একজন ঢাবি ছাত্রের ২২ বছর বয়সেই সিইও হয়ে উঠার গল্প


টাইমস অনলাইনঃ
Published: 2019-02-10 14:37:04 BdST | Updated: 2019-07-16 03:12:58 BdST

‘সিজিপিএ জিজ্ঞেস করবেন না, প্লিজ!’ হেসে বললেন শাদমান সাদাব।

গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের টেলিভিশন অ্যান্ড ফিল্ম স্টাডিজ বিভাগ থেকে স্নাতক শেষ করেছেন তিনি। যে তরুণ পরীক্ষার ফল হাতে পাওয়ার আগেই ফিউচার সিটি সামিট (এফসিএস) লিমিটেড নামে একটি হংকংভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে যোগ দিয়েছেন, তাঁর সিজিপিএতে কীই–বা যায় আসে!

ভবিষ্যতের শহর গড়ার লক্ষ্যে প্রতিবছর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করে এফসিএস। ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকে তাঁদের কাজের পরিধি দিনে দিনে বিস্তৃত হয়েছে। উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর বিভিন্ন শহরের সমস্যাগুলো খুঁজে বের করা, সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও উদ্যোগী তরুণদের মধ্যে একটি যোগসূত্র স্থাপন করা, সম্ভাবনাময় উদ্যোগগুলোর জন্য বিনিয়োগের ব্যবস্থা করা, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া—বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে এফসিএস। এখন এই সবকিছুর নেতৃত্বের দায়িত্ব শাদমানের।

হংকংয়ের তরুণ আন্দ্রে কোক এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। উপদেষ্টা হিসেবে আছেন টি-হাব ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা শ্রিনিভাস কল্লিপারা, হংকংয়ের অলাভজনক সংস্থা মেক আ ডিফারেন্সের আহ্বায়ক আদা য়িং কে য়োং, এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল অব হংকং এসএআর গভর্নমেন্টের সদস্য রেজিনা ইপ লও সুক-য়িসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণ্যমান্য ব্যক্তি। নারায়ণগঞ্জের ছেলে শাদমান সাদাব। মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি কীভাবে এত বড় পরিসরের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পেলেন?

গল্পটা একটু পেছন থেকে শুরু করি।

স্বপ্ন থেকে বাস্তবে
নারায়ণগঞ্জ আইডিয়াল স্কুল থেকে এসএসসি পেরোনোর পর শাদমান নটর ডেম কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন ২০১১ সালে। প্রতিদিন সকালে ট্রেনে করে ঢাকা আসতেন। ওই একই ট্রেনে চড়ে তিনি ধরেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস। তখন জীবনের লক্ষ্য কী ছিল? শাদমান বলেন, ‘তখন আসলে কোনো লক্ষ্য ছিল না। কী করছি, কেন করছি, কিছুই জানতাম না। ক্যাম্পাসে খুব ভালো সময় কাটত। আবার যখন ট্রেনে করে বাড়িতে ফিরতাম, মনে হতো স্বপ্ন থেকে বাস্তবে ফিরছি।’ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষ পর্যন্ত এভাবেই ক্লাস করেছেন। দ্বিতীয় বর্ষে ওঠার পর পরিবারসহ চলে আসেন ঢাকায়।

ছোটবেলায় শাদমান অন্তর্মুখী ছিলেন। নটর ডেমে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম আবিষ্কার করলেন, পড়ালেখার পাশাপাশি কত কী করার আছে! কলেজে বছরজুড়ে যত অনুষ্ঠান-উৎসব-প্রতিযোগিতা হতো, প্রায় সবকিছুতে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আউটসোর্সিংয়ের সঙ্গে পরিচয় হলো। পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের পকেট খরচটা উঠে আসত। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকেই ব্রিটিশ কাউন্সিল, টেন মিনিট স্কুল ও ব্লাডম্যান নামে একটি অ্যাপভিত্তিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি।

পড়াশোনা করতেন কখন? শাদমান অকপটে বললেন, ‘সত্যি বলতে আমি প্রচুর ফাঁকি দিয়েছি। কেন যেন মনে হতো, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে বাস্তবের কাজের দুনিয়ার একটা বড় দূরত্ব আছে। পড়ালেখার পাশাপাশি আমি কাজ শিখতে চেয়েছি।’

কাজ শেখার বড় সুযোগটা এল ২০১৬ সালে। শাদমান সাদাব খবর পেলেন, হংকংয়ে ‘ফিউচার সিটি সামিট’ নামে একটি সম্মেলন হবে। আবেদন করলেন। অংশগ্রহণের সুযোগও হলো। তখনো জানতেন না, এই সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের সনদে একদিন তাঁরই সই থাকবে!

এ বছর জানুয়ারি মাসে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অনুষ্ঠিত ফিউচার সিটি সামিটে অংশ নেওয়া বিভিন্ন সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সঙ্গে শাদমান সাদাব

 

সবার ওপরে নেটওয়ার্কিং

‘২০১৬ সালের ফিউচার সিটি সামিটে আমার উদ্দেশ্য ছিল একটাই—যত বেশি সম্ভব মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। শেখা। বিভিন্ন দেশের তরুণ, অনুষ্ঠানের আয়োজক, বক্তা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, সবার সঙ্গে গিয়ে গিয়ে আমি হাত মিলিয়েছি। কথা বলেছি। বলরুম ঘুরে প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য রাতে দেরি করে ঘুমাতে যেতাম।’

শাদমানের পুরো বক্তব্যের সারকথা একটাই—নেটওয়ার্কিং। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর গুরুত্বটা বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। এই অনুধাবন পরে কাজে এসেছে। পরের দুই বছরে যুক্তরাজ্য, জাপান, নেপাল, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ঘুরে বেশ কয়েকটি সম্মেলন, প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন তিনি। ধীরে ধীরে বড় হয়েছে পরিচিতির পরিধি।

প্রথমবার ফিউচার সিটি সামিটে গিয়েই প্রতিষ্ঠাতা আন্দ্রে কোকের সঙ্গে খুব ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশ অঞ্চলে এফসিএসের পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। পরে দায়িত্ব পেয়েছেন পুরো আয়োজনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ নির্বাহী হিসেবে। বড় দায়িত্বের খবরটা এল ২০১৮ সালে।

শাদমানের মুখেই শুনি।

‘২০১৮ সালের জুলাই মাসে অনার্সের ফাইনাল পরীক্ষা হলো। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরদিনই হংকং রওনা হলাম। ফিউচার সিটি সামিটের সে বছরের আসর বসেছিল সেখানে। ভারত, নেপাল, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, তানজানিয়া, উগান্ডা, শ্রীলঙ্কা, জাপান, পাকিস্তানসহ নানা দেশে আমার তত দিনে অনেক বন্ধু হয়েছে। সবাইকে এর সঙ্গে যুক্ত করেছিলাম, ফলে সেবারের সামিটটা খুব ভালো হয়েছিল।’

এই সম্মেলনের পরপরই শাদমানকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দেন আন্দ্রে কোক (তখন তাঁর বয়স ছিল ২২, এখন ২৩)। কেন বাংলাদেশের এই তরুণকে বেছে নিলেন? জানতে চেয়েছিলাম আন্দ্রের কাছে। তিনি বলেন, ‘শাদমানের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার ঝোঁক আছে। ভবিষ্যতের শহর গড়ার যেই স্বপ্ন নিয়ে আমরা এগোচ্ছি, তার পুরোটাই উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল। আমার মনে হয়েছে, তাঁর মধ্যে সম্ভাবনা আছে।’

ব্রিটিশ কাউন্সিলের ‘অ্যাকটিভ সিটিজেন’ প্রকল্পের আওতায় ২০১৭ সালে যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন শাদমান
ব্রিটিশ কাউন্সিলের ‘অ্যাকটিভ সিটিজেন’ প্রকল্পের আওতায় ২০১৭ সালে যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন শাদমান
সম্ভাবনার আলো

প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হওয়ার পর বিপুল উদ্যমে কাজে নেমেছেন শাদমান। এফসিএসের কাজের পরিধি আরও বড় করেছেন। গত জানুয়ারি মাসে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে সফলভাবে আয়োজন করেছেন ‘ফিউচার সিটি সামিট ২০১৯’। ১৪টি দেশের ৩০টি শহর থেকে তরুণেরা অংশ নিয়েছিলেন এই সম্মেলনে।

‘বালির অর্থনীতি যেহেতু পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল, ওখানকার তরুণেরা সবাই পর্যটনসংক্রান্ত খাতে ক্যারিয়ার গড়তে চান। আমরা তাঁদেরকে উদ্যোক্তা হওয়ার পরামর্শ দিয়েছি। বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যুক্ত করেছি। বিভিন্ন সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করেছি। বালির মেয়র, পর্যটন বিভাগের প্রধান, সেখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় মিউজিশিয়ানসহ অনেকেই এসেছিলেন অনুষ্ঠানে। শুধু একটা সম্মেলন আয়োজন করেই আমাদের কাজ শেষ না। সংশ্লিষ্টদের অংশগ্রহণে আমরা কয়েকটা প্রকল্প চালু করি।’ বলছিলেন শাদমান।

শাদমান অকপট বলেই আমরাও অকপটে একটা প্রশ্ন করার সাহস পাই। ‘এই যে সরকারি-বেসরকারি বড় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হিসেবে মিটিং করেন, নানা দেশের মানুষের সামনে বক্তব্য দেন, আপনার নার্ভাস লাগে না? মনে হয় না, আমি তো ছোট মানুষ...?’

জবাবে প্রথমে হাসলেন। তারপর বললেন, ‘শুরুতে লাগত। পরে দেখলাম, বড় মানুষেরা বিনয়েও বড় হয়। তারা শেখাতে ও শিখতে আগ্রহী। ফলে বিদেশিদের সঙ্গে আলাপ–আলোচনা করতে কোনো সমস্যা হয় না। বাংলাদেশে যদিও কিছুটা সমস্যা হয়। এখানে কারও কাছে গেলে মনে করে বাচ্চা ছেলে। যখন শোনে আমি এখনো মাস্টার্স করিনি, তখন আরও পাত্তা দেয় না।’

বাবা হাসানুজ্জামান ভূঁইয়া ও মা সাবিরা হাসানের একমাত্র ছেলে সাদাব। একসময় যে ছেলে ক্লাস করতে প্রতিদিন ট্রেন ধরত, এখন সে প্লেনে চড়ে আজ এ দেশ তো কাল সে দেশে ঘুরে বেড়ায়। গত ডিসেম্বর মাসেও গিয়েছিলেন মালয়েশিয়ার সানওয়ে ইউনিভার্সিটিতে। কমনওয়েলথ ইয়ুথ ইনোভেশন সেন্টার আয়োজিত ফিউচার ইয়ুথ সামিটে অন্যতম বক্তা ছিলেন তিনি। এ বছর আরও বেশ কিছু বড় প্রকল্প আছে তাঁর সামনে। প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে শাদমান একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের বেতন পান, পাশাপাশি প্রকল্পগুলোরও একটি লভ্যাংশ থাকে।

কথা বলতে বলতে সম্পর্কটা যখন সহজ হয়ে এল, শাদমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জিত তাঁর সিজিপিএটাও বললেন। ৪ এর মধ্যে ৩.৩১। অতএব বোঝা গেল, এত কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকার পরও পড়ালেখায় তিনি খুব হেলাফেলা করেননি।

 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।