বানিজ্য যুদ্ধ: যুক্তরাষ্ট্র-চায়না


মাসফেক ইব্রাহিম
Published: 2018-04-16 19:13:17 BdST | Updated: 2018-09-25 02:20:44 BdST

বর্তমানে সারাবিশ্বে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্পর্ক গড়ে ওঠেছে যা কিনা সামরিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বিরাজমান অবস্থা দেখা দিয়েছে। ১৭ দশকের পর থেকে যারা ক্ষমতা দেখিয়ে আসছে তাদের মধ্যে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন), তার সাথে রয়েছে উত্তর-দক্ষিন কোরিয়া, ব্রিটিশ, জার্মানি অন্যতম। তবে আগে থেকে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের সখ্যতা ছিল যা কিনা জার্মানিকে ভাগ করার সময় ছিল বড় একটা অবদান। তারই ধারাবাহিকতা বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধ বিরাজমান ছিল। যেমন: ভিয়েতনাম যুদ্ধ, স্নায়ুযুদ্ধ হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক খাতে তার প্রভাব পড়তে থাকবে। বিভিন্ন চুক্তিকে কেন্দ্র করে একটা একটা যুদ্ধ হয়েছে। যাতে লাভবান হয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব। এর মধ্যে আলোচিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধের শঙ্কা।

তবে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে যদি বানিজ্য যুদ্ধ হয় সে ক্ষেত্রে তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ হবার সম্ভবনা রয়েছে। তাতে করে উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশগুলো এক ধরনের চাপে পড়বে। যা কিনা রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ক্ষতি তো করবে তার সাথে সমাজ ব্যবস্থার উপর এক ধরনের খারাপ প্রভাব পড়বে।

যুক্তরাষ্ট্রের তিনশো কোটি ডলারের পণ্য আমদানির ওপর শুল্ক আরোপের কথা বিবেচনা করছে চীন। চীনের পণ্যের ওপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় এ পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বেইজিং। মেধাস্বত্ব চুরির অভিযোগে বৃহস্পতিবার, চীনের ছয় হাজার কোটি ডলারের পণ্য আমদানির ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আরোপিত শুল্কের আওতায় পড়তে যাচ্ছে চীনের এক হাজারের বেশি পণ্য। লাগাম টানা হচ্ছে চীনের বিনিয়োগও।

যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে উপনীত না হতে পারলে তাজা ফলমূল, বাদাম, ওয়াইনসহ ১২০টি মার্কিন পণ্যে ১৫ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে তারা। এর ফলে মার্কিন ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত একশ কোটি ডলার গুনতে হবে।

হোয়াইট হাউস বলছে, চীনের অন্যায্য প্রতিযোগিতা মোকাবিলায় এ পদক্ষেপ জরুরি। বছরের পর বছর আলোচনার পরও বেইজিং অবস্থান না বদলানোয় এ পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেন, "চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্যের ৩০১ ধারায় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এটা হতে পারে ৬ হাজার কোটি ডলার। আমি চীনের প্রেসিডেন্টসহ সর্বোচ্চ প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছি। অবিলম্বে বাণিজ্য ঘাটতি এক হাজার কোটি ডলারে নামিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছি। চীনের সঙ্গে অন্যায্য বাণিজ্য সম্পর্কের কারণে চাকরি হারাচ্ছে মার্কিনীরা।"

পাল্টা পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে চীনও। যুক্তরাষ্ট্রের তিনশো কোটি ডলারের পণ্য আমদানির ওপর শুল্ক আরোপের কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক বিপজ্জনক জায়গায় না নিতে ওয়াশিংটনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং।

যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রাষ্ট্রদূত চুই তিয়াঙ্কায় বলেন, "আমি মনে করি, এক পাক্ষিক সিদ্ধান্ত ও বাণিজ্য যুদ্ধ কারো জন্য লাভজনক হবে না। কারণ এটা অর্থনীতিক বা রাজনৈতিক কোন অর্থই প্রকাশ করেনা। এর প্রভাব আসলে মধ্যবিত্ত মার্কিনীদের প্রতিদিনের জীবনে পড়বে।"

এর আগে অর্থনৈতিক খাতে পঁচিশ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। দেশটিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাষ্ট্রীয় সফরকালে বৃহস্পতিবার এসব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী চীন থেকে কয়েক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সয়াবিন ও আকাশযান আমদানি করবে যুক্তরাষ্ট্র। আর আলাস্কা থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস চীনে রপ্তানি করা হবে। এছাড়া উভয় দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে।

স্টেট অব আলাস্কা, আলাস্কা গ্যাসলাইন ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন, চায়না পেট্রোকেমিক্যাল কর্পোরেশন, চায়না ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন ও ব্যাংক অব চায়নার মধ্যকার এই চুক্তিতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কর্মকর্তারা জানান, এই যৌথ উন্নয়ন চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকায় ১২ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার মধ্যে বার্ষিক যে ১০ হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্যিক ঘাটতি রয়েছে তা কমে আসবে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ নেয়ার কথা বিবেচনা করছে যুক্তরাস্ত্র-চীন। এ পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য যুদ্ধের সূচনা করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকরা।

১৯৮০ -এর দশকের শুরুতে যখন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে হস্তক্ষেপ করে তখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সাবেক সোভিয়েত বাহিনীকে আফগানিস্তান থেকে হঠানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের মাধ্যমে আফগান গেরিলাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়েছিল। তবে পাকিস্তানে ওসামা বিন লাদেন দীর্ঘদিন নিরাপদে অবস্থান করার কারণে ওবামা প্রশাসন পাকিস্তানের ওপর ক্ষুব্ধ। ইসলামাবাদের ওপর ক্রমশ আস্থা হারিয়ে ফেলছে ওয়াশিংটন।

ওয়াশিংটন পাকিস্তানের ওপর ক্রমাগত চাপ অব্যাহত রাখলে পাকিস্তান তার ভূখন্ডের ভেতর দিয়ে আফগানিস্তানে মার্কিন সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে। এর ফলে পাকিস্তানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটতে পারে। এরই প্রেক্ষিতে হয়তো ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গঠতে পারে। অপরদিকে চীনের সাথে পাকিস্তানের অটুট সামরিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ আরো ঘনিষ্ঠ হবে। এরফলে এ অঞ্চলে চীন-পাকিস্তান ও ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিদ্বনিদ্বতা শুরু হতে পারে যা এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করতে পারে।

স্টিভ ব্যানন ২০১৭ সালে বলেন, চীনের সঙ্গে দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে কয়েক বছরের মধ্যে যুদ্ধ বাধবে যুক্তরাষ্ট্রের। নিঃসন্দেহে দুই দেশ দিন দিন যুদ্ধের দিকেই এগোচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যেও আরেকটি বড় সংঘাতে জড়াবে ওয়াশিংটন।

তবে ওয়াশিংটন যদি না দক্ষিণ চীন সাগরে বড় আকারে একটি যুদ্ধের পরিকল্পনা করে, অন্য কোন উপায়ে সেখানে নির্মিত দ্বীপগুলিতে চীনের প্রবেশ ঠেকানোর চেষ্টা হবে একটা বোকামি।

২০০১ সালের ডিসেম্বরে এক চুক্তির বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কিরগিজ সরকারের কাছ থেকে মানাস ট্রানজিট সেন্টার লিজ নেয়। পেন্টগনের কাছে পাকিস্তানের ল্যান্ড রুটের গুরুত্ব অপরিসীম। কেনা মার্কিন রসদপত্র ও সামরিক সরঞ্জামের সিংহভাগই পাকিস্তানের মধ্যদিয়ে আফগানিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। তাই স্বীয় স্বার্থে পাকিস্তানকে খাটো করে দেখারও কোনো উপায় নেই।

১৯৪৭ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের পর চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক ও সামরিক জোট মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এসময় চীন ও পাকিস্তান তাদের সীমান্ত চিহ্নিত করার লক্ষ্যে আলোচনা শুরু করে। তবে দেখার বিষয় তারা কোন দিকে যেতে চায়।

লেখক: সহ-সম্পাদক, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন ও শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এইচজে/ ১৬ এপ্রিল ২০১৮

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।