স্বপ্নের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়


জিয়া আহমেদ
Published: 2018-02-12 16:02:04 BdST | Updated: 2018-08-15 09:32:32 BdST

১৯৮৬ সিলেট এবং দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিচর্চা এগিয়ে নেওয়ার জন্য অনন্য এক সাল। কারণ ১৯৮৬ সালে ২৫ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাবিপ্রবি। হাঁটি হাঁটি পা পা করে ২৭ বছর অতিক্রম করলো শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

শৈশব, কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পর্দাপন করে সে তার আলোকোজ্জ্বল দীপ্তি ছড়াচ্ছে দেশ-বিদেশে। ১৯৯১ এর ১৩ ফেব্রুয়ারি মাত্র তিনটি বিভাগ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় তার একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করে, বর্তমানে ৬টি অনুষদের অধীনে রয়েছে ২৮টি বিভাগ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যে স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপিত হয়েছিল, তার অর্জনের পাশাপাশি কিছু অস্বস্থিকর ইতিহাস রয়েছে, যা কলঙ্কিত করেছে ৩২০ একরের পবিত্রভূমি। সে তার ক্ষত চিহ্ন বেশিদিন স্থায়ী হতে দেয়নি, এগিয়ে যাচ্ছে বীরদর্পে।

২৭ বছরে অসংখ্য ও অগণিত অর্জন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের, যা কেবল দেশব্যাপী নয় সুনাম কুড়িয়েছে আন্তর্জাতিক পরিসরেও। দেশে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম কিনতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো, এই বিশ্ববিদ্যালয় দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে ভর্তি প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, সুন্দর, নির্ভেজাল ও সহজতর করা যায়। মোবাইলে ভর্তি প্রক্রিয়া উদ্ভাবন ও চিন্তা এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই প্রথম। এখন দেশের প্রায় সবকয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোবাইলে ভর্তি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থী কিংবা অভিভাবকের যেমন মূল্যবান সময় বেঁচেছে, তেমনি ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে না। অনেকেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন।

সবুজে ঘেরা শাবিপ্রবি 

আমরা যখন জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে গভীর চিন্তা ও উদ্বেগ প্রকাশ করছি, তখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় মেধাবী মুখ দেখিয়েছে কীভাবে নিরাপত্তা প্রক্রিয়া সুরক্ষিত ও সুনিশ্চিত করা যায়, কম খরচে কীভাবে ড্রোন আবিষ্কার করা যায়- বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল মেধাবী ছাত্র তা করে দেখিয়েছে। এবং তাদের উদ্ভাবিত ড্রোন যখন দেশের জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে ব্যবহৃত হয়, এর চেয়ে তৃপ্তির কিংবা আনন্দের আর কি আছে।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ও বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তার ল্যাবরেটরিতে আবিষ্কার করেছেন কীভাবে স্বল্পমূল্যে ক্যানসার রোগ শনাক্ত করা যায়। যে জীবননাশকারী মরণব্যাধী ক্যানসার শনাক্ত করতে মানুষের সময় ও অর্থ দু’টিই ব্যয় হতো, তা খুব সহজেই এখন শনাক্ত করা যাবে। পিপিলিকা নামক সার্চ ইঞ্জিনের নাম যখনই আসে তখনই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় মেধাবী তরুণের চেহারা চোখের সামনেই ভেসে ওঠে।

২৭ বছরে আমাদের আত্মতৃপ্তি যেমন আছে, তেমনিই আছে অপূর্ণতা। একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সুযোগ-সুবিধা ও বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার তার অনেকাংশ থেকে আমরা বঞ্চিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ও গুরুতর যে সমস্যা তা হলো আবাসন সংকট। ২৭ বছরেও এই সমস্যার সমাধান হয়নি। শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক হল খুবই অপ্রতুল, যেখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ ছাত্র-ছাত্রী আসে মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে, যাদের অনেকেরই মেসে থাকার সাধ্য নেই। ছেলেদের ৩টি হলের মধ্যে একটি হল অপূর্ণাঙ্গ এবং মেয়েদের ২টি হল আছে, যা খুবই অপ্রতুল।
আবাসন সমস্যার পর আরেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো একাডেমিক বিল্ডিংয়ের স্বল্পতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেবর যেহেতু বাড়ছে, সে তুলনায় একাডেমিক বিল্ডিং সংখ্যা বাড়ছে না। গবেষণাধর্মী কাজের জন্য বেশি সংখ্যক গবেষণাগার ও ক্লাসরুম দরকার। আর দরকার কলা ও মানবিকী, অ্যাপ্লায়েড সায়েন্স ও ফিজিক্যাল সায়েন্সসহ আলাদা আলাদা ফ্যাকাল্টি বিল্ডিং। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোপরি যে সমস্যা সবচেয়ে ভয়াবহ তা হলো শিক্ষক ও ছাত্রদের জন্য খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা না থাকা।

শাবিতে প্রবেশপথ 

একটি নামমাত্র ক্যাফেটেরিয়া, ভাঙা ক্যান্টিন ও খুপড়ি টং দিয়ে খুঁড়িয়ে চলছে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো খাবারের জন্য শিক্ষক-ছাত্রদের যেতে হয় প্রধান ফটক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরও দূরের শহরে। দরকার শিক্ষক লাউঞ্জ ও অত্যাধুনিক ক্যান্টিন, যেখানে সুলভমূল্যে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাদের খাবার খেতে পারবেন। বর্তমানে শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ৪শ’র বেশি, যেখানে আবাসনের সুযোগ রয়েছে ১শরও কম। শিক্ষকদের জন্য দরকার ডরমেটরি ও পর্যাপ্ত সংখ্যক কোয়ার্টার।

সর্বোপরি নতুন ভাইস-চ্যান্সেলর চেষ্টা করছেন বিশ্ববিদ্যালয়কে সার্বিকভাবে এগিয়ে নিতে। এর জন্য তিনি নিরলস পরিশ্রম করছেন। তারই কর্মযাত্রা এগিয়ে নেওয়ার জন্য যে জিনিস সবচেয়ে বেশি দরকার তা হলো অর্থ। সরকারের সদিচ্ছাই পারে আমাদের শাবিপ্রবিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের জন্য কম করে হলেও ৫শ কোটি টাকার দরকার। সরকার সচেষ্ট হলে এই টাকার যোগান দিতে খুব বেশি সময় লাগবে না। যা দিয়ে আরও বেশি সংখ্যক গবেষণাগার, একাডেমিক বিল্ডিং, ছাত্র-ছাত্রী হল, শিক্ষক ডরমেটরি, শিক্ষক লাউঞ্জের কাজ সম্পন্ন হতে পারে।

৩২০ একরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত ক্যাম্পাস শাবিপ্রবিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। শুভ জন্মদিন শাবিপ্রবি, অনন্ত যৌবনা হয়ে তোমার আলোকরশ্মি ছড়িয়ে পড়ুক দেশ-বিদেশে।

জিয়া আহমেদ
প্রভাষক, জিওগ্রাফি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগ
শাবিপ্রবি, সিলেট।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।