কোটাপ্রথার সাংবিধানিক বিশ্লেষণ


আবরারুল হক
Published: 2018-03-02 01:08:27 BdST | Updated: 2018-06-18 19:43:58 BdST

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সংবিধান সমূহের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান। এই সংবিধান স্বাধীন বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংবিধান এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন। চলুন, দেখে আসি, কোটা আমাদের সংবিধানের মানদণ্ডে কতটুকু প্রাসঙ্গিক?

প্রথমে, সংবিধানের প্রস্তাবনা দিয়েই বিশ্লেষণ শুরু করতেছি। প্রস্তাবনার দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে যে, "আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল-জাতিয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।"

এখানে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হচ্ছে, জাতিয়তাবাদ বা দেশের জন্য সর্বোচ্চ ভালোবসা তথা ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এই দেশের সর্বস্তরের মানুষের জন্য ভালোবাসা এই সংবিধানের মূলনীতি। গণতন্ত্র সমান অধিকারের কথা বলে, সমাজতন্ত্র সাম্যের কথা বলে। উল্লেখিত নীতিসমূহ সব ধরনের বৈষম্যের বিরূদ্ধে। তাই, এই সব নীতি প্রতিষ্ঠার জন্যই বাংলার বীর জনগণ জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

তৃতীয় অংশে আরো বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা-যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।

এই অংশে প্রত্যেকটা শব্দ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সমাজের সব ধরনের বিদ্যমান বৈষম্য দূর করতে হয়। বিধায়, সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এই সংবিধানের মূল লক্ষ্য। মৌলিক মানবাধিকারের মধ্যে চাকরির অধিকারও অন্তর্ভুক্ত। রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজের সর্বক্ষেত্রে সাম্য এবং সুবিচার নিশ্চিত করার জন্যও বৈষম্য দূর করা অনিবার্য। আর অযৌক্তিক কোটাপদ্ধতি হল অগ্রহণযোগ্য বৈষম্য।

চতুর্থ অংশে বলা হয়েছে যে আমরা স্বাধীন সত্তায় সমৃদ্ধি লাভ করে এবং মানবজাতির প্রগতিশীল আশা আকাঙ্ক্ষার সহিত সঙ্গতি রক্ষা করে আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে পূর্ণ ভূমিকা পালন করার জন্য বাংলাদেশের জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তিস্বরুপ এই "সংবিধানের প্রাধান্য" অক্ষুণ্ণ রাখা এবং ইহার রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তাবিধান আমাদের প্রবিত্র কর্তব্য।

সুতরাং, সংবিধান যে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন "সংবিধানের প্রাধান্য" বলে সেটার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। সেটি প্রতিধ্বনি হয়েছে, সুস্পষ্টভাবে অনুচ্ছেদ ৭(২)-এ বলা হয়েছে যে, জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান "প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন"। সাথে একটি সূত্র ও বলা হয়েছে যে, "অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসমঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে"।

এই সংবিধানের আওতাধীন হওয়ার জন্য আমাদেরকে এই দেশের নাগরিক হতে হবে। অনুচ্ছেদ ৬ অনুযায়ী আমরা নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশি। সুতরাং আমরা সংবিধানের আওতাধীন এবং সংবিধানে উল্লেখিত সব অধিকার এবং স্বাধীনতা ভোগ করার অধিকার আমাদের রয়েছে।

এখন চলুন, সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগ তথা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সমূহ একটু ব্যবচ্ছেদ করে দেখি।

অনুচ্ছেদ ৮(১) অনুযায়ী জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা-এই নীতিসমূহ এবং এই নীতিসমূহ হইতে উদ্ভূত এই ভাগে বর্ণিত অন্য সকল নীতি হল রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি। এই সব নীতিসমূহ কোন ধরনের বৈষম্যকে সমর্থন করে না, আর এই মূলনীতি সমূহ অনুচ্ছেদ ৮(২) অনুযায়ী বাংলাদেশ পরিচালনার মূলসূত্র, আইন প্রণয়নকালে রাষ্ট্র তাহা প্রয়োগ করিবেন। আরো বলা হয়েছে যে, নীতিসমূহ এই সংবিধান এবং বাংলাদেশের অন্যান্য আইনের ব্যাখা দানের ক্ষেত্রে নির্দেশক হইবে এবং তাহা রাষ্ট্র ও নাগরিকের কার্যের ভিত্তি হইবে, তবে এই সকল নীতি আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য হইবে না।

Quota Desparity 

অধিকন্তু, অনুচ্ছেদ ১০-এ শোষণমুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার কথা বলা হয়েছে যেটি রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। বৈষম্য হল এক প্রকরের শোষণ যার বিরূদ্ধে নিরস্ত্র বাঙালীরা মুক্তির জন্যে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল। আর চাকরির বাজারে ৫৬% কোটাও চরম বৈষম্য যেটি শোষণমুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজের স্পষ্টত পরিপন্থী।

অনুচ্ছেদ ১১-এ বলা হয়েছে যে, " প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে।

সমতা একটি মৌলিক মানবাধিকার এবং অযৌক্তিক কোটা হল চরম বৈষম্য যেটি মানবসত্তার মর্যাদার পরিপন্থী এবং কোটা পদ্ধতি কোটাহীন মনবসত্তার মূল্য, মর্যাদা ও সম্মানের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বিনষ্টকারী।

অনুচ্ছেদ ১৫-এ রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব তথা পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবন যাত্রার বস্তগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহের অর্জন নিশ্চিত করা যায়।

১৫(ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষাও চিকিৎসাসহ জীবন ধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা সরকারের অন্যতম মোলিক দায়িত্ব। পাশাপাশি ১৫(ঘ)-এ সামাজিক নিরাপত্তার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। সেখানে বেকারত্ব বা বিভিন্ন কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্য লাভের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। তাই বাংলাদেশের বেকার অভাবগ্রস্ত যুবকসকল সরকারী সাহায্যের অধিকারী হবে যদিও এই বিধান কোর্টে বলবৎযোগ্য নহে। সেজন্য এই বিধান কোটা বৈষম্য হ্রাস করার মাধ্যমে অনেকাংশে কার্যকর হবে এবং যারা অভাবগ্রস্ত বেকার তারাও সামাজিক নিরাপত্তার অধিকারের আওতাধীন বলে লপরিগণিত হবে।

অনুচ্ছেদ ১৯-এ সুযোগের সমতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

১৯(১) সকল নাগরিকের জন্য "সুযোগের সমতা" নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন।

১৯(২) মানুষে মানুষে "সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ" করিবার জন্য নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করিবার জন্য এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে "সুষম সুযোগ-সুবিধাদান" নিশ্চিত করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।

১৯ অনুচ্ছেদের উপরোল্লিখিত ২টি দফাতেই সুযোগের সমতা নিশ্চিত করণ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ এবং সুষম সুযোগ-সুবিধাদানের প্রতি রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতার কথা স্পষ্টত বলা আছে। কিন্তু অনুচ্ছেদ ১৯(৩)-এ এও বলা হয়েছে যে, জাতীয় জীবনের সর্বস্তের মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন। এই অনুচ্ছেদের বিধান কার্যকর করার জন্য মেয়েদের বিশেষ সুবিধার প্রয়োজন। তবে, সেটি কোনভাবেই সংবিধানের অন্যান্য বিধানের তাৎপর্যকে অতিক্রম করতে পারবে না। উল্লেখ্য যে নারীদেরকে বিশেষ সুবিধা প্রদানের লক্ষ্য হচ্ছে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মেয়েদের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ। তাই, ততকালীন নারীদের অবস্থান বিবেচনাক্রমে তাদের ১০% কোটা দেয়া হয়েছিল যা এখনকার পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট বিবেচনাক্রমে পুনর্বিবেচনা করা উচিত যে এখন তাদের কতটুকু কোটার প্রয়োজনীয়তা আছে। কারণ, আজকের বাংলাদেশে নারীরা প্রায় সবক্ষেত্রে কমবেশি পুরুষদের সাথে সমান্তরালভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

অনুচ্ছেদ ২০-এ কর্মক্ষম নাগরিকের জন্য "অধিকার ও কর্তব্যরূপে কর্মের" কথা বলা হয়েছে। যোগ্যতানুসারে সমতার ভিত্তিতে কর্ম এবং এর পারিশ্রমিক লাভ করা প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য।

২১ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে সংবিধান ও আইন মান্য করা, শৃংখালা রক্ষা করা নাগরিক দায়িত্ব পালন করা এবং জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। তাই অযৌক্তিক কোটার মাধ্যমে সৃষ্ট বৈষম্যের বিরূদ্ধে সোচ্চার হওয়াও সংবিধানের প্রার্থনা ও আমাদের নাগরিক দায়িত্ব।

এবার চলুন, মৌলিক অধিকার তথা সংবিধানের তৃতীয় অংশের প্রাসঙ্গিক বিধানসমূহ পর্যালোচনা করা হোক।

২৬ অনুচ্ছেদে "মৌলিক অধিকারের সহিত অসমঞ্জস্য আইন বাতিল" নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ২৬(১) এ বলা হয়েছে যে, এই ভাগ তথা তৃতীয় ভাগের বিধানবলীর সহিত অসমঞ্জস্য সকল প্রচলিত আইন যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, এই সংবিধান-প্রবর্তন হইতে সেই সকল আইনের ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।

২৬(২) রাষ্ট্র এই ভাগের কোন বিধানের সহিত অসমঞ্জস কোন আইন প্রণয়ন করিবেন না এবং আনুরূপ কোন আইন প্রণীত হইলে তাহা এই ভাগের কোন বিধানের সহিত যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।

২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্র‍্যয় লাভের অধিকারী।

আইনের দৃষ্টিতে যেহেতু সবাই সমান সেহেতু ৩-৫% নাগরিকের জন্য দীর্ঘকালব্যাপী ৫৬% অযৌক্তিক কোটা সংরক্ষণ বাকি নাগরিকদের জন্য বৈষম্য বৈ কি! সক্ষম ও সমৃদ্ধশালী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই সুযোগ তেলা মাথায় তেল দেয়ার নামান্তর।

২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম প্রভৃতি কারণে বৈষম্য নিয়ে বলা হয়েছে।

২৮(১) কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।

তাই জন্মস্থানের কারণে জাতীয় জীবনের কোন ক্ষেত্রে কোন নাগরিকের সাথে বৈষম্য করা যাবে না, সুতরাং জেলা কোটা সাংঘর্ষিক, যদি না সেই জেলার নাগরিকগণ অনগ্রসর হওয়ার বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত হয়।

২৮(২) রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারীপুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন। এই দফার জন্য পরোক্ষভাবে নারীদের বিশেষ সুবিধা প্রাপ্ত হওয়ার অধিকার তাদের প্রদান করা হয়েছে। সেটির উদ্দেশ্যই নারী-পুরুষের মাঝে সমতা নিশ্চিত করণ।

২৮(৪) নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান -প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না। এটিই হল সেই সেভিং ক্লজ যার মাধ্যমে কোটা প্রথার আবির্ভাব, যেখানে নারী, শিশু বা নাগরিকের অনগ্রসর অংশেকে বিশেষ সুবিধা প্রদানের কথা বলা হয়েছে। আর যার ফলশ্রুতিতে আইনের মাধ্যমে কোটাপ্রথা প্রণয়ন করা হয়েছে। উল্লেখ্য, তিন প্রকরের নাগরিকদের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে, আর তারা হলেন, (১) নারী, (২) শিশু এবং (৩) নাগরিকদের অনগ্রসর অংশ। মনে রাখতে হবে যে, সময়ের পরিবর্তনে অনগ্রসর অংশের নাগরিক অগ্রসর হয়ে যায়, কোন অংশই দীর্ঘকাল অনগ্রসর থেকে যায় না। এককালের রাজা আরেককালের ফকির। তাই অনগ্রসর অংশকে দীর্ঘকালব্যাপী বিশেষ সুবিধাপ্রদানও সংবিধানবিরোধী।

এখন প্রশ্ন হলো নারীর জন্য কেন বিশেষ বিধান?

কারণ জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে নারীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করণ সংবিধানের একটি ম্যান্ডেট। তাই, নারীদের অনগ্রসরতার কারনেই কোটার প্রবর্তন হয়েছিল।

আর, নাগরিকদের অনগ্রসর অংশ বলতে কাদেরকে বোঝানো হয়েছে?

সংবিধানের কোথাও "অনগ্রসর" এর সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি। তাই অনগ্রসর শব্দটি দ্বারা কাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে সেটা রাষ্ট্র নির্ধারণ করিবে। আর, মুক্তিযোদ্ধা হোক বা সাধারণ নাগরিক যারা অনগ্রসর বলে বিবেচিত হবে তারা সবাই বিশেষ সুবিধা পেতে পারেন। তবে শর্ত থাকে যে, সেই বিশেষ সুবিধা যতদিন পর্যন্ত তারা অনগ্রসর থাকবে ততদিন পর্যন্ত পাবে, এর পর তাদের সেই অধিকার সাংবিধানিকভাবে বিলুপ্ত হবে।

২৯ অনুচ্ছেদ, সরকারী নিয়োগ-লাভে সুযোগের সমতা।

২৯(১) প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।

সম্প্রতি জনৈক এম পি বলেছেন যে "তারা বেসরকারি চাকরি করুক, সবার সরকারি চাকরিতে আসতে হবে কেন?" এই রকম কথা বলার অধিকার কারো নাই। কারণ কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভে সকল নাগরিকের সুযোগের সমতা থাকিবে,যেটি নাগরিক অধিকার।

২৯(২) কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না। সুতরাং জন্মস্থানের কারণে কেউ যেন বৈষম্যের শিকার না হয়। কারণ বর্তমানে বাংলাদেশের তেমন কোন জেলা বা উপজেলা সামগ্রিকভাবে পিছিয়ে নেই।

পুনরায় সেভিং ক্লজ।

২৯(৩) এই অনুচ্ছদের কোন কিছুই...

(ক) নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশ যাহাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করিতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে তাঁহাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান-প্রণয়ন করা হইতে,

(খ) কোন ধর্মীয় বা উপ-সম্প্রদায়গত প্রতিষ্ঠানে উক্ত ধর্মাবলম্বী বা উপ-সমপ্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিদের জন্য নিয়োগ সংরক্ষণের বিধান-সংবলিত যে কোন আইন কার্যকর করা হইতে,

(গ) যে শ্রেণীর কর্মের বিশেষ প্রকৃতির জন্য তাহা নারী বা পুরুষের পক্ষে অনুপযোগী বিবেচিত হয়, সেইরূপ যে কোন শ্রেণীর নিয়োগ বা পদ যথাক্রমে পুরুষ বা নারীর জন্য সংরক্ষণ করা হইতে,

............রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবেন না।

উপরোল্লিখিত ২৯(৩) অনুচ্ছেদ খুবই যুক্তিযুক্ত, এখানে কোন প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।

৩১, ৩২, এই দু'টি অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার রক্ষণের এবং আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। এই দুইটি অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকারের কথা বলা হয়েছে কিন্তু আমরা দেখতে পাই, প্রতি বছর অনেক চাকরিপ্রার্থী বেকার ছেলে মেয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বৈষম্যের শিকার হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। আমরা অবশ্যই বলতে পারি, রাষ্ট্র স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও বেকার চাকরিপ্রার্থীদের বেকারভাতা ১৫(ঘ) আর কর্মের অধিকার ১৫(খ) নিশ্চিত করতে পারছে না যেটি অনেক বেকার চাকরি প্রার্থীকে হতাশাগ্রস্থ করে তোলে। এবং এরা পৌনঃপুনিক বৈষম্যের শিকার হয়। এবং সেই বৈষম্যের মূল হাতিয়ার ৫৬% কোটাপ্রথা যেটি চরম অসহনীয় এবং অযৌক্তিক। সেই বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে ৩১ নং অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য, যেখানে বলা হয়েছে যে, আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহারলাভ যে কোন স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষত আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোন ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।

৩২ অনুচ্ছেদ -আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।

৪০ অনুচ্ছেদে পেশা বা বৃত্তির স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে।

আইনের দ্বারা আরোপিত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে যোগ্যতাসম্পন্ন প্রত্যেক নাগরিকের আইনসঙ্গত যে কোন পেশা বা বৃত্তি-গ্রহণের এবং আইনসঙ্গত ব্যবসায় পরিচালনার অধিকার রয়েছে।

কোটার আবির্ভাব কোন অনুচ্ছেদের অধীনে?

১৯(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন। এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তাই জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে ১০% নারী কোটার আবির্ভাব তবে যখন তাদের সমতা নিশ্চিত হবে, সেই কোটা বিলুপ্ত হওয়াই সংবিধানের তাৎপর্য।

২৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, "রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন"। এখানেও তাদের সমান অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কোটা পদ্ধতির আবির্ভাব।

সুতরাং, উভয় অনুচ্ছেদেই নারীদের জন্য কোটার প্রযোজ্যতা তুলে ধরা হয়েছে তবে সেই কোটার পরিমাণ কত পার্সেন্ট হবে সেটা, রাষ্ট্র সংবিধানের অন্যান্য অনুচ্ছেদের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করবে।

২৮(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, "নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান -প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না"। এখানে নারী বা শিশুদের অনুকূলে বা নাগরিকদের অনগ্রসর অংশের জন্য বিশেষ বিধানের কথা বলা হয়েছে। তাই নারী বা শিশু কোটা পেতে পারে বা সমাজের যে কোন অনগ্রসর অংশও বিশেষ বিধানের আওতায় কোটা পেতে পারে। কিন্তু বিশেষ বিধানের সুযোগ পাওয়ার জন্য অবশ্যই অনগ্রসর হতে হবে, নাগরিকদের সেই অনগ্রসর অংশ মুক্তিযোদ্ধা যেমন হতে পারে আবার মুক্তিযোদ্ধা ব্যতীত সাধারণ নাগরিকও হতে পারে, অন্যদিকে, অনগ্রসর না এমন মুক্তিযোদ্ধা বা অন্য কেউ কোটা বা বিশেষ সুবিধা পাওয়া সংবিধান পরিপন্থী। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রের জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন বাধ্যতামূলক নয়, এটি ঐচ্ছিক।

২৯(৩), ক, খ এবং গ তেও কিছু বিশেষ বিধান রয়েছে, যেগোলো খুবই যুক্তিক। সে গুলোও মূলত কোটা, বৈষম্য বলা যাবে না।

কোটা প্রয়োজনে থাকবে কিন্তু সেটি হবে যুক্তিক এবং সহনীয় যে কোটার কারণে লক্ষ বেকার দূর্ভোগ পোহায় সেই কোটা বৈষম্য ছাড়া আর কিছুই নয়।

এই বৈষম্য দূরীকরণে আমরা কী করতে পারি?

৩৭ নং অনুচ্ছেদ আমাদেরকে সমাবেশের স্বাধীনতা দিয়েছে যদিও সেটি শর্ত-সাপেক্ষে। বলা হয়েছে যে, "জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে"। সুতরাং, জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা না হলে, দুই শর্তে তথা শান্তিপূর্ণভাবে এবং নিরস্ত্র অবস্থায় জনসভা ও শোভযাত্রায় অংশগ্রহণ করার অধিকার সবার রয়েছে।

অধিকন্তু, ৩৮ নং অনুচ্ছেদে সংগঠনের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। জনশৃংঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে সংঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে যদি উহার গঠন ও উদ্দেশ্য এই সংবিধানের পরিপন্থী না হয়। সুতরাং কোটা সংস্কারের জন্য গঠিত "সাধারণ শিক্ষার্থী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ" সংবিধান অনুযায়ী গঠিত।

একটি ব্যতিক্রম অনুচ্ছেদ রয়েছে সেটি হল ৪৫। যেখানে বলা হয়েছে যে কোন শৃঙ্খলা-বাহিনীর সদস্য-সম্পর্কিত কোন শৃঙ্খলামূলক আইনের যে কোন বিধান উক্ত সদস্যদের যথাযথ কর্তব্যপালন বা উক্ত বাহিনীতে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে প্রণীত বিধান বলিয়া অনুরূপ বিধানের ক্ষেত্রে তৃতীয় ভাগের কোন কিছুই প্রযোজ্য হবে না। সুতরাং সেনাবাহিনী, নৌ বাহিনী, বিমান বাহিনী ইত্যাদিতে সংবিধানের তৃতীয় ভাগে প্রদত্ত অধিকার সমূহ সংকোচিত করা হয়েছে।

সাংবিধানিক বিধান তথা ২৬(১) & (২), ২৭, ২৮(১) & (২), ২৯(১) & (২), ৩১,৩২ অনুচ্ছেদ লংঘন করে বৈষম্যের প্রতিকার কী হতে পারে সেটাও সংবিধান বলে দিয়েছে ৪৪ নং অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকার বলবৎকরণ শিরোনামে। অনুচ্ছেদ ৪৪(১) -এ বলা হয়েছে যে, এই ভাগে (তৃতীয় ভাগে) প্রদত্ত অধিকারসমূহ বলবৎ করিবার জন্য এই সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগের নিকট মামলা রুজু করিবার অধিকারের নিশ্চয়তা দান করা হইল। এবং ইতোমধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে কোটা সংস্কারের জন্য একটি রিট দায়ের করা হইয়াছে।

বর্তমান তিক্ত সত্য হচ্ছে, যে কোটার প্রবর্তনই নাগরিকদের অনগ্রসর অংশকে বৈষম্যের হাত থেকে মুক্ত করা সেই কোটা যখন অনেক বড় ধরণের বৈষম্য সৃষ্টিকারী হয়ে যায়, এবং শত শত নাগরিককে অনগ্রসরতার দিকে ঠেলে দেয় তখন এটির আর কোনো বৈধতা থাকতে পারে না।

আর যদি কোটা পেতেই হয় তাহলে বাংলাদেশের এলিট ক্লাস ব্যতীত সবার কোটা পাওয়া উচিত কারণ বাংলাদেশের ৮০-৯০% নাগরিক অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর অংশ। অথচ এলিট ক্লাস মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যগণ ও এলিট ক্লাস নারীরা ব্যাপকহারে কোটার সুবিধা পাচ্ছে যদিও নারী এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিবার বর্গের জন্য বিশেষ সুবিধা বা কোটা প্রণয়নের মূল কারণ ছিল জাতীয় জীবনে তাদের অনগ্রসরতা, কিন্তু এখন তাদের একটা বড় অংশ আর অনগ্রসর নয়।

যাইহোক, অসহনীয় মাত্রায় অযুক্তিক কোটা প্রদান করে বৈষম্য সৃষ্টিকারী সব আইন যতখানি সংবিধানের উল্লেখিত অনুচ্ছেদ সমূহের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল বলিয়া গণ্য হইবে।

পরিশেষে বলতে চাই, কোন কোন দেশে কত পার্সেন্ট কোটা আছে সেটা আমাদের দেখার বিষয় না, আমাদেরকে অবশ্যই আমাদের সর্বোচ্চ আইন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান মেনে চলতে হবে। কারণ সংবিধানের শুরুতেই অনুচ্ছেদ ৭(২)-এ বলা হয়েছে যে, এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন, এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসমঞ্জস হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।

বি.দ্র. আমি একজন আইনের ছাত্র হিসেবে ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সেখানে বর্ণীত আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক-স্বাধীনতা চর্চার অধিকার আমার রয়েছে। বিধায়, সংবিধানের অনুচ্ছেদ সমূহের ব্যাখ্যা করিবার স্বাধীনতাও আমার রয়েছে।

লেখক:

আবরারুল হক
এলএল.বি. অনার্স,
আইন বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বিডিবিএস 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।