা একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যের কায়েমী স্বার্থবাদী রাজা-বাদশাহ, আমীর-ওমরাহ এবং ইসরাইলি আগ্রাসনের মোকাবিলা করে যাচ্ছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও ইরান বিপদ-আপদের মধ্যে আছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার পর ইরানকে নিয়েই বেশি মাথা ঘামাচ্ছেন। দীর্ঘকাল ধরে অর্থনৈতিক অবরোধের মোকাবিলা করছে ইরান। কারণ পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হওয়ার চেষ্টা করছে তারা। সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামার আমলে অনেক জটিল-কুটিল কূটনীতি বাধা পেরিয়ে অবশেষে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

চুক্তি অনুযায়ী ইরান পারমাণবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ রাখবে। বিনিময়ে দেশটি ক্রমশ অর্থনৈতিক অবরোধ মুক্ত হবে। কিন্তু ইরান অবরোধ মুক্ত হওয়ার আগেই মার্কিন প্রশাসন কর্তৃক হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। ইরানি জনগণ অর্থনৈতিক দুরাবস্থার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে। ট্রাম্প মুসলমানদের প্রতি তার অনুসৃত বিদ্বেষনীতির কারণেই নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি সম্পাদিত চুক্তি নাকচ করবেন। যদিও এখন পর্যন্ত হম্বিতম্বি দিচ্ছেন। চুক্তি নাকচ করেননি। ইতোমধ্যে সৌদি রাজতন্ত্র মার্কিন স্বার্থের বিশ্বস্ত তাঁবেদার হওয়ার কারণে ট্রাম্পের বাড়তি সুবিধা হয়ে যায়। সৌদি-ইরান বিরোধ একটি ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার। শিয়া-সুন্নী গতানুগতিক বিরোধে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে যুবরাজ সালমান-বিন-মোহাম্মদের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে। উল্লেখ্য যে যুবরাজ এবং ট্রাম্পের জামাতা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন অনুঘটক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। একদিকে অবরুদ্ধ অর্থনীতি, অন্যদিকে চারদিকের ষড়যন্ত্রে ইরান কঠিন সময় অতিক্রম করছে।

এতদিন ধরে ইরান অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে একরকম নিরাপদেই ছিল। ১৯৭৯ সালে সফল ইসলামি বিপ্লবের পর ক্রমাগত ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করে স্থিতিশীলতা অর্জন করে ইরান। ২০০৯ সালে অবশ্য আরেকটি গণআন্দোলনের সূচনা ঘটে। তবে এবারের আন্দোলন তীব্রতর হচ্ছে। হুমকি, হামলা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করেও বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হচ্ছে ইরানের ইসলামি সরকার। ৩১ ডিসেম্বর বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের সময় অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছে বলে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে। এর আগের দিন দুইজন নিহত হয়। বিক্ষোভের চারদিনের মাথায় ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি জনগণের আন্দোলনের গণতান্ত্রিক অধিকারকে স্বীকার করে সহিংসতার নিন্দা করেন। তিনি বলেন, ‘এটা সবার কাছে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন, আমরা স্বাধীন।

সংবিধান এবং নাগরিক অধিকার অনুযায়ী, জনগণ তাদের সমালোচনা ও ক্ষোভ প্রকাশের ব্যাপারে স্বাধীন। তবে সমালোচনা ও ক্ষোভ প্রকাশের পন্থার দিকে আমাদের নজর রাখতে হবে। সমালোচনা ও ক্ষোভ প্রকাশ এমনভাবে হওয়া উচিত, যাতে করে তা জনগণ এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য সহায়ক হয়।’ সূচিত গণআন্দোলনকে প্রতিবেশীর শত্রুতা, ইসরাইলি চক্রান্ত এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল ইরানের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প টুইট করে বলেছেন, ইরানের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি মন্তব্য করেন যে, জবরদস্তিমূলক শাসন ব্যবস্থা চিরস্থায়ী নয়। এমন দিন আসছে, যখন ইরানের জনগণের সামনে পথ বেছে নেওয়ার মতো সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিবিসির খবরে বলা হয়, ইসরাইলের গোয়েন্দাবিষয়ক মন্ত্রী ইসরাইল কাতজ এক বিবৃতিতে ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে উত্সাহিত করেছেন। তবে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর কোনো নীতি ইসরাইলের নেই বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা ইরানি জনগণের সফলতাই কেবল আমি প্রত্যাশা করতে পারি।’

স্মরণ করা যেতে পারে যে, ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’ সারা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিধর গোয়েন্দা সংস্থা। এর সফলতা দাবি করে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এই সেদিন প্যারিসে বলেছেন যে, তাদের গোয়েন্দা সংস্থা ফ্রান্সসহ ইউরোপকে অনেক বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেছে। পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্রে অনেক ঘটনা ও দুর্ঘটনার জন্য মোসাদ এবং সিআইএকে দায়ী করা হয়। ইরানি কর্তৃপক্ষ বলেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে একাউন্টগুলো থেকে বিক্ষোভের জন্য উসকে দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর অধিকাংশই আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব এবং ইউরোপের বিভিন্ন এলাকা থেকে পোস্ট করা হচ্ছে। পৃথিবীর সব গোয়েন্দা সংস্থার একটি কৌশল এই, যে ব্যক্তি এজেন্ট হয়ে কাজ করছে, সেও জানে না যে কার স্বার্থে সে কাজ করছে। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ২ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো বিক্ষোভ সম্পর্কে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইরানের শত্রুরা সর্বাত্মকভাবে বিক্ষোভকারীদের সহায়তা করছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানী ট্রাম্পের সমালোচনা করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের যে ব্যক্তি আমাদের জনগণের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছেন, তিনি হয়তো ভুলে গেছেন কয়েক মাস আগে তিনি নিজে ইরানকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে মন্তব্য করেছিলেন।’ ট্রাম্পকে আগাগোড়া ইরানের শত্রু হিসেবে মন্তব্য করেন রুহানী। ইরানের সর্বস্তরের নেতৃত্ব চলমান আন্দোলনকে বিদেশী ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করছে।

তবে বাস্তবতা এই যে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক মন্দা দেশটিকে সংকটের মুখে নিক্ষেপ করেছে। দীর্ঘকাল ধরে জাতিসংঘ তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নানামুখী অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে দেশটির অর্থনীতি বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, খাদ্যশস্যের স্বল্পতা, বেকারত্ব জনগণের ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও করছে। বিক্ষোভ ক্রমশ সহিংস হয়ে উঠছে। বিক্ষোভকারীরা সরকারপন্থী বাসিজ মিলিশিয়াদের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করছে। তারা পুলিশের মোটরযান জ্বালিয়ে দিচ্ছে।

তেহরানে একটি মিলনায়তনে অগ্নিসংযোগ করেছে বিক্ষোভকারীরা। গত ২ জানুয়ারি বিবিসির খবরে বলা হয়, এ পর্যন্ত ৪১টি শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এসব শহরে বিক্ষোভকারীরা ব্যাংক ও পৌর কার্যালয়ে হামলা করছে। রেভল্যুশনারী গার্ড বাহিনীর কমাণ্ডার ব্রিগেডিয়ার ইসমাইল কাউসারী অভিযোগ করেছেন, বিক্ষোভকারীরা শুধু দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধেই স্নোগান দিচ্ছে না— তারা রাজনৈতিক স্লোগানও দিচ্ছে এবং সরকারি ভবনে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বিক্ষোভকারীরা যদি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদেই রাস্তায় নামতো তাহলে তারা সরকারবিরোধী স্লোগান দিতো না। বিক্ষোভের মুখে এক পর্যায়ে মোবাইল ফোন ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এর পরও রাস্তায় নামে হাজার হাজার মানুষ। তাদের ওপর গুলি চালায় পুলিশ। এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯। সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হলেও ক্ষমতাসীন ধর্মীয় নেতারা অন্যতম টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েকটি শহরে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামিনির পদচ্যুতি কিংবা নিপাতের দাবিতে স্লোগান দেওয়া হয়েছে। এই শীর্ষ ধর্মীয় নেতার ছবিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে বলেও খবর দেওয়া হয়েছে। পাশ্চাত্যের এই সংবাদ মাধ্যমগুলো অবশ্য অনেক সময় উদ্দেশ্যমূলকভাবে খবর প্রচার করে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বিক্ষোভ হয়েছে বিভিন্ন শহরে।

সরকার বিরোধি আন্দোলন 

দিন দিন বিক্ষোভের মাত্রা আরও বাড়ছে। এই অবস্থায় দেশের রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী প্রধান হুমকি দিয়েছেন, এভাবে আন্দোলন চলতেই থাকলে তা শক্ত হাতে দমন করা হবে। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পেছনে বিদেশি শক্তির ইন্ধন রয়েছে। ওদিকে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ইরানি মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী শিরিন এবাদী বলেছেন, ইরানে চলমান বিক্ষোভ বড় ধরনের আন্দোলনের সূচনা মাত্র। প্রেসিডেন্ট রুহানির হুঁশিয়ারির পরও তেহরানের ইং হেলেব স্কয়ারে বিক্ষোভ চলছে। বিক্ষোভকারীদের হটাতে পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস ও জল কামান ব্যবহার করেছে। পশ্চিম অঞ্চলের কেরমান শাহ ও খোরামাবাদ, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর শাহানশাহ এবং উত্তরাঞ্চলীয় ঝানজান শহরেও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে।

ইরান পৃথিবীর প্রাচীন জনপদের একটি। ইরানের পূর্ব নাম পারস্য। ইতিহাসে পারস্য সাম্রাজ্যের এবং ফার্সি ভাষার সমৃদ্ধ অতীত রয়েছে। ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। সেখানে ইসলাম একটি স্বতন্ত্র সভ্যতা ও সংস্কৃতি নির্মাণ করে। মুসলিম শাসনের এক পর্যায়ে এখানে শিয়া মতবাদের প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। ইরান পৃথিবীর মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র শিয়াশাসিত রাষ্ট্র। শিয়াদের কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্রটির ভাঙাগড়ায় ব্যাপক অবদান রেখেছে। দীর্ঘকাল ধরে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত থাকার পর ১৯৭৯ সালে ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে একটি গণবিপ্লব ঘটে। এতে স্বৈরশাসক রেজা শাহ পাহালভীর পতন ঘটে। সেই থেকে এ পর্যন্ত এই দেশটি নানা সংঘাত ও যুদ্ধের মোকাবিলা করে শক্তভাবেই টিকে আছে।

স্নায়ুযুদ্ধের পর একক মার্কিন আধিপত্যে ইরান সংগ্রামমুখর দিনকাল অতিক্রম করে। অব্যাহত প্রতিবাদী শক্তি হিসেবে ইরানের মর্যাদা এক রকম সুপ্রতিষ্ঠিত। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, অরাজকতা এবং আন্দোলন দ্বারা এর স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন করা সম্ভব হবে এমনটা মনে হচ্ছে না। কারণ আন্দোলনকারীদের দৃশ্যত কোনো শক্তিশালী সংগঠন ও নেতা নেই। তা সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীদের দাবিকে আমলে নিয়ে ইরানের নেতাদের উচিত বহিঃশক্তিকে কোনো সুযোগ না দেওয়া। চারদিকের ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করে ইরান তার জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করবে এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা।

ড. আবদুল লতিফ মাসুম, লেখক :অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ,

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বিডিবিএস 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।