মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর দীক্ষা


গোলাম রাব্বানী
Published: 2018-01-06 15:19:01 BdST | Updated: 2018-06-19 07:09:14 BdST

আমাদের বাবা-মা ১ম জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। জন্মের পর সন্তানকে মনের মত গড়ে তুলতে চায়, তাদের ঘিরে তারা স্বপ্ন দেখে। গড়পড়তা বাবা-মা শিখায় কিভাবে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ল-ইয়ার, বিসিএস ক্যাডার এসব হতে হবে। আর 'এক্সক্লুসিভ প্যারেন্টস' শিখায়, কিভাবে মানুষ হতে হয়, সত্যকার মানুষ। আমি ভাগ্যবান, আদর্শলিপি হাতে দিয়েই আব্বু-আম্মু মানুষ হবার, মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াবার দীক্ষা দিয়েছেন।

চলার পথে আমাদের জীবনে এমন কিছু ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়, এমন অভিজ্ঞতার স্বাদ মেলে, যা স্মৃতির মানসপটে আমৃত্যু সমুজ্জ্বল থাকে। ছোট্ট জীবনে তেমন কিছু অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে আমারও যেতে হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে আমার কি করা উচিত সেটা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, মানুষ হবার সেই দীক্ষাটুকু!

অনেক আগের ঘটনা। ২০০৩ সাল, আমি রাজউক কলেজের দশম শ্রেনীর ছাত্র। আমি আর ক্লাশমেট বন্ধু Raihan Farabi একই ভবনে থাকতাম, ৪ নং সেক্টর রেল ক্রসিং পরবর্তী কাচাঁবাজার সংলগ্ন মুক্তিযোদ্ধা স্মরণী সড়কে। সকাল ৭.৩০, দুই বন্ধু রিক্সাযোগে কলেজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম, ব্রাকমার্কেট রেলক্রসিং এর সিগনালে থামার সংকেত, রিক্সার সামনে লোহার বার পরলো, ট্রেন আসছে। এখানে পাশাপাশি দুটি রেললাইন, ট্রেন আসছে ২য় লাইনে। আমাদের রিক্সার বামপাশ দিয়ে আমাদের বয়সী একটি ছেলে বার এর ভিতর দিয়ে ১ম লাইন পার হয়ে দুই লাইনের মাঝে দাঁড়ালো। হাতে টিফিন ক্যারিয়ার, পোষাক আর তাড়াহুড়ো দেখে বোঝা গেলো কোন গার্মেন্টস বা দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করে, দেরি হয়ে যাচ্ছে বলেই ভিতরে দাঁড়িয়েছে, যেন ট্রেন চলে গেলেই পার হয়ে যেতে পারে!

কিন্তু বিধি বাম! ২য় লাইনের ট্রেন যাবার আগেই ১ম লাইনে দ্রুতগতির আরেকটি ট্রেন ধেয়ে আসছে। দুই লাইনের মাঝে পড়ার আশংকায় ছেলেটি লাফ দিয়ে ফিরে আসতে চাইলো, পারলো নাহ! ট্রেনের আঘাতে ছিটকে পড়লো ১২-১৫ হাত দূরে! মুহুর্তেই হাজারো উৎসুক জনতা ঘিরে ধরলো ছেলেটির নিথর দেহটাকে। আমি রিক্সা থেকে নেমে দৌড়ে গেলাম, ভিড় ঠেলে ছেলেটির উপর চোখ পড়তেই আঁতকে উঠলাম, পুরো শরীরটা প্রচণ্ড ঝাঁকি খেলো। ওর মাথায় কপালেরবাম দিক দিক থেকে ৮-১০ ইঞ্চি ফেটে দু'ভাগ হয়ে গেছে। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে আর ফাঁক দিয়ে ভিতরের ঘিলু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে! ভয়ানক এ দৃশ্য দেখে নিজেরই বমি চলে আসলো, মুহুর্তেই নিজেলে সামলে ভীড়ের ভিতরে গেলাম। হাঁটি গেড়ে বসে চিৎকার করে সাহায্য চাইলাম, "ভাই কেউ ধরেন, ও এখনো বেঁচে আছে। হাসপাতালে নিতে হবে!" কেউ এগিয়ে এলো না, ট্রেন এক্সিডেন্ট এর রোগী, আবার মাথার ঘিলু বেরিয়ে যাচ্ছে, এ রোগী বাচঁবে না, বিড়বিড় করে একে একে সবাই চলে যেতে লাগলো।

কি করবো, কিভাবে তাকে হাসপাতালে নিবো কিছুই মাথায় আসছিলো না। সহসা দৌড়ে গিয়ে আমাদের রিক্সাওয়ালা চাচার কাঁধে ঝোলানো গামছাটা নিলাম। এক হাত নিচে দিয়ে আস্তে করে গামছা দিয়ে ছেলেটির মাথাটা পেঁচিয়ে বাঁধলাম, খুব সাবধানে একাই কোলে তুলে নিয়ে রিক্সায় উঠলাম। উদ্দেশ্যে আমাদের কলেজের পিছনের 'আইচি হাসপাতাম', ফারাবি নিষেধ করলো অহেতুক ঝামেলায় না জড়াতে, মন কিছুতেই সায় দিলো না। ওকে বললাম আম্মুর কাছে যাও, বাসায় সেজো মামা আছে, ৫ হাজার টাকা নিয়ে আইচি হাসপাতালে আসতে বলো।

রিক্সায় উঠে টান দিতেই ছেলেটি বমি করলো। মাথায় গুরুতর আঘাত লাগা রোগীর বমি করা ভালো লক্ষণ না এটা আমার জানা ছিলো। মনে মনে শুধু আল্লাহ্‌কে ঢাকছিলাম। হাতপাতালে যখন নামলাম, আমার কলেজের সাদা শার্ট রক্ত-বমিতে একাকার। ছেলেটিকে স্ট্রেচারে রেখেই দৌড়ে ডাক্তার ডেকে আনলাম। অনুনয় করে বললাম, ওকে বাঁচান প্লিজ! ঘটনারর বিবরণ শুনে আর ও আমার সম্পর্কে কিছুই হয় না জেনে, ডাক্তার খুব অবাক হয়ে তাকালো। অনেক অনুরোধের পর গামছা খুলে ক্ষত দেখে ডাক্তার সোজা বলে দিলো, "এই রোগী ১০ মিনিট এর বেশি বাঁচবে না। তুমি বাচ্চা ছেলে, অযথা বিপদে পড়বে, উত্তরা থানায় ফোন দাও। পুলিশ এসে লাশ নিয়ে যাবে!" ডাক্তারের কথা শুনে রাগে-ক্ষোভে আমি চিৎকার করে ওর গুষ্টি উদ্ধার করা শুরু করলাম। ওয়ার্ড বয়রা আমাকে ভালোভাবেই চিনতো। ওদের বুঝিয়ে ডাক্তারকে রাজি করালাম ওটি'তে নিতে। ৫ মিনিট পর আমার ডাক পড়লো সেখানে। সাফ জানিয়ে দিলো, তারা রিক্স নিবে না, ক্ষতের চারপাশ পরিষ্কার করে ভালোমতো ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে, অতিসত্বর ঢাকা মেডিকেল নিতে হবে!

আমি এর আগে কোনদিন ঢাকা মেডিকেল যাই নাই, চিনিও না। আমি একা কিভাবে কি করবো ভেবে আমি মাটিতে বসে কাঁদছি। আমাকে দেখে আরেক ক্লাশমেট বন্ধু রুবেল দৌড়ে এলো। রুবেলকে দেখে যেন প্রাণ ফিরে পেলাম! উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, "সব পরে বলবো। আগে টেম্পু ডাক দে, ঢাকা মেডিকেল যেতে হবে।" বন্ধু আমার দারুণ সাহসী ও মানবিক। সাথে সাথে রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে টেম্পু থামালো। ছেলেটিকে কোলে তুলে রুবেলকে নিয়ে ছুটলাম ঢাকা মেডিকেলে। পুরো পথটা যে কিভাবে গেছি, ভেবে এখনই আমার গায়ের পশম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। আরো দুইবার বমি করলো আমার গায়ের উপরই, ৫/৬ টা সিগনাল পড়লো, আগ মুহুর্তে রুবেল দৌড়ে ট্রাফিক পুলিশকে বুঝিয়ে আমাদের নির্বিঘ্ন পার করার ব্যবস্থা করলো। পুরো পথ ছেলেটি আমার কোলে। নিথর দেহ, বেঁচে আছে কিনা তাও জানিনা। কেবল আল্লাহ্‌কে ডাকছি!

ঢাকা মেডিকেল পৌছে টেম্পো ভাড়া দেয়ার টাকা ছিলো না। কলেজ ছুটির পর বন্ধুরা মিলে ঘুরতে যেতাম বলে ব্যাগে এক্সট্রা শার্ট থাকতো। অগত্যা টেম্পুওয়ালাকে ভাড়ার বদলে আম্মুর কিনে দেয়া পছন্দের শার্টটাই দিয়ে দিলাম। মেডিকেলে ঢুকে হন্তদন্ত ঘুরছি, কিভাবে কি করবো, একজন রোগীর অবস্থা দেখে বললো তাড়াতাড়ি টিকিট কেটে জরুরী বিভাগে নিতে। ৫ টাকা দিয়ে টিকিট কাটলাম। কোন বেড নাই, স্ট্রেচারও পেলাম না। ওয়ার্ড বয় খালি ফ্লোরে ফেলে রাখে ডাক্তার ডাকতে গেলো। একজন আয়াকে পকেটে থাকা সর্বশেষ ১০ টাকা দিয়ে একটি ফোমের ব্যবস্থা করা হলো। ডাক্তার আসতেই আমি তার পা জড়িয়ে ধরলাম, "প্লিজ স্যার, থানা পুলিশের কথা বলবেন না, আগে ওকে বাঁচান।" সব শুনে ডাক্তারের মন গললো, নার্সকে দ্রুত দুই ইনজেকশন আনতে বললো। ইনজেকশন পুশ করে একটি স্ট্রেচার ম্যানেজ করে ডাক্তার এর কথা মতো সিটি স্ক্যান এর রুমের দিকে রওয়ানা হলাম। আল্লাহ্‌র কি লীলা, এর মাঝেই ছেলেটির জ্ঞান ফিরলো, একটু চোখ মেলে তাকালো। কানের কাছে মুখ নিয়ে নাম জানতে চাইলাম, বিড়বিড় করে বললো, মিল্লাত। কই থাকো? লন্ডন কথাটা বলেই ফের জ্ঞান হারালো।

আমার মস্তিষ্ক দ্রুত খেলা করছে। যেহেতু হাতে টিফিন ক্যারিয়ার ছিলো আর তাড়াহুড়ো করছিলো। মিল্লাত নিশ্চয় উত্তরা,আজমপুর সংলগ্ন লন্ডন প্লাজার কোথাও কাজ করে! এর মাঝেই দেখলাম, সেজো মামা আইচি থেকে খবর পেয়ে ঢাকা মেডিকেল চলে এসেছে। ডাক্তারকে বললাম, মামা আছে, অপারেশন শুরু করেন। সব টাকা আমরা দেবো। ডাক্তার সায় দিলোলো। মামা আর রুবেলকে মিল্লাত এর সাথে রেখে আমি আবার উত্তরা ফিরলাম। লন্ডন প্লাজার সামনে নেমে ভিতরে ঢুকে উদভ্রান্তের মতো এদিকওদিক ছুটছিলাম। আমার সারা শরীরে রক্ত,সবাই উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখছিলো।

কাকলালীয়ভাবে এর মধ্যেই নিচতলার ২য় সারিতে কুকারিজ এর দোকানে ছেলের দিকে চোখ পড়লো, যার সাথে মিল্লাতের চেহারার মিল আছে। দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার মিল্লাত নামে কোন ভাই আছে? ও বললো "জি আছে, কিন্তু ও আজকে কাজে আসে নাই। আমরা পাঁচ ভাই এখানে কাজ করি।" "আমার সাথে চলো, তোমার ভাই এক্সিডেন্ট করেছে। ঢাকা মেডিকেলে আছে।" ও শুনে দৌড়ে গিয়ে দোকানের মালিক পাপ্পু ভাই আর অন্য ভাইদের খবর দিলো। আমরা মালিকের গাড়িকে করেই ঢাকা মেডিকেল পৌঁছালাম। মিল্লাতের অপারেশন চলছিলো। এরপর রাতভর আরো দুইদফা আপারেশন! সব খরচ দোকানের মালিক বহন করলেন।

আল্লাহ্‌র অশেষ রহমতে ডাক্তাররা সফল হলো ওকে বাঁচাতে। এও জানালো, "এই ধরনের হেড ইনজুরির রোগী এত লং টাইম সারভাইব করে না, আর এমন ক্রিটিক্যাল সিচুয়েশনে ৯০% ক্ষেত্রেই রোগী বাঁচে না।"
ঐ মুহুর্তে ঠিক কেমন অনুভূতি হচ্ছিল তা ভাষায় প্রকাশ্য নয়! বুকের উপর চেপে বসা একটা পাথর যেন নেমে গেলো, চোখে আনন্দের অশ্রু। মন থেকে বিশ্বাস হলো, সৃষ্টকর্তা আছেন। যিনি নিজ হাতে এই অধমকে উসিলা করে মিল্লাতকে বাঁচিয়েছেন।

মিল্লাত এরপর বিয়ে করেছে, এখন দুই সন্তানের জনক। এখনো লন্ডন প্লাজার নিচলার সেই কুকারিজের দোকানেই কাজ করে। উত্তরা গেলেই চেষ্টা করি ওকে দেখে আসতে। কেউ লন্ডন প্লাজায় গেলে মিল্লাতকে দেখে আসতে পারেন। "রাখে আল্লাহ্‌, মারে কে" প্রবাদটির জলজ্যান্ত উদাহরণ আমাদের মৃত্যুঞ্জয়ী মিল্লাত। দোয়া করি, আল্লাহ্‌ যেন ওকে শতবর্ষ নেক হায়াত দান করেন। 

লিখেছেন মানবিক ছাত্রনেতা গোলাম রাব্বানী 

শিক্ষা ও পাঠচক্র বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ 

 

বিডিবিএস 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।