ঢাবি ছাত্র বরুণের মৃত্যু: একটি হৃদয়বিদারক ঘটনার আদ্যোপান্ত


সুশীল মালাকার
Published: 2019-05-10 05:05:16 BdST | Updated: 2019-08-26 03:06:11 BdST

তখন ঘড়িতে প্রায় ১০ টা বেজে ৫০। হলের জোতির্ময় গুহঠাকুরতা ভবনের সামনে আসতেই দেখলাম আমাদের নতুন প্রভোস্ট স্যার হন্ত-দন্ত হয়ে গেটের দিকে যাচ্ছেন। সাথে অনেক মানুষ। বুঝলাম কিছু একটা ঘটেছে।
গেটের কাছে যেতেই ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন বলল অনেক রক্ত পড়েছে। ততক্ষনে প্রভোস্ট স্যার রিক্সায় ঢাকা মেডিকেলের দিকে রওনা দিয়েছেন।

ইদানিং তাড়াতাড়ি হলের ক্যান্টিনের খাবার শেষ হয়ে যায়। তাই শুভ আর আমি ভাবছিলাম চানখারপুল যাব রাতের খাবার খেতে। কিন্তু স্যার সহ অনেককে মেডিকেলের দিকে যেতে দেখে ভাবলাম খুব খারাপ কিংবা মর্মান্তিক কোন ঘটনা ঘটেছে। শুভকে বললাম চল আগে ঢাকা মেডিকেলের ওদিক থেকে ঘুরে আসি। অনেকগুলো জুনিয়রের সাথে ঢাকা মেডিকেলের দিকেই রওনা দিলাম। তাদের সবাইকে কেমন যেন উদ্ভ্রান্ত লাগছে। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। হাঁটতে থাকলাম ঢাকা মেডিকেলের দিকে।
শুভকে বললাম, কোন ছেলে কি ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করলো নাকি? ইদানিং তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা হতাশায় আত্মহত্যা করছে। এ ক্যাম্পাসে সুইসাইড রেট হাই। প্রতি মাসেই এরকম ঘটনা ঘটে। তাহলে কি এরকম কিছু?

শুভ বলল, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন নিয়ে আমিও খুব হতাশ। যেকোন মুহূর্তে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করতে পারি। বলেই ও হাটার গতি বাড়িয়ে দিল। কয়েক মিনিটেই হল থেকে ঢাকা মেডিকেলের ভিতরে দুজন পৌঁছে গেছি। গিয়ে দেখি অনেক লোক। আমাদের হলের অনেকে আছে এর মধ্যে। ইমার্জেন্সির করিডোরে একটি ট্রলিকে কেন্দ্র করে আছে তারা সবাই। আরেকটু এগিয়ে দেখি ট্রলিতে শোয়ানো একটি রক্তাক্ত নিথর দেহ। পাশেই উদ্ভ্রান্ত কয়েকজন ছেলে। ভাবলাম এরা হয়তো ছেলেটার বন্ধু হবে। পাশে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই বলল, দাদা, বরুন নারকেল গাছ থেকে পড়ে গেছে।
পাশেই রাজকুমার দা। ছেলেটার কি অবস্থা, দাদাকে জিজ্ঞেস করতেই কাঁপা কাঁপা গলায় তিনি বললেন ডাক্তার বলেছে ডেড। স্পট ডেড। পাশেই দাড়ানো ছেলেটা ফুঁপিয়ে উঠল। পড়ে যাচ্ছিল কংক্রিটে। তার আগেই ধরে ফেললাম।

একটু দূরে তার ব্যাচের বন্ধুরা দাড়ানো। তারা কান্না করছে। অবশেষে তাদের কাছ থেকে জানতে পারলাম,

বরুন বিশ্বাস। ফলিত গনিত বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। অক্টোবর ভবনের ৪৫৫ নম্বর রুমে থাকতো। বাড়ি বরিশাল জেলার প্রত্যন্ত এক গ্রামে। আগামীকাল শুক্রবার। ছুটির দিন। কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে প্লান করেছিল, হলের গাছের ডাব পেরে খাবে। তাই অক্টোবর টিভি ভবনের পেছনে যে প্রাগৈতিহাসিক সুউচ্চ নারকেল গাছগুলো আছে। সেখানে গেল তারা। সামনেই গেট। হলের রবীন্দ্র ভবনের কাজ চলছে। তাই গেটটি বন্ধ। বরুন গ্রামের ছেলে। এরকম নারকেল গাছে সে অনেক উঠেছে। তাই স্যান্ডেল নিচে রেখেই উঠে পড়ল গাছে। ছয়তলা বিল্ডিংয়ের সমান গাছটি উপরের দিকে গিয়ে খানিকটা বেকে গেছে। ঝাকড়ালো পাতাওয়ালা চিকন নারকেল গাছটি বাতাসে অনবরত দোলে। এদিকে পাশেই থাকা একটি রোডলাইট। সেটিও বন্ধ। ফলে চারপাশ অন্ধকার। কিছুই দেখা যায় না। উপরে নারকেলের কাছাকাছি গিয়ে বরুন একটি পাতা ধরেছে। কিন্তু বরুন দেখতে পায় নি নারকেল গাছের এই ডগাটি মরে লাল হয়ে গেছে। শুকনো খটখটে ডগা। শরীরের সমস্ত ওজন পেয়ে মরা ডগাটি বাতাসে খসে পড়ল। প্রায় ছয় তলা সমান উচ্চতার নারকেল গাছের উপর থেকে। হলের পিচঢালা রাস্তায় পড়ে গেল বরুন। মাথা ছিল নিচের দিকে। ঘাড়ের মেরুদন্ড ভেঙে রক্তের ফোয়ারা ছুটলো রাস্তায়। শব্দ শুনে নিচে অন্ধকারে দাড়ানো বন্ধুগুলো তখন বুঝে গেছে, কি ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গেছে। কাছে এসে দেখে রক্তে বরুনের শার্ট এবং রাস্তা একাকার। হন্ত-দন্ত হয়ে চিৎকার করতে করতে ছুটলো আশপাশে।

কয়েকদিন যাবত অক্টোবর কেন্টিনের খাবার খুব তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে যায়। তাই এই সময়টাতে এদিকে লোক খুব একটা নেই। পাশেই দাড়ানো ছিল কিছু শ্রমিক। তারা নির্মানাধীন রবীন্দ্রভবনে কাজ করে। তারা খাওয়া-দাওয়া সেরে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করছিল। তারা দৌড়ে গেল নারকেল গাছতলায়। ততক্ষনে বরুনের শরীরের বেশিরভাগ রক্ত তীব্রভাবে পিচঢালা রাস্তায় জমাট হয়ে গেছে। তারা ধরাধরি করে বরুনকে নিয়ে গেল ঢাকা মেডিকেলের ইমারজেন্সিতে। ডাক্তার দেখে বললেন। আর নেই। স্পট ডেড।

বরুণের নিথর দেহ

অনেকক্ষন দাড়িয়ে আছি মেডিকেলের ভিতরে। ইতোমধ্যে আমাদের হলের ভিপি উৎপল দা সহ অনেক দাদারা এসেছেন। সবার চোখে-মুখে কষ্টের ছাপ। প্রদীপ দা, পঙ্কজ দা, সত্যজিত দা, জয়জিৎ দা সহ হলের অনেক দাদারা এসেছেন। তাদের সবার চোখেই বেদনার ছাপ। সবাই মেডিকেলের এদিক ওদিকে সঠিক তথ্য জানার চেষ্টা করছেন।

শুভকে বললাম, মানুষের জীবনটা কত অদ্ভুদ তাই না? কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে একজন মানুষের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতে পারে। বরুন ছেলেটার জায়গায় আজ আমিও হতে পারতাম।

বরুন যে গাছটি থেকে পড়েছে ঠিক সেই নারকেল গাছটির অপর পাশে অনেকগুলো কামরাঙা গাছ আছে। ফার্স্ট ইয়ারে থাকতে আমরা বন্ধুরা মিলে অনেক কামরাঙা খেয়েছি গাছ থেকে পেরে। আমরা অবশ্য দিনের বেলাতে খেতাম। আমাদের হল, হলের ফলও তো আমাদের জন্যই। আমাদের মধ্যে কেউ নারকেল গাছে উঠতে পারতো না। হয়তো দু-একজন পারতো কিন্তু ছয় তলা সমান নারকেল গাছ দেখে কেউ সে কথা স্বীকার করতো না। যার ফলে এই ভয়বহ নারকেল গাছে আমাদের কারোরই ওঠা হয়নি। ভাবতে ভাবতেই দেখলাম লাশটি মর্গের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন মেডিকেলে দায়িত্বরত পুলিশ অফিসার বাচ্চু মিয়া।

এর কিছুক্ষন পরই মেডিকেলে আসলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি সঞ্জিত দা। তিনি সরাসরি মর্গে গেলেন দেখার জন্য। তার পিছন পিছন ঢুকে গেলাম মর্গ নামক নিরব রুমটির ভিতরে। যেখানে নিথর মৃতদেহ রাখা হয়। ভিতরে ঢুকেই দেখলাম অনেকগুলো মৃতদেহ নিথরভাবে পড়ে আছে মেঝেতে। প্রায় সবগুলো মৃতদেহের বয়স ষাট বছরের উপরে। মাথায় সাদা স্কচ টেপ পেচানো, নাকে নল লাগানো মৃতদেহগুলো অতি শীর্নকায়।
তাদের মাঝখানে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ২০ বছর বয়সী বরুনের দেহটা অনেক বেমানান লাগছে। বুকের মধ্যে কেমন শূন্যতা জাগলো। বেরিয়ে গেলাম মর্গ থেকে।

ভেবেছি চানখারপুলে খেতে যাব। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল মেডিকেলে এসে। এতসব দেখার পর খিদেটাও বিদেয় নিয়েছে। উদ্ভ্রান্তের মত মেডিকেলের এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করলাম। চারিদিকে যেন মানুষগুলো আর্তনাদ করছে।
১৯২১ সাল থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত এই ঢাকা মেডিকেলের জায়গাটিতে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৩ সালের দিকে আহত সৈন্যদের চিকিৎসার জন্য কলাভবনকে বানানো হয় অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প। সেখানে যুদ্ধে আহত সৈন্যদের চিকিৎসা দেয়া হত। কলাভবন সরিয়ে আনা হয়েছিল ক্যাম্পাসে অবস্থিত শিখ মন্দিরের পিছনে। ইংরেজরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনকে চিকিৎসাকেন্দ্র বানিয়েছিল সেই কবে। সেই পুরাতন কলাভবনে শুয়ে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ বছর বয়সী একজন ছাত্র। কি অদ্ভুদ, কি নিয়তি।
চারিদিক থেকে যেন আমার কানে ভেসে আসছে যুদ্ধে আহত সৈনিকদের আর্তনাদ। হঠাৎ শুভর ডাকে ঘোর কাটলো। বললাম ভাল লাগছে না চল হলে যাব।

হাটতে হাটতে শহীদ মিনার পেরিয়ে প্রবেশ করলাম হলে। অক্টোবর টিভি রুমের পিছনে আসতেই দেখলাম জমাট বাঁধা অাঠালো রক্তের দাগ। রক্তের দাগ অনুসরন করে চলে আসলাম নারকেল গাছের নিচে। সেখানে যা দেখলাম, তাতে আমার গা শিউরে উঠল। এক বালতি ঘন লাল রং গুলিয়ে পিচঢালা রাস্তায় ফেললে যেরকম দলা হয়ে থাকবে ঠিক সেরকম রক্ত রাস্তায় জমাট বেঁধে আছে। ফোনের ফ্লাশ লাইট রক্তের উপর ফেলতেই আয়নার মত নিজের প্রতিফলন দেখতে পেলাম। অনেক রক্ত। বুঝলাম, অতিরিক্ত রক্তক্ষরনেই স্পট ডেড। পাশেই রাখা ১ জোড়া স্যান্ডেল। বরুন ঠিক যেভাবে রেখে গাছে উঠেছিল সেভাবেই আছে। স্যান্ডেলের পাশে নারকেলের পাতাসহ একটি মরা ডগা। ডগার প্রান্তটি এখনো সতেজ। বোঝা যাচ্ছে মাত্র কিছুক্ষন আগে এটি গাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এই ডগাটি ধরেই বরুন নিচে পড়েছে।

দূরেই একটি প্রাইভেট কার লাইট জ্বালিয়ে এদিকে আসছে। কিছু দূরে গাড়িটি রেখে কেউ একজন নারকেল গাছের দিকে আসছেন। তার পিছনে আরো অনেকে। কাছে আসতেই দেখলাম আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর গোলাম রাব্বানী স্যার। তিনি এসে নারকেল গাছ এবং রক্ত দেখে খুব আক্ষেপ করলেন। দুঃখ-ভারাক্রান্ত গলায় বললেন, রাতে কেউ নারকেল গাছে ওঠে ?

গত বছর ঠিক এই দিনটাতে অর্থাৎ ৯ ই মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসিম উদ্দিন হলে তৌফিক নামে ফার্স্ট ইয়ারের একটা ছেলে ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে আম পাড়তে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে মারা যায়। আজকেও ৯ই মে। কি অদ্ভুদ ব্যাপার। ১ বছরের দুই প্রান্তে দুটি প্রান পেন্ডুলামের মত দোদুল্যমান হয়ে ঝড়ে পড়লো কংক্রিটে।

প্রক্টর স্যার, এই কবছরে গাছ থেকে পড়ে তার বেশ কয়েকজন স্টুডেন্টকে মারা যেতে দেখেছেন। তিনি আজকের ঘটনায় হয়তো আরো বেশি মর্মাহত। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সবাইকে দেখে রাখার দায়িত্ব তো প্রক্টর স্যারেরই। প্রক্টর স্যার আর কিছু বলতে পারলেন না। হয়তো তার এরকম একটি ছেলে আছে, যে কিনা বরুনের মতই দেখতে।
তিনি আমাদের সবাইকে রাতে গাছে উঠতে বারন করে চলে গেলেন গাড়ির দিকে।

অনেক্ষন দাড়িয়ে থাকলাম নারকেল গাছটির নিচে। এখানেই কিছুক্ষন আগে একটি নিস্পাপ তাজা প্রান ঝড়ে পড়েছে। ভাবতেই বুকের ভেতরটা কেমন হু-হু করে উঠছে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী ছেলে বরুনের বাবা-মা হয়তো এতক্ষনে জেনে গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তাদের ছেলেটি আর নেই। নিস্প্রান-নিথর দেহ নিয়ে শুয়ে আছে ঢাকা মেডিকেলের মর্গে।
হয়তো ভোর হওয়ার আগেই বরুনের বাবা পাশের বাড়ি থেকে টাকা ধার করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন ছেলের লাশ বাড়িতে নেয়ার জন্য।
বরুনের মা এতদিন অপেক্ষায় ছিল, ছেলেটি তার এই রোজার ছুটিতে কবে বাড়ি আসবে। তিনি হয়তো এখন তার ছেলের লাশের জন্য অপেক্ষা করবেন, প্রহর গুনবেন কখন একটি লাল বাস ছেলের মৃতদেহ নিয়ে বাড়ির আঙিনায় ভিড়বে।

 

সুশীল মালাকার

০৯/০৫/১৯
জগন্নাথ হল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।