ইন্টারন্যাশনাল গো–কার্ট চ্যাম্পিয়নশিপ

উদ্ভাবনে সেরা বুয়েটের অটো মায়েস্ত্রো


Dhaka
Published: 2020-11-30 19:31:04 BdST | Updated: 2021-01-16 21:48:56 BdST

তরুণদের দলটির সঙ্গে কথা হচ্ছিল গুগল মিট অ্যাপে। সবাই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী, আরও নির্দিষ্ট করে বললে—‘অটো মায়েস্ত্রো’ নামের একটি দলের সদস্য। কী কাজ তাঁদের? দলনেতা সাকিব সাদাতের কথা থেকে অনুমান করতে পারেন, ‘অটোমোবাইলে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকলেও আমরা চেষ্টা করেছি আমাদের সেরাটা তুলে ধরতে। গো-কার্ট বানানোর সময় আমরা দেশীয় আমেজ ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। তাই এটির বাম্পার ডিজাইনে আমরা পাটের ফাইবার ব্যবহার করেছি। দলের সবাই এটা নিয়ে অনেক পরিশ্রম করেছে।’

সম্প্রতি ভারতের পাঞ্জাবের লাভলি প্রফেশনাল ইউনিভার্সিটি আয়োজিত ইন্টারন্যাশনাল গো–কার্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ভার্চ্যুয়াল পর্বে অংশ নেয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দল ‘অটো মায়েস্ত্রো’। চলতি বছরের মার্চে ভারতে এই আয়োজন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও করোনার জন্য থমকে যায় সবকিছু। বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে ভার্চ্যুয়াল পর্বে শুরু হয় এ বছরের আয়োজন। ৬টি দেশের ৪০টির বেশি দলের অংশগ্রহণে ৬টি বিভাগে চলে ইন্টারন্যাশনাল গো–কার্ট চ্যাম্পিয়নশিপ। উদ্ভাবন, অটোমোটিভ স্টাইলিং কম্পিটিশনে সেরা এবং অটোমোটিভ কুইজে সেকেন্ড রানারআপ নির্বাচিত হয় অটো মায়েস্ত্রো। সব মিলিয়ে সেরাদের তালিকায় তাদের অবস্থান নবম।

দশে মিলে করি কাজ
গত বছর আগস্ট মাসে ইন্টারন্যাশনাল গো–কার্ট চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য নিবন্ধন করেছিল অটো মায়েস্ত্রো। বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আশিকুর রহমানের উৎসাহ-উদ্দীপনায় বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিব সাদাত মোট ২৫ জন সদস্যের সমন্বয়ে দল গঠন করেন। উপদলনেতা, পাওয়ার ট্রেইন, টেকনিক্যাল হেড, সিস্টেম ডিজাইন, ম্যাটেরিয়াল টেস্টিং, ট্রান্সমিশন, ব্রেকিং, ইলেকট্রিক্যাল সিস্টেমসহ বিভিন্ন অংশের জন্য একেকজনকে নির্বাচন করেন তাঁরা। এই দলে ছিলেন যন্ত্রকৌশল বিভাগের কাজী ফাহমিদ হাসান রাফী, নাজমুল হক, নাফিসা রায়হানা, ওয়াহিদ তৌসিফ, রাহাত চৌধুরী, ফারদিন ইশতিয়াক আরাফ, আহমেদ সাবুল মাসানি, সৈয়দ তাহমিদ কালাম, ইশাত রায়হান জামিল, মো. মেহরাব হোসেন সিয়াম, সুবাহ্ মুবাশশিরা, নাসিম মাহমুদ ফুয়াদ, সৌম্য সৌভিক ভট্টাচার্য্য, সুস্মিত দাশ গুপ্ত, উমাইর আল হাম্মাদ, মো. ফুয়াদ আমিন জারিফ, নুদরাত নাওয়াল, তৌসিফ সাদমান, মো. রাশেদ নিজাম, আ ন ম ফুহাদ উল ইসলাম, সাদিব ফারদিন, অনুতম বৈরাগী, মুনকাসির আহ্‌নাফ এবং নৌযান ও নৌযন্ত্র কৌশল বিভাগের মো. ইরতিসাম নসরত।

গো–কার্ট মূলত রেসিং ট্র্যাকে চালানোর জন্য ব্যবহৃত ফর্মুলা কারের প্রথম ধাপ। চার চাকার এই বিশেষ গাড়িতে থাকেন একজন চালক। নকশা করার ক্ষেত্রে গাড়িকে যতটা সম্ভব গতিশীল, টেকশই ও নিরাপদ করার বিষয়টি মাথায় রাখা হয়। এ ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে এই গাড়ি তৈরি করা যাবে কি না, পরীক্ষা করা হয় তা-ও।

যেভাবে তৈরি হলো
কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছিল করোনাকালের আগে। কম্পিউটারে বানানো নকশা অনুসরণ করে দিন-রাত কাজ করেছে বুয়েটের এই শিক্ষার্থীদের দল। গুছিয়ে কাজ করার জন্য তারা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। সারা দিন একদল কাজ শেষ করে গেছে, ক্লাস শেষে হাজির হয়েছে আরেক দল। যন্ত্রাংশের খোঁজে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরতে হয়েছে। গো–কার্টের ওজন কমিয়েও টেকসই নকশা তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে পাটের ফাইবার। অটোমোবাইল শিল্পে পাটের ব্যবহার অল্প পরিসরে শুরু হলেও গো–কার্টে তা চোখে পড়ে না। তাই দলটির জন্য এ নিয়ে কাজ করা ছিল নতুন চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি চালকের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে যুক্ত করা হয় বিশেষ সিটবেল্ট, যেটা ঠিকমতো লাগানো না হলে গাড়ির মোটর চালু হবে না। গো–কার্ট তৈরির বেশির ভাগ যন্ত্রাংশ দেশে পাওয়া গেলেও চাকার জন্য ভারতে যেতে হয় দলের তিন সদস্যকে। সব মিলিয়ে নিজেদের সেরাটা দিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছে অটো মায়েস্ত্রো।

প্রস্তুতির শেষ অংশে করোনার জন্য যখন আয়োজন পিছিয়ে যায়, মন খারাপ হয় সবার। চলতে থাকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষা। অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে অনলাইন প্রেজেন্টেশন, প্রতিবেদন জমা দেওয়া, টেস্ট ভিডিওসহ নানা তথ্য জমা দিয়ে অংশ নেয় প্রতিটি দল। উদ্ভাবনী বিভাগে নিজেদের গো–কার্ট নিয়ে সেরা দল নির্বাচিত হয় অটো মায়েস্ত্রো। ভবিষ্যতে এমন নকশা কতটা ব্যবহার উপযোগী হবে, সেই বিবেচনায় ‘অটোমোটিভ স্টাইলিং প্রতিযোগিতায়ও’ সেরা হয় তারা। সবশেষে কুইজ প্রতিযোগিতায় দলের ঝুলিতে আসে সেকেন্ড রানারআপের পদক।

গো–কার্টের মূল কম্পিউটারভিত্তিক নকশা নিয়ে কাজ করেছেন নুদরাত নাওয়াল। দ্বিতীয় বর্ষের এই ছাত্রী বলেন, ‘শুরুতে কিছুটা নার্ভাস লাগছিল। কিন্তু একটু একটু করে দলের সাহায্যে এগিয়ে গেছি। অনেকের ধারণা অটোমোবাইলে মেয়েরা কাজ করতে পারবে না। কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অটোমোবাইল ক্লাব শুরু হয় ২০১৫ সালে। শুরু থেকেই যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিয়ে অটোমোবাইলকে কেন্দ্র করে নানা আয়োজন করে তারা। আন্তর্জাতিক পরিসরে অটোমোবাইল নিয়ে এমন অংশগ্রহণ তাদের জন্য এটাই প্রথম। ভবিষ্যতে অটোমোবাইল নিয়ে এমন আন্তর্জাতিক আরও নানা আয়োজনে অংশগ্রহণ করতে চায় তারা।