বান কি-মুন চ্যান্সেলর, ডিগ্রি পাসে ভিসি!


টাইমস অনলাইনঃ
Published: 2018-09-02 23:14:39 BdST | Updated: 2018-11-18 02:24:54 BdST

প্রতিষ্ঠাতা সূত্রে নিজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। এফিডেভিট করা একটি ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে তা চূড়ান্তও করেছেন। নিজেই বানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আইন। শুধু তাই নয়, উপাচার্য নিজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চ্যান্সেলর নিয়োগ দিয়েছেন। সেই চ্যান্সেলর দেশের রাষ্ট্রপতি নন, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি-মুন!

শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়টি নোবেল পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছে বলে দাবি রাজশাহীর বাগমারায় অবস্থিত অর্জুনপাড়া মদিনাতুল উলুম ইসলামি ইউনিভার্সিটির স্বঘোষিত উপাচার্য রফিকুল ইসলামের।

তার দাবি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত একটি বিশ্ববিদ্যালয় হলেও বাংলাদেশ সরকার এর অবকাঠামো উন্নয়নে কোনো অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে না। এ কারণে গত ১৩ আগস্ট স্থানীয় ভবানীগঞ্জ সোনালী ব্যাংক শাখায় চিঠি দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়টির নামে মঞ্জুরকৃত এক হাজার ৩৫০ কোটি টাকা থেকে স্থানীয় ভবানীগঞ্জ সোনালী ব্যাংক রাজশাহী শাখায় বিশ্ববিদ্যালয়টির সঞ্চয়ী হিসাব নং-০১০২৪৮৬৩ এর অনুকূলে ৬০ লাখ টাকা জমা দেয়া হোক।’

ওই চিঠির অনুলিপি দেয়া হয়েছে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), বিশ্বব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক, এমনকি সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়েও।

২০১৬ সালের মে মাসে রফিকুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা ও উপাচার্য বলে দাবি করেন। একই বছরের ২০ জুলাই একটি লিফলেটে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এবং তৎকালীন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি-মুনের ছবি ব্যবহার করেন তিনি।

একই বছরের ১২ জুন ইউজিসি’র পক্ষ থেকে রাজশাহী বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর চিঠি দিয়ে নামধারী বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বঘোষিত উপাচার্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানানো হয়। ২৮ জুলাই রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাসরিন আক্তার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ইজিসিকে জানানো হয়, ‘গত ২১ জুলাই বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজস্ব কোনো অবকাঠামো পাওয়া যায়নি। তবে অর্জুনপাড়া মদিনাতুল উলুম দাখিল মাদরাসা নামে সাইনবোর্ড ও জরাজীর্ণ অবকাঠামো দেখা গেছে।’

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ সাধারণ মানুষের বরাত দিয়ে চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘ওই প্রতিষ্ঠানটিকে অর্জুনপাড়া মদিনাতুল উলুম ইসলামি দাখিল মাদরাসা হিসেবে চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয়রা রফিকুল ইসলামের ভুয়া প্রচারণার বিরুদ্ধে প্রশাসনকে ব্যবস্থা নেয়ারও অনুরোধ জানিয়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কথিত ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০১৪ সালের ২৩ আগস্ট জাতীয় সংসদে প্রাথমিক অনুমোদন পায়। একই সময় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকেও চিঠি দিয়ে অর্জুনপাড়া মদিনাতুল উলুম ইসলামি ইউনিভার্সিটি নামে বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপনের কথা জানানো হয়। বিষয়টি লিখিতভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কেও জানানো হয়।’

এদিকে রফিকুল ইসলামের এমন প্রচারণা বন্ধ না হওয়ায় ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট ইউজিসি রাজশাহী জেলা প্রশাসক বরাবর এক চিঠিতে জানায়, অর্জুনপাড়া মদিনাতুল উলুম ইসলামি ইউনিভার্সিটি নামধারী প্রতিষ্ঠানটি সরকার কর্তৃক অনুমোদিত নয়। প্রতিষ্ঠানটির সব ধরনের কার্যক্রম অবৈধ ও বেআইনি। প্রতিষ্ঠানটির এমন কার্যক্রমে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অর্জুনপাড়া মদিনাতুল উলুম ইসলামি ইউনিভার্সিটি আগে একটি মাদরাসা ছিল। ২০১১ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে ফাজিল ও কামিল মাদরাসাগুলোকে অ্যাফিলিয়েট ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। কুষ্টিয়ায় অবস্থিত ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডারে মাদরাসাকে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। পরে আবেদন করায় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আমাদের মাদরাসাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। জাতীয় সংসদ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির অনুমোদন দেয়া হয়। অনুমোদন দেয়ার পর সরকার ও বিশ্বব্যাংক ৫০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার বিশ্ববিদ্যালয়টির নামে অনুদান দেয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক সেই অর্থ ছাড় করছে না।’

রফিকুল ইসলামের এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ইউজিসি জানায়, প্রতিষ্ঠানটির স্বঘোষিত উপাচার্য রফিকুল ইসলামের কর্মকাণ্ডে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এ অবস্থায় নামধারী ওই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ এবং উচ্ছেদ করে কমিশনকে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করা হয়। এরপর মঞ্জুরি কমিশনকে রাজশাহী জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে পাঠানো এক চিঠিতে উচ্ছেদের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

গত বছরের ২২ অক্টোবর রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপার বারবার এক চিঠিতে রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ইউজিসির পক্ষ থেকে চিঠি দেয়া হয়। একই বছরের ২২ অক্টোবর জাতীয় দৈনিকে তথাকথিত বিশ্ববিদ্যালয়টির অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সতর্কীকরণ গণবিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করে ইউজিসি।

চলতি বছরের ১৩ আগস্ট স্বঘোষিত উপাচার্য রফিকুল ইসলাম স্থানীয় ভবানীগঞ্জ সোনালী ব্যাংক শাখা বরাবর একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে বিশ্ববিদ্যালয়টির নামে মঞ্জুরকৃত এক হাজার ৩৫০ কোটি টাকা থেকে স্থানীয় ভবানীগঞ্জ সোনালী ব্যাংক রাজশাহী শাখার বিশ্ববিদ্যালয়টির সঞ্চয়ী হিসাব নং-০১০২৪৮৬৩ এর অনুকূলে ৬০ লাখ টাকা জমা দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়। চিঠির অনুলিপি দেয়া হয় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি, বিশ্বব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক, এমনকি সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়েও।

রফিকুল ইসলামের দাবি, ‘আমি এই মাদরাসার প্রিন্সিপাল ছিলাম, আমি ডিগ্রি পাস। যখনই এই মাদরাসাকে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অনুমোদন দেয়া হয় তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় আমাকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়। আমি যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন নিয়ে গবেষণা করেছি তাই আমাকে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি-মুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দেন। আমি এখন আমার নামের পাশে ড. লিখতে পারি।’

‘মাদরাসাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হওয়া এবং ডক্টরেট স্বীকৃতি দেয়াসহ সব ডকুমেন্ট আমার কাছে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপন করতে গিয়ে জেলও খেটেছি। আমাকে পুলিশ ধরেও নিয়ে যায়। পরে গত বছর ছাড়া পেয়ে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেই।’

তিনি দাবি করেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পেলেও আমাকে টাকা দেয়া হচ্ছে না। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণকাজ সম্ভব হচ্ছে না, শিক্ষার্থীও ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। এরপরও ইউজিসি থেকে ছয়বার চিঠি দিয়ে আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত দিয়ে আমাকে গ্রেফতার করে আড়াই মাস জেলেও রাখা হয়।’

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে কতজন শিক্ষার্থী আছেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন তো ছাত্র-ছাত্রী নেই, কারণ অবকাঠামো নেই, বসার জায়গা নেই, শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন নেই; তাহলে কে ভর্তি হবে এখানে? সোনালী ব্যাংককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, দ্রুত আমাদের অ্যাকাউন্টে টাকা দেয়ার জন্য। টাকা দিলে ৬০০ একর জায়গার ওপর বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপন করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইউজিসি আইন বোঝে না, কাগজপত্রও বোঝে না। যদি বুঝতো তবে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য বান কি-মুন, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে পুলিশে দিতে পারতো না। বিষয়টি আমি লিখিতভাবে রাষ্ট্রপতি ও বান কি-মুনকে জানিয়েছি। তারা এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপনে সার্বিক সহায়তা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।’

রফিকুল ইসলামের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান জাগো নিউজকে বলেন, ‘অর্জুনপাড়া মদিনাতুল উলুম ইসলামি ইউনিভার্সিটি নামধারী প্রতিষ্ঠানটির স্বঘোষিত উপাচার্য রফিকুল ইসলাম নামে জনৈক ব্যক্তি ইউজিসিতে গত কয়েক বছর ধরে চিঠি দেয়। এটা একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান। এ নামে দেশে কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নেই। দুই বছর আগে রাজশাহী জেলা প্রশাসক বরাবর চিঠি দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলা হয়েছিল। এরপর তারা একটি রিপোর্টও দেয়। সম্প্রতি আবার একটি চিঠি পেয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘এরা সম্ভবত সংঘবদ্ধ কোনো চক্র। গত বছর তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে সতর্ক থাকার জন্য ইউজিসি পত্রিকায় একটি গণবিজ্ঞপ্তি দেয়। বিভিন্ন ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে প্রতারণার সম্ভাবনা থেকেই আমরা ওই বিজ্ঞপ্তি দেই। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া উচিত।’

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।