গণরুমে কিংবা নিপীড়নে শিক্ষার্থীরা: আনু মুহাম্মদ


আনু মুহাম্মদ
Published: 2018-03-05 17:56:55 BdST | Updated: 2018-09-25 08:13:57 BdST

ঢাকায় বাসা থাকা সত্ত্বেও হলে থাকার আগ্রহ নিয়েই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম কয়েক দশক আগে। ভর্তি হয়ে সোজা হল অফিসে গেছি, সাথে সাথে রুম পেয়ে তা ঠিকঠাক করে থাকা শুরু করেছি। এর মধ্যে কোনো বাধা ছিলো না, কারো তদ্বির দরকার হয়নি, কারো চোখ রাঙানি সহ্য করতে হয়নি। আবাসিক বিশ্ব্ববিদ্যালয়ে এরকমই হবার কথা। অথচ সেই একই হলে ক’দিন আগে প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থীদের দেখলাম নিদারুণ দশায়। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন নয়, চরম অবহেলা আর নিপীড়নের ব্যবস্থা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। সে হিসেবেই এর প্রতিষ্ঠা এবং এখনো এর অবস্থান তাই। তার মানে যে শিক্ষার্থীরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় তাদের প্রত্যেকের জন্য একটি আসন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে থাকার কথা। কিন্তু বহু বছর তা যে নেই তার প্রমাণ বছরের পর বছর নবীন শিক্ষার্থীদের অবস্থা দেখে যে কেউ বুঝতে পারবেন।

প্রথম বর্ষে ভর্তি হবার মহাযুদ্ধের পর যারা উত্তীর্ণ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করছে তাদের জায়গা এখন হয় গণরুম নামে পরিচিত শরণার্থী শিবিরে কিংবা তাদের আসা-যাওয়া করতে হয় দূর থেকে, কিংবা ভর্তিযুদ্ধের পর আবারও আর্থিক চাপ নিয়ে বাসা ভাড়া করে থাকতে হয়। এর কারণ তাদের জন্য নির্ধারিত আসনগুলো এখনও অন্যদের দখলে। প্রথমত. সেশন জটের জন্য অনেক বিভাগের শিক্ষার্থীরা ঝুলে থাকায় হলের অনেক সিট খালি হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক বিভাগে এখন বাণিজ্যিক প্রাইভেট উইকেন্ড ইভনিং বিভাগ খোলা হয়েছে। সেখানে নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা, ফল প্রকাশ হলেও মূল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাস, পরীক্ষা ও ফলপ্রকাশের দীর্ঘসূত্রিতায় আটকে থাকে অনিশ্চয়তায়। দ্বিতীয়ত সরকারি ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা তাদের ক্ষমতাবলে তাদের প্রয়োজনমত হলে থেকে যায়, অনেকক্ষেত্রে তাদের আশ্রিত অন্য লোকজনও হলে থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয় হলগুলোতে সরকারি ছাত্র সংগঠনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার এবং তার উপর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের নির্ভরশীলতার যে ধারা বহু বছর ধরে চলে আসছে তার প্রধান শিকার অনুজ শিক্ষার্থীরা। হলে সিট না পেয়ে অসহায় অবস্থায় পড়ে যারা গণরুমে থাকতে বাধ্য হয় তারা হয়ে দাঁড়ায় বর্তমান সময়ের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সহজ শিকার। কখনো জোর করে নিজেদের মিছিল সমাবেশে নেয়া, আবার কখনো জোর করে অন্য সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক কার্যক্রমে বাধা দেয়া, ইচ্ছা-শখ আনন্দের জন্য হেনস্থা-নির্যাতন ইত্যাদি বহু অভিযোগ আমরা শুনি। সর্বশেষ নিজের ক্যালকুলেটর ফেরত চাইতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মেধাবী ছাত্র কীভাবে ছাত্রলীগের হাতে নির্যাতিত হয়েছে তার চিত্র সংবাদপত্রে এসেছে। বেশিরভাগই আসে না। এই নিপীড়ন সংস্কৃতির আরেকটি ভয়াবহ প্রকাশ ঘটে প্রতিবছর ‘র্যাগিং’-এর মাধ্যমে, যার প্রত্যক্ষ শিকারও হয় প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা। এই সময়ে সেই যন্ত্রণার পর্বই চলছে অনেকের জন্য।

লাখ লাখ পরিবারে ইন্টারমিডিয়েট পাসের পর থেকেই শুরু হয় ভর্তির যুদ্ধ। দূর-দূরান্তের সীমিত আয়ের মানুষদের জন্য খরচের মেলা হিসাব। যাদের আয় কম তাদের আবার খরচ বেশি। কোচিং সেন্টারের ব্যয়, বইপত্র-থাকা-খাওয়া যাতায়াতের ব্যয়। বড় শহরে সন্তানকে কোচিং সেন্টারে ভর্তি করতে হবে, তার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, আত্মীয়-স্বজনের বাসায় থাকার অবস্থা না থাকলে মেসে থাকতে হবে। সন্তান যদি মেয়ে হয়, উদ্বেগ আরও বেশি।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয় একাধিকবার। যদি বেশ কয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই দৌড়ের ওপর থাকতে হয় তাহলে একটা মোটা অংকের বাজেট হাতে রাখতেই হবে, সামর্থ্য থাকুক বা না থাকুক। সবার জন্যই এটি কঠিন হলেও অনেকের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। টাকা-পয়সার চাপ তো আছেই, ভর্তি প্রার্থীর সাথে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ছুটে যাবার মতো অতিরিক্ত মানুষ কয় পরিবারে আছে? বাংলাদেশে কতো পরিবার এতসব বাধা অতিক্রম করতে পারে কিংবা বাধা অতিক্রম করবার মতো পারিবারিক/আর্থিক/মানসিক শক্তি অর্জন করতে পারে?

আর্থিক পারিবারিক এরকম ক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও বহু বাধা ও প্রতিযোগিতা অতিক্রম করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত চলে আসবার ঘটনাও আছে। আমাদের বিভাগে এরকম ছাত্রছাত্রী প্রায় প্রতিবছরই বেশ কয়েকজন পাই যারা একেকজন অসাধারণ কাহিনী তৈরি করে বিভাগ পর্যন্ত এসেছে। পারিবারিক আর্থিক সচ্ছলতা নেই বললেও কম বলা হয়, টিকে থাকা প্রতিদিনের যুদ্ধ। পড়াশোনা বড় শহরেও নয়, স্কুল-কলেজ অনামী, কারো পরিবারের নিয়মিত আয়ও নেই। কোচিং সেন্টারে যাবার ক্ষমতা তাদের ছিল না। নিজেরাই পড়াশোনা করেছে, কারো কারো ক্ষেত্রে স্থানীয় স্কুল বা কলেজের মমতাময়ী শিক্ষকের সহযোগিতাই প্রধান অবলম্বন। কোচিং গাইডসহ বিপুল অর্থ ব্যয়ের দাপটের মধ্যে এসবের বাইরে থেকে যখন কোনো শিক্ষার্থীকে দেখি ‘মেরিট লিস্ট’-এ স্থান করে নিয়েছে তখন খুবই ভরসা পাই।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি সর্বজন বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও ভর্তি ফি অন্যগুলোর তুলনায় কম। এর মধ্যে অবশ্য বিভাগগুলো নানা ‘উন্নয়ন’ ফি বাড়িয়েছে। এই টাকা জোগাড় করাও অনেকের জন্য খুব কঠিন। এক ছাত্রী দূর থেকে ভর্তি হতে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাথে কেউ নেই। কেন? বললো, বাস ভাড়া জোগাড় করা যায়নি বলে বাবা আসতে পারেনি। আরেকজনের উপার্জনক্ষম বাবা নেই, আরেকজনের বাবা দিনমজুর, আরেকজনের মা অসুস্থ, বাবা দূরে কাজ করে। কেউ কোনোভাবে ভাই বা বোনের সংসারে আছে। ভর্তি হবার পর নিজেদের লেখাপড়ার খরচ তো বটেই সংসারেও কিছু দেবার বাধ্যবাধকতা নিয়ে দিনরাত অতিক্রম করে এরকম শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম নয়। টিউশনি করে শিক্ষাজীবনে টিকে থাকার চেষ্টা অনেকের।

ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে এই যে মহাযজ্ঞ তার পরিবর্তন হওয়া দরকার। সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা হলে ভোগান্তি কিছুটা কমবে বলে ধারণা করা যায়। তবে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন নিয়েও প্রশ্ন আছে, এগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শহর-ইংলিশ মাধ্যম-এলিট শিক্ষার্থীদের দিকে তাকিয়েই প্রণয়ন করা। তবে প্রশ্ন আর ভর্তি পদ্ধতি যাই থাক বর্তমানে অবাধ প্রশ্নপত্র ফাঁস যে মহামারী আকার নিয়েছে এবং তা নিয়ে সরকারের যেরকম নমনীয়তা ও প্রশ্রয় দেখা যাচ্ছে তাতে প্রকৃত শিক্ষার্থীদের যন্ত্রণা আর হতাশার সুরাহা হবার আশু কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

যাইহোক, নানা কারণে সবার যুদ্ধ সফল হয় না। এতোসব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে অনেক মেধাবীর পক্ষেও উচ্চশিক্ষার স্থানে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। অনেক শিক্ষার্থী নিজ আগ্রহ থেকে অনেক দূরের কোনো বিষয়ে ভর্তি হতে বাধ্য হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে বা মেডিক্যালে ভর্তি হতে পারা তাই শিক্ষার্থী অভিভাবকদের জন্য এক বিরাট যুদ্ধ জয়ের বিষয়। এক বিশাল স্বপ্নের পথে যাত্রা। কিন্তু এই স্বপ্ন ধারণ করবার মতো পরিস্থিতি কি উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে আছে?

সংখ্যার প্রতি বর্তমান সরকারের ঝোঁক খুব প্রকট। কতো সংখ্যায় পাস হলো, কতো বিশ্ববিদ্যালয় হলো, কতো বিভাগ হলো এই সংখ্যার কৃতিত্বে বিভোর শিক্ষা মন্ত্রণালয় আর সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এই পাসের হার জোর করে বাড়াতে গিয়ে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার কী হাল হচ্ছে সেটা এখন সবাই জানেন। যে সব বিশ্ববিদ্যালয় নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেগুলোর প্রায়গুলোই শিক্ষক, ক্লাসরুম ও আবাসনসহ নানা সংকট নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। প্রায় বিশ্ববিদ্যালয়েই সরকার মনোনীত উপাচার্য নিয়ে অভিযোগ ও জটিলতা রয়েছে। নতুন বিভাগগুলোর অনেকগুলোতে রয়েছে ক্লাসরুম ও শিক্ষক সংকট। শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছেই।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আনন্দ, উত্কণ্ঠা আর স্বপ্ন নিয়ে প্রবেশ করে নতুন শিক্ষার্থীরা। সাধারণভাবে প্রত্যাশা হলো, তাদের এই নতুন যাত্রায় সহমর্মী হিসেবে পাশে দাঁড়াবে পুরনো শিক্ষার্থীরা, স্নেহ ও অভিভাবকের হাত এগিয়ে দেবেন শিক্ষকেরা। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হবে ক্লাস, পাঠ, হাসি, আনন্দ, গান, লেখা, খেলা, আড্ডা আর নতুন চিন্তায় সমৃদ্ধ হবার ক্ষেত্র। কিন্তু এই স্বাভাবিক প্রত্যাশা বারবার মার খায় ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের বর্বর আঘাতে। এর শিকার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক। তাই এর অবসানে দায়িত্বশীল শিক্ষক আর সাধারণ শিক্ষার্থীদের সংহতি আর সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

লেখক : অর্থনীতিবিদ

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।