স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ নিয়ে যা বললেন অক্সফোর্ড গবেষক


হাসান সাদ ইফতি
Published: 2018-05-10 13:08:44 BdST | Updated: 2018-08-19 21:37:27 BdST

খুব শীঘ্রই বাংলাদেশের সর্বপ্রথম স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণ করা হচ্ছে আমেরিকার স্পেস-এক্স কোম্পানির ফ্যালকন-৯ রকেট দ্বারা। এ বিষয়ে ইনবক্সে আপনাদের দেয়া অসংখ্য প্রশ্নের উপর ভিত্তি করে লিখাটি লিখেছি। আসুন, ঐতিহাসিক এই উৎক্ষেপণটি আরও বেশি উপভোগ করার জন্য কিছু তথ্য বা ফ্যাক্ট জেনে নিই:

১। বঙ্গবন্ধু-১ হচ্ছে একটি ভূ-স্থির কৃত্রিম উপগ্রহ বা geostationary satellite. অর্থাৎ, এটি সর্বদা একটি নির্দিষ্ট ভূমির (স্থানের) উপর অবস্থান করবে, যার দরুন পৃথিবীকে কেন্দ্র করে এর একবার ঘুরে আসতে ঠিক একদিন (২৩ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট ৪ সেকেন্ড) সময় লাগবে। অর্থাৎ, পৃথিবী তার নিজ অক্ষের সাপেক্ষে যে গতিতে ঘূর্ণায়মান, এই স্যাটেলাইটের ঘূর্ণনগতি তার নিজ কক্ষে ঠিক সেটুকুই হবে, যার ফলে আপেক্ষিকভাবে স্থানের পরিবর্তন হবে না।

২। উপর্যুক্ত ঘূর্ণনগতিকে ধরে রাখতে এবং পাশাপাশি অভিকর্ষজ বলকে প্রশমিত করতে স্যাটেলাইটির যে গতিবেগ প্রয়োজন, তাতে এর কক্ষের উচ্চতা দাড়ায় ৩৫,৭৮৬ কিমি, যা নিরক্ষরেখা (equator) বরাবর অবস্থিত। অর্থাৎ, ভূ-স্তিরতার জন্য প্রয়োজনীয় শর্তগুলো কেবল এই একটি উচ্চতার কক্ষই মেনে চলে; অন্য কথায়, ভূ-স্থির কক্ষ কেবল একটিই। একে geostationary orbit (GEO) বলা হয়। এই কক্ষে স্যাটেলাইটের গতি দাড়াবে ১১,০৬৮ কিমি/ঘণ্টা। উপর্যুক্ত হিসেবটি কক্ষগতিবিদ্যা বা orbital mechanics এর কিছু সহজ জ্ঞান থেকে পাওয়া যায় (ছোট ভাই-বোনরা, যারা ১১/১২ তে পড়, এটা খুব সহজেই করতে পারবে)।

৩। এখন আসা যাক মজার ব্যাপারে। যেহেতু ভূ-স্থির কক্ষ কেবল একটিই এবং এতে মাত্র ১,৮০০টি স্যাটেলাইটের স্থান সংকুলান হয়, সেহেতু একে নিয়ে আছে ব্যবসা, আছে রাজনীতি ও লবিং। বাংলাদেশের অবস্থান পূর্ব দ্রাঘিমাংশ ৯০° তে। অথচ বঙ্গবন্ধু-১ এর জন্য স্লট বরাদ্দ পাওয়া গেছে পূর্ব দ্রাঘিমাংশ ১১৯.১° তে। অর্থাৎ, আমাদের প্রথম স্যাটালাইটটি বাংলাদেশের উপর অবস্থান করবে না, বরং ইন্দোনেশিয়ার উপর অবস্থান করবে।

৪। International Telecommunications Union (ITU) দেশগুলোকে 'আগে আসলে, আগে পাবেন' ভিত্তিতে স্থান বা স্লট বরাদ্দ দেয়। অনান্য দেশগুলি যখন আমাদের দেশের উপরের স্লটগুলি নিয়ে নিচ্ছিল, আমরা তখন স্যাটেলাইট কী – তাই জানি না। এর থেকে হয়ত আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিৎ যে, বিজ্ঞানে আজকের বিনিয়োগ হবে আগামীকালের উন্নয়ন।

৫। বঙ্গবন্ধু-১ এর কাজ হবে টেলিযোগাযোগ ও টেলিভশন চ্যানেলগুলির সিগনাল সরাসরি ঘরে ঘরে বা স্টেশনে এনে দেয়া, যা এতদিন ভাড়া করা স্যাটেলাইটে করা হত। ইন্দোনেশিয়ার উপর থাকায় সিগনালগুলি তীর্যক হয়ে আসবে, অর্থাৎ বড় বড় দালানের মাঝে সিগনাল পেতে হালকা বেগ পেতে হতে পারে। তবে, এশিয়ার অনেক দেশে সিগনাল ভাড়া দিয়ে লাভবান হওয়া যাবে।

৬। উৎক্ষেপণের সময় বঙ্গবন্ধু-১ কে দেখা যাবে না। এটি রকেটের উপরের কামড়ায় অবস্থান করবে, যাকে payload bay বলা হয়। রকেটের একদম মাথার সাদা অংশটির ভিতরে এর অবস্থান।

৭। পরিশেষে বলতে চাই যে, এই ঐতিহাসিক উৎক্ষেপণটি নিয়ে আমরা গর্ব করব, তবে তা হবে সীমিত। যেদিন আমরা কেনা নয়, বরং নিজেদের তৈরি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করব – হয়ত নিজেদের তৈরি রকেটে – সেদিন সত্যিই গর্ব করব, আনন্দে আত্মহারা হয়ে গর্ব করব।

জয় হোক বিজ্ঞানের।

লেখক হাসান সাদ ইফতি, অক্সফোর্ডে পিএচডি করছেন এই বাংলাদেশী গবেষক

বিদিবিএস

 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।