মনুষ্যত্বেও জিপিএ-৫ অর্জন করতে হবে


আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ যুবায়ের
Published: 2018-01-06 17:43:38 BdST | Updated: 2018-09-24 10:40:00 BdST

ত্রিশে ডিসেম্বর ২০১৭ জেডিসি, জেএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী অনুষ্ঠিত জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ২৪ লাখ ৮২ হাজার ৩৪২ জন শিশু পরীক্ষার্থী।

জেএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৭৯ এবং জেডিসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭ হাজার ২৩১ জন। উভয় পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৯১ হাজার ৬১০ জন।

এভাবে প্রতি বছর এইচএসসি, এসএসসি, জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় বেশ কয়েক লক্ষ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাচ্ছে। বর্তমানে যেহেতু স্নাতক ও উচ্চতর পড়াশোনায় গ্রেডিং পদ্ধতি ব্যবহার হচ্ছে— সে হিসাব করলে অসংখ্য শিক্ষার্থী প্রতি বছর জিপিএ-৫ ফলাফল অর্জন করছেন বোর্ড বা নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

এখন আমার জিজ্ঞাসা হচ্ছে— পড়াশোনায় তো অসংখ্য জিপিএ-৫ পাচ্ছে কিন্তু মানুষ হিসেবে বা মনুষ্যত্বে ক’জন জিপিএ-৫ পাচ্ছে আমাদের দেশে?

এ প্রশ্নের উত্তরে অধিকাংশ মানুষই বলবেন— খুব কম। কারণ প্রতি বছর যে হারে জিপিএ-৫-এর সনদ পাচ্ছে সে হারে যদি মনুষ্যত্বে জিপিএ-৫ আমি পেতাম বা অন্যরা পেত তাহলে আজ দেশটা ভূস্বর্গে পরিণত হয়ে যেত।

আজ যদি উপর থেকে নিচ পর্যন্ত যেকোনো ক্ষেত্রে যাই সবখানে অন্যায়-অবিচার দেখতে পাই। এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে সবাই সত্ ও গুণী মানুষ।

চাকরি পেতে হলে ঘুষ না হয় লবিং। কোনো ব্যবসা, শিক্ষা বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন পেতে হলে ঘুষ দিতে হবে না হয় লবিং বা ক্ষমতা থাকতে হবে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসহ সব জিনিসে ভেজাল। কারণে-অকারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি তো আছেই। চলছে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, দুর্নীতি, গুম, খুন, অপহরণ, দেশের সম্পদ লোপাটসহ নানান তেলেসমাতি। সব স্থানে হয়রানি।

উপরে উপরের লেভেলের কথা বলেছি। এবার যদি নিচে তাকাই— সিএনজি ড্রাইভার তার মনমতো চলছে, মুদি দোকান, বাসের ড্রাইভার-হেল্পারসহ সবখানে অবিশ্বাস্য খারাপ আচরণ। এমনকি যারা দেশকে এগিয়ে নেবার জন্য উবার, পাঠাও ইত্যাদি সার্ভিস চালু করেছেন সেই উবার ও পাঠাও এর চালকদের আচরণ দেখলে এবং তাঁদের কথা শুনলে মনে হয়, যেন আমিই মহাঅপরাধী, তাঁরা সাধু। সবখানে যে যেভাবে পারছে অন্যদের জিম্মি করছে, ধোঁকা দিচ্ছে, প্রতারণা করছে। এসবই চলছে সবখানে।

সদ্যপ্রয়াত ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক ঢাকা উত্তরের রাস্তায় রাস্তায় ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করেছিলেন, আজ কোনো ডাস্টবিনই দেখা যায় না। কোথায় গেল এত ডাস্টবিন? কোনো একজন সাংবাদিকের প্রতিবেদনে দেখলাম— সেসব নাকি এখন কিছু কিছু মানুষ চাল রাখার পাত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন!

হায় সেলুকাস!

উপরে যত অন্যায় অনাচারের কথা উল্লেখ করলাম, এসব কাজ কারা করছে, ভিন্ন জগত্ থেকে আসা কোনো প্রাণী নাকি আমি এবং আমরাই?

উত্তর আসবে— আমি এবং আমরাই। কারণ আমরা পড়াশোনায় জিপিএ-৫ পেতে শিখেছি কিন্তু মনুষ্যত্বে নয়। মনুষ্যত্বেও জিপিএ-৫ যে পেতে হয় তা আমরা ভুলেই গিয়েছি।

মনে পড়ছে একজনের কথা। তিনি গ্রাম থেকে মেধার কারণে আজ দেশের অন্যতম বিদ্যাপীঠে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন বা করছেন। তার মেধা আছে এটা সত্য। কিন্তু তার কাছে আমি কখনই ভালো আচরণ পাইনি। এসব মেধাবীরাই দেশের বড় বড় ক্ষেত্রের হাল ধরছেন, অমানবিক ব্যবহার করছেন, অন্যায় জোর দেখাচ্ছেন। এক স্থানে মানুষ অন্যায়ের শিকার হয়ে সে অন্যায়কে দূর না করে সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সে অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এভাবে এক অন্যায় কোটি অন্যায়ের জন্ম দিচ্ছে। অন্যায়ে অন্যায়ে নাস্তানাবুদ হচ্ছি আমরা সবাই। অথচ জায়গামত অন্যায় বন্ধ হলেই সব স্থানে অন্যায় কিন্তু বন্ধ হয়ে যায়।

তাহলে সে জায়গাটা কী? হুম, সেটা বুঝতে হলেই মনুষ্যত্বে জিপিএ-৫ পেতে হবে। পড়াশোনার জিপিএ-৫ দিয়ে আসল জায়গা বোঝা বড় দায়।

আমরা কোনো পরীক্ষায় জিপিএ-৫ না পেলে দুঃখ করি, কেউ কেউ তো আত্মহত্যাও করেন। কিন্তু আমি এবং আমরা যে প্রতিদিন মনুষ্যত্বে ফেল করছি— এজন্য কি কোনোদিন দুঃখ করেছি, কান্না করেছি বা অনুশোচনা?

পড়াশোনার জিপিএ-৫এর গল্প একসময় কেউ জিজ্ঞেস করবে না বা করে না কিন্তু মনুষ্যত্বের জিপিএ-৫ যারা অর্জন করতে পেরেছেন তাদের গল্প সবার মুখে মুখে ছিল, আছে, থাকবে।

আসুন, মনুষ্যত্বেও জিপিএ-৫ অর্জন করি।

লেখক : এম ফিল গবেষক, ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি

ইমেইল: [email protected]

এইচজে/ ০৬ জানুয়ারি ২০১৮

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।