কোটা সংস্কার: সচিব কমিটির দায়বদ্ধতা


আলী ইমাম মজুমদার
Published: 2018-07-09 22:34:12 BdST | Updated: 2018-11-14 05:24:35 BdST

চলমান কোটাব্যবস্থা সংস্কারের জন্য ছাত্রসমাজ গত এপ্রিলে একটি বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। তাদের দাবি, বিভিন্ন প্রাধিকার কোটা হ্রাস করে বর্তমানে বলবৎ ৪৫ শতাংশ মেধা কোটা ৯০ শতাংশে উন্নীত করা। সে আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ অনেকে এ দাবির প্রতি সহমর্মিতা জানান। সরকারের মন্ত্রী পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গেও আন্দোলনকারী কয়েকজনের বৈঠক হয়। সে সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে এক ভাষণে কিছু ব্যতিক্রমধর্মী ক্ষেত্র ছাড়া অন্য সব প্রাধিকার কোটা বিলুপ্তির ঘোষণা দেন। সঙ্গে সঙ্গে তখনকার মতো আন্দোলনের ইতি ঘটে। বলা হয়েছিল, কাজটি করতে সাচিবিক সহায়তার জন্য একটি কমিটি গঠিত হবে। সেটা হয়েছে। তবে দুই মাস সময় নিয়ে। এর প্রথম সভা হলো ৮ জুলাই। তাদের সাফল্য কামনা করছি।

এর মধ্যে সম্প্রতি আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্দোষ কিছু কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। একটি ছাত্রসংগঠনের কর্মীরা আন্দোলনকারীদের নির্দয়ভাবে মারপিট ও লাঞ্ছিত করেন। দু-একটি ক্ষেত্রে এ ধরনের কাজে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকেও সংশ্লিষ্ট হতে দেখা গেছে। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা। বরং গ্রেপ্তার করা হয়েছে আন্দোলনকারীদের কয়েকজনকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঘটনাগুলো ঘটলেও তাদের কর্তৃপক্ষ অনেকটা নীরবই রইল। এমনকি এ দাবির প্রতি যাঁরা সহমর্মিতা জানিয়েছিলেন, তাঁরাও অজ্ঞাত কারণে চুপসে গেছেন। কেউবা করছেন বিরূপ মন্তব্য। এ অবস্থায় আন্দোলনকারীদের খুবই সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হওয়া সংগত হবে। একটি সচিব কমিটি যখন কাজ করছে, তখন ধৈর্য ধারণই শ্রেয়। কারও প্ররোচনায় ভুল পথে গেলে ভবিষ্যতে পস্তাতে হবে।

দেরিতে হলেও সচিব কমিটি গঠিত হয়েছে। তারা কাজও শুরু করেছে। কমিটিতে আছেন প্রজাতন্ত্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। তাঁরা দায়িত্বশীল পদে দীর্ঘকাল চাকরি করে এ স্তরে পৌঁছেছেন। অভিজ্ঞতার ভান্ডার পরিপূর্ণ। কোটা সংস্কারসংক্রান্ত দাবি নিয়ে চলমান আন্দোলনের সুন্দর পরিসমাপ্তি ঘটাতে তাঁরা সরকারকে যথাযথ পরামর্শ দেওয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। এটা সত্যি, যেখানে বেশ কয়েকটি পক্ষ এ ব্যবস্থার সুফল ভোগ করছে আর অন্যদিকে তা বাতিল বা হ্রাস করার দাবি আসছে, সেখানে কাউকেই পুরোপুরি সন্তুষ্ট করা যাবে না। তা ছাড়া এসব কোটা সময়ে সময়ে চালু হয়েছে সরকারের নির্বাহী আদেশে এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে। সুতরাং এর যেকোনো সংশোধনও হতে হবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেই। তবে সে সিদ্ধান্ত নিতে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহায়তা করতে হবে সচিব কমিটিকে। আর এমনটা যথাযথভাবে করতে তাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে সংবিধানের প্রতি।

সংবিধানের মৌলিক অধিকারসংক্রান্ত ২৯ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদলাভের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি নাগরিকদের কোনো অনগ্রসর শ্রেণি যাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করতে পারে, তার বিশেষ বিধান করার ক্ষমতাও সরকারকে দেওয়া আছে। এ চেতনার প্রতি সচিব কমিটিকে সচেতন থাকতে হবে। অনগ্রসর শ্রেণির মধ্যে উপজাতি, প্রতিবন্ধী ও নারীরা আসতে পারেন। যোগাযোগব্যবস্থার ব্যাপক সম্প্রসারণে গোটা দেশকে একটি সূত্রে নিয়ে এসেছে। এখানে জেলা কোটা তেমন প্রাসঙ্গিক নয় বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়। তবে যদি তা রাখতেই হয়, সেটা একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে শুধু অনগ্রসর জেলাগুলোর জন্য থাকতে পারে।

প্রাধিকার কোটার বড় অংশ—৩০ শতাংশ যায় মুক্তিযোদ্ধাদের পোষ্যদের জন্য। স্বাধীনতার পরপরই এ পরিমাণ কোটা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ ছিল। এর একটা বড় রকমের আবেগাশ্রয়ী দিক রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা এ স্বাধীন রাষ্ট্র গড়তে জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সে ইতিহাসের প্রতি জাতি হিসেবে আমাদের একটি দায়বদ্ধতা আছে। সচিব কমিটি এ বিষয়টিও বিবেচনায় নেবে। এখন পর্যন্ত রেজিস্টার্ড মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৩ লাখের মতো। তাঁদের পোষ্যসংখ্যা ১৫-১৬ লাখের বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। অগ্রাধিকার কোটা পুনর্নির্ধারণ বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া সংগত হবে।

আরও বলা আবশ্যক, কোনো বৈষয়িক প্রাপ্তির আশায় মুক্তিযোদ্ধারা সেদিন রণাঙ্গনে যাননি। তাই সে চেতনা থেকেই সংবিধানপ্রণেতারা এ বিষয়ে কোনো বিশেষ সুবিধার বিধান রাখেননি। তাই আমরা চাই, ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কোটাটি থাকুক। তবে একটি যৌক্তিক পরিমাণে। উপজাতি কোটাটিও তাদের জনসংখ্যার নিরিখে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। নারী কোটার প্রয়োজনীয়তা এখনো রয়ে গেছে বলে মনে হয়। নারীর ক্ষমতায়ন তেমন একটা হয়নি। এমনকি জাতীয় সংসদেও নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন রয়েছে। আর তারা সমাজে পুরুষদের তুলনায় অনগ্রসর বলেই সংবিধানের চেতনা অনুসারে এ সুবিধা পেতে পারেন।

সচিব কমিটির ওপর যে গুরুদায়িত্ব পড়েছে, তা পালন করতে গিয়ে কমিটির সদস্যরা অনেক সহায়ক দলিল তৈরি অবস্থায় পাবেন। এগুলো তাঁরা দেখবেন বলে ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপর প্রথিতযশা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক মুজাফ্ফর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত হয় জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। কমিশন দ্ব্যর্থহীনভাবে মেধাভিত্তিক সিভিল সার্ভিসের সুপারিশ করেছে। তেমনি ১৯৭৭ সালে সাবেক সচিব আবদুর রশিদের নেতৃত্বে গঠিত চাকরি ও বেতন কমিশন নিয়োগপর্বের জন্য একই ধরনের সুপারিশ করে। আইয়ুবুর রহমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব থাকাকালে ১৯৯৪ সালে ৪ সচিবের একটি কমিটি আবার বিষয়টি পর্যালোচনা করে। তারা মেধাকে প্রাধান্য দিয়ে ধীরে ধীরে কোটা বিলুপ্তির সুপারিশ করেছিল।
১৯৯৬-এর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন (পার্ক) সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সব কোটা বাতিল ও মেধাকে প্রাধান্য দেওয়ার সুপারিশ করে।

২০০৮ সালে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) পরামর্শক হিসেবে ড. আকবর আলি খান ও কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ কোটা বিষয়টি বিষদভাবে পর্যালোচনা করে বিস্তারিত একটি প্রতিবেদন দেন। তাঁরাও মুক্তিযোদ্ধাদের পোষ্য কোটা অনেকটা কমিয়ে আনতে সুপারিশ করেছেন। প্রতিবেদনে জোর দেওয়া হয়েছে মেধাকে প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়ে। এগুলো ছাড়াও স্বাধীনতার পর থেকে পিএসসির বিভিন্ন বার্ষিক প্রতিবেদনে কোটাব্যবস্থায় সিভিল সার্ভিসের গুণগতমান হ্রাস পাওয়া সম্পর্কে অনেক মন্তব্য রয়েছে। বেসরকারিভাবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স স্টাডিজ একটি গবেষণা করেছে। প্রতিবেদনটি রয়েছে অনলাইনে। সে প্রতিবেদনেও চলমান কোটাব্যবস্থার কুফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

কেউ কেউ বলছেন, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের চাকরি পাওয়ার সুযোগ প্রসারিত করতে এ আন্দোলন চলছে। এটা অসত্য নয়। কিন্তু কোটাব্যবস্থার সংস্কার শুধু তাঁদের প্রয়োজনেই আবশ্যক নয়, এটা সচিব কমিটিকে বিবেচনায় রাখতে হবে। মেধাবী শিক্ষার্থীদের চাকরিতে আসার সুযোগ প্রসারিত হলে তাঁদের পাশাপাশি লাভবান হবে গোটা সিভিল সার্ভিস। সরকারের কাজে আসবে অধিকতর গতি। আমাদের সিভিল সার্ভিসের ক্রম নিম্নমুখী মান নিয়ে প্রায়ই অভিযোগ শোনা যায়। এ অভিযোগ দেশের ভেতর ও বাইরের। উন্নয়নসহযোগী সংস্থাগুলো প্রকাশ্যে এটা বলে থাকে। তারা তাদের সুবিধা অনুযায়ী কিছু প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও নেয়। কিন্তু কাঁচামালের জোগান মানসম্মত না হলে যত ভালো মেশিনে পণ্য তৈরি হোক, তা উপযুক্ত মানের হবে না।

২১ শতকের পৃথিবী অনেক প্রতিযোগিতাপূর্ণ। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পারস্পরিক যোগাযোগও বেড়ে চলছে দ্রুতগতিতে। সেখানে নিজদের সুবিধাদি আদায় করে নেওয়ার জন্য প্রতিভাদীপ্ত ও বুদ্ধিমান কর্মকর্তা প্রয়োজন। আর তা আমরা পেতে পারি অধিকতর মেধাবীদের চাকরিতে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমেই। একসময় বেতন ও সুবিধাদি অপ্রতুল ছিল। এখন সেটা অনেকটা কেটেছে। তাই অধিকসংখ্যক মেধাবী চাকরিপ্রার্থী আসছেন সরকারের চাকরির বাজারে। সেখানে কোটার বেড়াজালটি শিথিল করা দেশের স্বার্থেই প্রয়োজন। এটা অনস্বীকার্য, একটি রাজনৈতিক সরকারের বেশ কিছু দায় থাকে। আর তা বিভিন্নমুখী। তবে মেধা কোটাকে যৌক্তিক পর্যায়ে উন্নীত করেও সে দায়বদ্ধতা সামলানো যায়। আর এটা সংগত ও সময়ের দাবি।

উল্লেখ করা চলে, কোনো পদ্ধতিই স্থায়ী নয়। বাস্তবতা সদা পরিবর্তনশীল। তাদের ওপর অর্পিত বিষয়টির গুরুদায়িত্ব সচিব কমিটি অবশ্যই উপলব্ধি করে। আশা রইল, তারা এসব দায়বদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে একটি যৌক্তিক পর্যায়ে প্রাধিকার কোটাগুলো এনে এর সংস্কারে সরকারকে সহায়তা করবে।

আলী ইমাম মজুমদার সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব
[email protected]

এসএম/ ০৯ জুলাই ২০১৮

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।