‘ও, আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েননি’


আমিনুল ইসলাম
Published: 2018-03-12 13:16:02 BdST | Updated: 2018-10-21 15:23:40 BdST

বাংলাদেশ থেকে এক ছেলে আমাকে লিখেছে, ‘স্যার, আপনি কি আমার একটা উপকার করতে পারবেন’? আমি তাকে উত্তরে লিখলাম, ‘চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কি।’ ছেলেটা লিখলো, ‘স্যার, আমার একটা চাকরীর খুব দরকার। আমাকে কি এই ক্ষেত্রে কোনোভাবে উপকার করা যায়?’ আমি খানিক ভেবে তাকে লিখে পাঠালাম, ‘তুমি নিজ থেকে চাকরী পাচ্ছ না কেন?’ ছেলেটা এবার লিখেছে, ‘স্যার আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাশ করেছি। নানান জায়গায় চাকরীর জন্য আবেদন করি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কেউ ডাকে না। অল্প কিছু জায়গায় ডাকে, কিন্তু ইন্টার্ভিউ দিতে গিয়ে বেশিরভাগ সময়ই অপমানিত হয়ে আসতে হয়।’

– অপমানিত হয়ে আসতে হয় কেন?

– ইন্টার্ভিউতে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বলে বসে- ও, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়েছ! সেখানে তো পড়াশুনাই হয় না। স্যার, ইন্টার্ভিউ দিতে গেলে তো সবাই এমনিতেই নার্ভাস থাকে, এর মাঝে যদি প্রথমেই কেউ এই কথা বলে বসে, তাহলে তো স্যার আরও নার্ভাস হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক।

এই ছেলের মেসেজ পড়ে আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথাই মনে হয়ে গেলো। তখন আমি ঢাকার নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করছি। বুয়েটে সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক নিয়োগের সার্কুলার হয়েছে। আমি আবেদন করেছি।

গেলাম ইন্টার্ভিউ দিতে। যেহেতু বুয়েটে সমাজ বিজ্ঞান বলে আলাদা কোন বিভাগ নেই, তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক্সপার্ট নিয়ে আসা হয়েছে। আমি ইন্টার্ভিউ দিতে ঢুকতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা এক্সপার্ট বলে বসলেন,

– ও, আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েননি! আমি ভেবেছিলাম আপনি ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র। তো আপনি আপনার নিজের বিশ্ববিদ্যালয় মানে সিলেটের শাহজালাল ইউনিভার্সিটিতে আবেদন না করে এখানে আবেদন করেছেন কেন?

আমার কাছে ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত মনে হয়েছে। যেহেতু আমি এর মাঝেই বিদেশে পৃথিবীর সেরা একটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটা ডিগ্রী নিয়ে ফেলেছি এবং নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটিতে পড়াচ্ছি; তাই চাকরীটা আমার জন্য খুব জরুরী কিছু ছিল না। তাই সাহস করে বলে বসলাম,

সার্কুলারের কোথাও তো লেখা ছিল না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাড়া আর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী আবেদন করতে পারবে না। আপনারা আগে থেকে লিখে দিলেই তো পারতেন।

এরপর অবশ্য যা হবার তাই হয়েছে। এরা আমাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি। আমাকে সোজা বোর্ড থেকে বের হয়ে চলে আসতে হয়েছে এবং ওই পদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা এক ছাত্রই চাকরী পেয়েছিল। তো, এই হচ্ছে আমাদের অবস্থা। আমরা আগে থেকেই মনে করে বসে থাকি, এই ছেলে যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েনি কিংবা বুয়েটে পড়েনি, সুতরাং সে নিশ্চয়ই কোনোভাবেই এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র-ছাত্রীদের চাইতে ভালো হতে পারে না!

শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বুয়েট না। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও তাই। জাহাঙ্গীরনগর মনে করে তাদের চাইতে ছোট বা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ভালো না! সিলেট, চট্টগ্রাম কিংবা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও সেই একই অবস্থা! আবার সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মনে করে প্রাইভেট কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ভালো না! এমন মানসিকতা আমাদের শিক্ষকরাই আমাদের মাঝে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। তারা নিজেরাই এমন মানসিকতা ধারণা করেন। আমি এমনকি বিদেশে এসেও বাংলাদেশিদের মাঝে এমন মানসিকতা দেখতে পাচ্ছি!

ধরুন কেউ একজন একই শহরে বড় কিংবা নামকরা একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছে, আরেকজন হয়ত ছোট একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছে। তো ওই নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা বাংলাদেশি ছাত্র, ছোট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা ছাত্রটিকে পারলে ছাত্রই মনে করতে চাইছে না! অথচ এইসব দেশের মানুষজন কিন্তু এমন কিছুই মনে করে না। কারণ তারা জানে, প্রত্যেককে আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।

অবাক করা সব ব্যাপার! অথচ দেখা যাবে যেই ছাত্রটা এখানে একটা নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছে, সে হয়ত বাংলাদেশের এমন একটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ে এসছে যার কোন রকম অবস্থান নেই, কিংবা খুব ছোট একটা ইউনিভার্সিটি। তো, এরা যখন তাকে এডমিশন দিয়েছে, তারা কি বলে বসেছে- পৃথিবীর সেরা ৬০০ কিংবা হাজার ইউনিভার্সিটিগুলোর তালিকায় তোমার ইউনিভার্সিটিকে তো খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না! তোমাকে তো ভর্তি নেয়া যাবে না!

এই রকমই যদি হতো তাহলে তো আমি সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ে এসে সুইডেনের লুণ্ড ইউনিভার্সিটি কিংবা ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে পড়তেই যেতে পারতাম না।

শাহজালাল কেন, আপনি বাংলাদেশের অতি সাধারণ একটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ে এসে অক্সফোর্ড, হার্ভার্ডে পড়তে পারবেন কিংবা এদের শিক্ষকও হয়ে যেতে পারবেন; কিন্তু সেই আপনিই নিজ দেশে ফেরত গিয়ে ঢাকা, বুয়েট কিংবা বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবেদন করলে, তারা বলে বসবে, ‘আপনি তো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েননি। তার মানে আপনার আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার যোগ্যতাই নেই। আপনি কি করে শিক্ষক হবেন!’ আমি বলছি না সব ক্ষেত্রেই এমন হয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমনটা হচ্ছে! এই হচ্ছে আমাদের মানসিকতা। জীবনের প্রতিটা পর্যায়ে একজন ব্যক্তি যে নিজেকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে, সেটা বোধকরি এই সব শিক্ষকদের জানাই নেই।

তো যেই শিক্ষকদের কিনা শিক্ষা দেয়ার কথা ছিল- কোন কিছুতে বৈষম্য করা যাবে না, সবাইকে যাচাই করতে হবে, এরপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে; সেই শিক্ষকরা নিজেরাই নিজদের শ্রেষ্ঠ মনে করে বসে আছে। তাই তাদের ছাত্ররা যখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গুলোতে বড় বড় পদে চাকরী করে, অন্য কারো চাকরীর ইন্টার্ভিউ নেয়; তারাও ঠিক এই একই কাজই করে।

যার কারণে ছোট একটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা কিংবা জাতীয় বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাশ করা ছাত্র-ছাত্রীদের বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে। আগে তো যাচাই করবেন। আগে থেকেই যদি আপনারা একটা ধারণা নিয়ে বসে থাকেন, তাহলে তো মানুষজন বৈষম্যে শিকার হতে বাধ্য!

আপনাদেরকে তো বিদেশি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঠিকই সুযোগ দিয়েছে সেখানে গিয়ে পড়ার। তো, আপনারা কি পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকার কোন বিশ্ববিদ্যালয় আদৌ পড়েছিলেন? এরপরও তো সুযোগ পেয়েছেন পড়ার! তারা আপনাকে যাচাই করেছে। তারাও যদি এমন করে বসত, তাহলে কি আদৌ আপনারা ওই সব বিশ্ববিদ্যালয় পড়তে পারতেন? এইসব থেকেও তো শিক্ষা নেয়া যেতে পারে।

আমার কেন যেন মনে হয়, অন্যকে ছোট করার মাঝেই আমরা বাংলাদেশীরা সমুদয় আনন্দ খুঁজে পাই!

আমিনুল ইসলামের লেখাটি এগিয়ে চলো ওয়েবসাইট থেকে নেয়া 

বিদিবিএস 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।